Published : 09 Oct 2025, 09:42 PM
নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে দলের নিবন্ধনের জন্য শাপলা প্রতীক চেয়েই অনড় অবস্থান তুলে ধরেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা।
সেইসঙ্গে এনসিপিকে শাপলা প্রতীক কেন দেওয়া হবে না, বৃহস্পতিবারের বৈঠকে সেই ব্যাখ্যাও তারা চেয়েছেন কমিশনের কাছে।
এদিন বিকাল ৪টা থেকে নির্বাচন ভবনে সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন ও ইসি সচিব আখতার আহমেদের সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করেন এনসিপি নেতারা। সেখান থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
তিনি বলেন, শাপলা মার্কা ছাড়া এনসিপি কোনো প্রতীক নেবে না, সিইসিকে সেটা সাফ জানিয়ে এসেছেন। আর শাপলা না দেওয়ার ব্যাপারে ব্যাখ্যা কী, সেই প্রশ্নও তারা তুলেছেন; তবে সিইসি ‘কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি’।
নাসীরুদ্দীন বলেন, “দুই ঘণ্টা আমরা উনাদেরকে (সিইসি ও সচিব) প্রশ্ন করেছিলাম যে প্রতীক প্রশ্নে যদি না দিতে চান, সেটাতে আপনার ব্যাখ্যা কী? দুই ঘণ্টা উনারা নিশ্চুপ ছিলেন। কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। উনাদের যে ধৈর্যশক্তি, সেটার আমরা যথেষ্ট প্রশংসা করি।
“আমরা এটা সবশেষ তাদের বলে এসেছি যে, যদি শাপলা না দেন তাহলে আপনাকে ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং যেহেতু সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে উনি আছেন।”
জাতীয় প্রতীক হিসেবে শাপলা সংরক্ষণ করলে একইভাবে ধানের শীষ, তারা, কাঁঠাল, সোনালি আঁশও সংরক্ষণের দাবি তুলে ধরেন এনসিপি নেতারা।
ইসির সামনে ‘দুটি রাস্তা আছে’ মন্তব্য করে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন ব্রিফিংয়ে বলেন, “একটি হল ধান (ধানের শীষ) বাতিল করা, তারা বাতিল করা, সোনালি আঁশ বাতিল করা, অথবা শাপলা দেওয়া।
“আমরা আশা করি ভাতৃপ্রতিম অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠন রয়েছে, আমরা তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ যে কারোটাই বাতিল না হোক। সুতরাং আমরা শাপলা পেতে আইনি বাধা এবং রাজনৈতিক বাধা কোথাও দেখছি না। এজন্য আমরা আশাবাদী শাপলা পাব। সে বিষয়টা আমরা জানিয়ে এসেছি ওনাদেরকে। ওনারা এ বিষয়ে নিশ্চুপ ছিলেন।”
নাসীরুদ্দীন বলেন, “কোনো উত্তর দিতে না পারায় ‘উনারা এটাতে সম্মতি প্রকাশ করেছেন’ বলে মনে করি। যেটা আমরা বিবাহের ক্ষেত্রে দেখি সম্মতি প্রকাশ করে থাকেন। ‘সো ইটস নট দা ফান, আই এম টকিং এ সিরিয়াস ম্যাটার’।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দুটি দলকে নিবন্ধন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে এনসিপি একটি।
তবে এনসিপি দলীয় প্রতীক হিসেবে বারবার শাপলা দাবি করে এলেও ইসি তাতে সায় দিচ্ছে না। ‘শাপলা’ প্রতীক ইসির নির্বাচন পরিচালনা বিধিতে না থাকায়, সেটি বরাদ্দ দেওয়া যাচ্ছে না বলে ইসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। যদিও শাপলা চেয়েই অনড় অবস্থানে দলটি।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ইসির তরফে এনসিপিকে প্রতীক বাছাইয়ের জন্য চিঠি দেওয়া হয় এবং ৭ অক্টোবরের মধ্যে তা জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়।
ইসির অনুরোধ নাকচ করে ৭ অক্টোবর ফের ‘শাপলা’ প্রতীক তালিকায় যুক্ত করতে নির্বাচন পরিচালনা বিধি সংশোধনের দাবি জানায় দলটি। সেক্ষেত্রে ‘শাপলা’, ‘সাদা শাপলা’ ও ‘লাল শাপলা’র যেকোনো একটি প্রতীক এনসিপির নামে বরাদ্দ করবে বলে আশা প্রকাশ করে চিঠি দেন দলের আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম।
এই অবস্থার মধ্যে এনসিপির প্রতিনিধি দল সিইসির সঙ্গে আরেক দফা বৈঠক করলেন বৃহস্পতিবার।
‘শাপলা ছাড়া নিবন্ধন নয়’
বৈঠক থেকে বেরিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান আমাদের ব্যাখ্যা চেয়েছে। আমরা ব্যাখ্যা দিয়েছি। আমরা আজকে সরেজমিনে এসে উনাদের কাছে ব্যাখ্যা (শাপলা না দেওয়ার ব্যাপারে) চেয়েছি। আমরা বলছি যে আমাদের ব্যাখ্যাটা দেন। উনারা দুই ঘণ্টা নিশ্চুপ থেকেছেন।”
তিনি বলেন, বিগত ইসির মত পরিস্থিতি বরণের কথাও কমিশন থেকে উত্থাপন করা হয়েছে।…নির্বাচন কমিশনার বললেন যে উনি নাকি মেন্টালি প্রস্তুত পূর্ব যারা নির্বাচন কমিশনার ছিলেন তাদের মতন পরিস্থিতি বরণ করতে, তিনি মেন্টালি প্রস্তুত আছেন। এই ধরনের উদ্ভট কথাবার্তা, অনাকাঙ্ক্ষিত কথাবার্তা এবং উদ্ভট চিন্তাভাবনার যারা রয়েছেন, আমরা স্টিল উনাদের পদত্যাগ চাচ্ছি না।”
পাটওয়ারী বলেন, “আমরা শাপলার ক্ষেত্রে আমরা অনড় আছি। অনড় থাকব। কারণ এটা অধিকার, যেটার আইনি প্রতিবন্ধকতা নাই, রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা নাই, কোথাও প্রতিবন্ধকতা নাই। তাহলে এটা করতে সমস্যা কোথায়? এবং আমরা তাদেরকে আজকে বলেছি।”
নির্বাচন কমিশন কারও চাপে থাকলেও সেটি এনসিপিকে জানানোর আহ্বান করেন নাসীরুদ্দীন।
“আমরা আপনাদের সঙ্গে কোনোকিছু বলব না, আমরা তাদের সঙ্গে রাজপথে মোকাবিলা করব, কিন্তু আপনি কোনো অদৃশ্য শক্তি পেছনে রেখে প্রেশারটা নিয়েন না। আপনি এমনে অসুস্থ মানুষ, আপনি এ ধরনের প্রেসার সহ্য করতে পারবেন না। তারপরেও উনি চুপ ছিলেন, যেহেতু ব্যাখ্যা দিতে পারেন নাই।”
পাটওয়ারী বলেন, “আমরা উনাদেরকে বলে দিয়েছি যে নিবন্ধন যদি আমাদেরকে দিতে হয় সেটা শাপলা দিয়েই হবে। শাপলা ছাড়া এনসিপি নিবন্ধন হবে না এবং এনসিপিও শাপলা ছাড়া নিবন্ধন মানবে না।”
তিনি বলেন, “ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে অথবা এই বিষয়ে যদি চ্যালেঞ্জ বা অবস্টেকল সৃষ্টি করে থাকে এটা নির্বাচন কমিশন কিছুটা দায়ী থাকবে।
“সেই ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বসে এই পরিস্থিতি তারা সৃষ্টি করছে এবং এ বিষয়ে আপনারাও সতর্ক থাকবেন যে নির্বাচন কমিশন কোন সময়ে কার সঙ্গে মিটিং করছে, কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।…নির্বাচন কমিশনের অনেক কিছু পাবেন, যদি গর্ত করেন অনেক কিছু বের হবে এখান থেকে।”
শাপলা প্রতীকের দাবিতে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “লড়াই চালিয়ে যাব গণতান্ত্রিক পন্থায়। আমাদের নিবন্ধনটা শাপলার মাধ্যমে ইনশাল্লাহ হবে, অন্য কোনো প্রতীকে এনসিপির নিবন্ধন হবে না।”
বৈঠকে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম মুসা ও যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহও ছিলেন।
সিইসির সঙ্গে আড়াই ঘণ্টার বৈঠকের পরে এনসিপির প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদের সঙ্গে তার কার্যালয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত আলাদা বৈঠক করেন। একইসময়ে সিইসির সঙ্গে নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমদ, নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার ও নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এবং ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বৈঠক করেন। বৈঠক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে কেউ কোনো কথা বলেননি।
নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “উনাদের (এনসিপি) আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, শাপলা প্রতীক তফসিলে নেই, এটা বরাদ্দ দেওয়া যাবে না। ৩০ সেপ্টেম্বর চিঠি দিয়ে লিখিতভাবে জানিয়েছি আমরা। এটা কমিশনের সিদ্ধান্ত বলেই চিঠি দেওয়া হয়েছিল।
“…এখন ইসির কাছে কয়েকটি পয়েন্ট নিয়ে কথা বলেছেন তারা।…বিকল্প প্রতীক না দিলে ইসি নিজেরা প্রতীক দেবে অথবা কী করবে, এটা কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।”
সিইসি ও নির্বাচন কমিশনারসহ কমিশন সভা হলে এ সিদ্ধান্ত আসতে পারে, যোগ করেন তিনি।
নিবন্ধন পাচ্ছে এমন দলগুলোর নাম, প্রতীকসহ নতুন দলের বিজ্ঞপ্তি কবে নাগাদ আসবে, এ প্রশ্নে ইসি সচিব বলেন, “বিজ্ঞপ্তিটা আরেকটু সময় নেব আমরা। পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জন্য কমিটি কাজ করছে।”
‘জাতীয় লীগ’ নিয়ে এনসিপির ‘আপত্তি’
এনসিপির পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয় লীগ নামে আরেকটি দলকে নিবন্ধন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তবে এ নিয়ে ‘আপত্তি’ রয়েছে এনসিপির।
এনসিপির জহিরুল ইসলাম মুসা সাংবাদিকদের বলেন, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী জাতীয় লীগ কেন্দ্রীয় অফিসের অস্তিত্ব নেই, দলের কোনো গঠনতন্ত্র নেই। ওই দলের যারা নেতৃত্ব, তাদের কেউ চেনে না। মাঠে কোনো কর্মসূচি নেই।
“আমরা নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্ন করেছিলাম যে আপনারা এমন একটি দলের নিবন্ধন দেওয়ার ব্যাপারে কীভাবে সিদ্ধান্ত নিলেন?...নির্বাচন কমিশন থেকে আমাদেরকে জানানো হয়েছে যে তারা এই বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।”
দ্রুত প্রবাসী ভোটার অ্যাপস চালুর দাবি তুলে ধরে তিনি বলেন, “প্রবাসীরা ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। আমরা তাগাদা দিয়েছি, চালু হতে দেরি হচ্ছে কেন। এই অ্যাপের ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আমাদের আশঙ্কা হচ্ছে, যে প্রক্রিয়ার দিকে ইসি যাচ্ছে, যেখানে একটা উল্লেখযোগ্য প্রবাসীদের ভোটের বাইরে রাখার একটা পাঁয়তারা চলছে। কমিশন থেকে জানানো হয়েছে, অ্যাপটি অক্টোবরের মধ্যে তারা চালু করবেন।”
ভোটের আগ পর্যন্ত ভোটার করার দাবি তুলে ধরে খালেদ সাইফুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ইসি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ১৮ বছর বয়সীদের ভোটার নিবন্ধন চলবে। জেন-জি ও তরুণ ভোটারদের কথা ভেবে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত ভোটার হওয়ার দাবি তুলে ধরা হয়েছে।
“৩১ অক্টোবরের মধ্যে যাদের বয়স ১৮ হবে, শুধু তারাই এই ইলেকশনে ভোট দিতে পারবে- ইসিতে আমরা জানিয়েছি এই সিদ্ধান্তটা গ্রহণযোগ্য না। নির্বাচন যেদিন হবে সেদিনও যাদের বয়স ১৮ বছর হবে, তারা যেন ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন এবং তারা ভোট দিতে পারেন।”
আরও পড়ুন-
শাপলা প্রতীক দাবি: সিইসির সঙ্গে বৈঠকে এনসিপি
ভোটের মার্কা শাপলা নয়, ইসির নীতিগত সিদ্ধান্ত
শাপলা: নাছোড় এনসিপির দাবিতে ইসির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে?