Published : 03 Feb 2026, 08:57 AM
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হওয়ায় এবার দুটি করে ব্যালট পেপারে ভোট দেবেন দেশের পৌনে ১৩ কোটি ভোটার।
প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রের আড়াই লাখ ভোটকক্ষে জমা পড়া সেই বিপুল পরিমাণ ব্যালট গুনতে কত সময় লাগবে এবং ফল একত্রীকরণই বা কীভাবে হবে, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
নির্বাচন কমিশন বলেছে, এবার প্রার্থীর পাশাপাশি গণভোটের ফল ঘোষণা করা হবে। তবে কেন্দ্রভিত্তিক ভোট গণনা ও ফল বিবরণী তৈরি হবে আলাদা।
সাধারণত রিটার্নিং অফিসার আসনভিত্তিক একীভূত প্রাথমিক ফল ঘোষণা করেন। কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে ‘নির্বাচনি ফল সংগ্রহ ও পরিবেশন কেন্দ্র’ থেকেও তা ঘোষণা হয়।
সাধারণ ব্যালট পেপারের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালট যুক্ত হওয়ায় এবার ভোট গণনা ও ফল ঘোষণায় তুলনামুলক সময় বেশি লাগবে বলে জানিয়ে রেখেছে ইসি।
সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোট চলবে।
সাধারণত ভোটগ্রহণ শেষে নির্ধারিত আইন-বিধি মেনে কেন্দ্রে ভোট গণনা ও ফল বিবরণী তৈরি করে কেন্দ্রে টানিয়ে দিতে হয়।
প্রিজাইডিং অফিসার এ ফল জানিয়ে দেন। এরপর সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছে তা দেওয়া হয়। রিটার্নিং অফিসারের কাছে ভোটের ফলসহ সংশ্লিষ্ট সামগ্রী পৌঁছাতে হয়। রিটার্নিং অফিসার সব কেন্দ্র একীভূত করে প্রাথমিক বেসরকারি ফল ঘোষণা করেন।
পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনে ফলের বার্তা শিট পাঠাতে হয়। নির্বাচন কমিশন বেসরকারি ফল ঘোষণা করেন।
তিন পার্বত্য জেলা ও দুর্গম চরাঞ্চলের ফল জানা গেলেও আনুষ্ঠানিকতা সারতে বিলম্ব ঘটে।
ফলাফল একত্রীকরণ ও ঘোষণার ধাপ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ভোট গণনা ও ফল একত্রীকরণ নিয়ে রিটার্নিং অফিসারদের বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
এ বিষয়ে ইসির পরিপত্রে ভোটের দিন ভোটগ্রহণ কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর থেকে নির্বাচনি ফল একত্রীকরণ ও ফল ঘোষণা পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের সুস্পষ্ট কিছু নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

ভোটকেন্দ্রেই গণনা ও প্রকাশ
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রিজাইডিং অফিসারকে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত প্রার্থী, নির্বাচনি অথবা পোলিং এজেন্ট, পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মীর সামনে ভোট গণনা শেষ করতে হবে।
কোনো অবস্থাতেই কেন্দ্রের বাইরে গণনা করা যাবে না। ভোট গণনার বিবরণী কেন্দ্রের নোটিস বোর্ড বা দেয়ালে বা বেড়ায় টানিয়ে প্রকাশ করতে হবে।
ভোট গণনা শেষে ব্যবহৃত ব্যালট প্যাকেট, গণনার বিবরণী, ব্যালট হিসাব এবং অন্যান্য নির্বাচনি কাগজপত্র আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় সহকারী রিটার্নিং অফিসারের মাধ্যমে সরাসরি রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠাতে হবে।
ভোট গণনার সময় প্রার্থীর নির্বাচনি কিংবা পোলিংএজেন্ট যারা উপস্থিত থাকেন, প্রতিটি বিবরণী ও প্যাকেটে তাদের স্বাক্ষর নিয়ে রাখবেন প্রিজাইডিং অফিসার। স্বাক্ষর দিতে অস্বীকার করলে তাও লিখে রাখতে হবে।
কেন্দ্রে ভোট গণণার সময় প্রার্থীর নির্বাচনি কিংবা পোলিংএজেন্ট অনুপস্থিত থাকলে কিংবা এজেন্ট না পাঠালে সেটাও লিখিতভাবে রেকর্ড রাখতে হবে।
কোনো প্রার্থী ও এজেন্ট ভোট গণনার বিবরণী বা ব্যালট পেপারের প্রত্যয়িত অনুলিপির আবেদন করলে তা দিতে হবে এবং প্রাপ্তি স্বীকার নিতে হবে। প্রাপ্তি স্বীকার দিতে অস্বীকার করলে প্রিজাইডিং অফিসারকে তাও লিপিবদ্ধ করে রাখতে হবে।
প্রিজাইডিং অফিসার কেন্দ্রের ভোট গণনার বিবরণী নির্ধারিত ফরমে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছে হস্তান্তর করবেন। ডাকযোগে নির্বাচন কমিশনের কাছেও সঙ্গে সঙ্গে পাঠাতে হবে এক কপি। একটি কপি কেন্দ্রের বাইরে দর্শনীয় স্থানে সাঁটিয়ে দিতে হবে।

প্রতি আসনে ফল একত্রীকরণ ও ঘোষণা
ভোটগ্রহণের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফল একীকরণের কাজ শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে ইসির।
প্রার্থী ও এজেন্টদের আগেই ফল একত্রীকরণের স্থান ও সময় নোটিসের মাধ্যমে জানিয়ে দেবেন রিটার্নিং অফিসার।
প্রিজাইডিং অফিসারের পাঠানো সাধারণ ভোটকেন্দ্রের ফল বিবরণী (ফরম-১৬) এবং পোস্টাল ব্যালটের (দেশের ও বিদেশের) ফল বিবরণী (ফরম-১৬ক) একসাথে যোগ করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ফল প্রস্তুত হবে।
ফল একত্রীকরণের আগে রিটার্নিং অফিসার প্রয়োজন মনে করলে প্রিজাইডিং অফিসার যেসব ব্যালট পেপার বাতিল করেছেন, তা পরীক্ষা করতে পারেন।
নির্বাচনের ফল নির্ধারণের পর অবশ্যই ইসি সচিবালয়ে একীভূত ফল বিবরণীসহ একটি রিটার্ন (গেজেট প্রকাশের জন্য) পৌছানোর ব্যবস্থা নেবেন রিটার্নিং অফিসার। একই সঙ্গে গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নির্বাচিত প্রার্থীর নাম প্রকাশ করতে হবে।
ভোট গণনার ফল একত্রীকরণে যদি দুই বা ততোধিক প্রার্থীর ভোট সমান হয়, রিটার্নিং অফিসার কমিশনে লিখিত প্রতিবেদন দেবেন। কমিশনের নির্দেশনা পেলে সমান ভোট পাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে পুনরায় ভোটের ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রাথমিক বেসরকারি ফল যেভাবে
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে প্রাথমিক বেসরকারি ফল সংগ্রহ করা হয়। রিটার্নিং অফিসারের কাছ থেকে ফল সংগ্রহ করতেই কেন্দ্রীয়ভাবে ‘নির্বাচনী ফলাফল সংগ্রহ ও পরিবেশন কেন্দ্র’ স্থাপন করা হবে।
একইভাবে রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে একটি ‘নির্বাচনি ফল সংগ্রহ ও পরিবেশন কেন্দ্র’ থাকবে। ভোটের দিন সকাল থেকে ইসি সচিবালয়ে ফল না পৌঁছানো পর্যন্ত এটা খোলা থাকবে। এখান থেকে ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ পরিস্থিতি ও ফল কমিশনে জানানো হবে।
নির্বাচনি ফল সংগ্রহ ও পরিবেশন কেন্দ্রের মাধ্যমে ফল গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রিজাইডিং অফিসারদের পাঠানো ফল ‘আরএমএসে’ অন্তর্ভুক্ত করে বার্তাশিটের মাধ্যমে রিটার্নিং অফিসার ও কমিশন সচিবালয়ে পাঠাতে হবে। প্রতিটি বার্তাশিটে ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা, প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট, ভোটের শতকরা হার এবং বাতিল ভোটের সংখ্যা থাকবে।
নির্বাচন শেষে সব নির্বাচনি কাগজপত্র সরকারি কোষাগারে (ট্রেজারিতে ডাবল লকে) সংরক্ষণ করতে হবে। সর্বোচ্চ নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২ হাজারের কাছাকাছি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত প্রচার চালাতে পারবেন প্রার্থীরা। ভোটগ্রহণ হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।

ভোট গণনায় সময়ের দিকে নজর
সংসদ ও গণভোট একসঙ্গে হওয়ায় ভোট গণনার দিকে নজর সবার। ইতোমধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বৈঠকেও বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
গত ২৮ জানুয়ারি ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, সংসদ ও গণভোটের সার্বিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জেনেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধি দল। বিশেষ করে পোস্টাল ব্যালট নিয়ে আগ্রহ ছিল বেশি। কীভাবে পোস্টাল ব্যালট আসছে, গণনা কীভাবে হবে, সার্বিক বিষয়ে তারা জেনেছেন।
“আমরা পোস্টাল ব্যালটের নমুনা নিয়ে সব দেখিয়েছি। কীভাবে ভোট কাউন্ট করা হবে, কোথায় আসবে, গণভোটের ব্যালটের সঙ্গে গণনার সময়সীমা কত, ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়, যেগুলো জানতে চেয়েছেন তিনি। উনারা বলেছেন, ‘এটা বেশি জটিল ও কষ্টসাধ্য বাপার’।”
ইসি সচিব বলেন, “ভোটগণনার ক্ষেত্রে এবার একটু সময় বেশি লাগবে। এবার ভোটাররা দুটো ব্যালটে ভোট দেবেন। এর সঙ্গে পোস্টাল ব্যালটের গণনা রয়েছে। এ কারণে গণনায় এবার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগবে।”
১৯৭৭ সালে প্রথম গণভোটে ফল ঘোষণায় ৩০ ঘণ্টা সময় লেগেছে। এবার সংসদ ও গণভোট একসঙ্গে হচ্ছে। ভোটার বেড়ে হয়েছে ১৩ কোটি।
অবশ্য নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, ফল ভোটের দিন রাতেই অথবা পরদিন প্রকাশ করা সম্ভব হতে পারে।