Published : 02 Jun 2026, 09:10 PM
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সি স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ চিত্র উঠে এল দুই সাক্ষীর জবানবন্দিতে।
মঙ্গলবার তাদের জবানবন্দি শুনে আদালতে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে পড়েন। কাউকে কাউকে কাঁদতেও দেখা যায়।
ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এদিন মামলার ১৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন।
সাক্ষ্যগ্রহণের পাশাপাশি তাদের জেরাও হয়েছে। আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানির দিন রাখা হয়েছে বুধবার।
বেলা ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। দুপুরের বিরতির আগে রামিসার বাবা-মা, বোনসহ ১০ জন সাক্ষী দেন।
সাক্ষ্যগ্রহণের দিন থাকায় দুই আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে আদালতে হাজির করা হয়।
আদালতের দুপুরের বিরতির পর শুরু হয় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণ। ১১তম সাক্ষী সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী এসআই মো. ইকবাল হোসেন সে সময় জবানবন্দি দেন।
তিনি বলেন, “ঘটনাস্থল থেকে একটি জর্জেটের ওড়না উদ্ধার করা হয়, যা দিয়ে শিশুটির মুখ বেঁধে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল।”
গুমের উদ্দেশ্যে রামিসা দেহ খণ্ডিত করা হয়েছেল তুলে ধরে তিনি বলেন, বাথরুমে একটি বালতির ভেতর পাওয়া যায় শিশুটির মাথা। তার শরীরের অন্য স্থানেও ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল।
সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা এই পুলিশ কর্মকর্তা তার দেখা বিষয়গুলো তুলে ধরতে গিয়ে একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার কান্নায় আদালতের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে ওঠে। উপস্থিত আইনজীবী ও আদালত সংশ্লিষ্ট অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
এরপর ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক নুসরত জাবীন জবানবন্দি দেন।
রামিসার খণ্ডিত দেহের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, শরীরজুড়ে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। দুই ঠোঁট কাটা ছিল এবং বুকের বাম পাশে আঘাতের দাগ পাওয়া যায়। সবচেয়ে ভয়াবহ হল, শিশুটির জননাঙ্গে গুরুতর ক্ষত ছিল।
পরে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ সাক্ষ্য দেন।
সুরহাতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী এসআই মো. ইকবাল হোসেন আবার জবানবন্দি দিতে ওঠে আদালতে জব্দ তালিকা উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে ছিল সেই বালতি, যেখানে রামিসার কাটা মাথা রাখা হয়েছিল। এছাড়া বাসার মূল ফটকের তালা, আসামিদের বাসার কক্ষের জানালার কাটা গ্রিল, রামিসার জর্জেটের ওড়না, জুতা ও জামাকাপড় জব্দ তালিকায় ছিল।
তিনি বলেন, বেলা পৌনে ১২টায় সুরতহাল শুরু করেছিলেন এবং প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তা চলে।
পুলিশের ‘কুইক রেসপন্স টিমের’ সদস্য এসআই রাশেদুল তার জবানবন্দিতে বলেন, পল্লবীতে হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে তদন্ত কর্মকর্তা অহিদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে নারায়ণগঞ্জ থেকে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।
তিনি আদালতকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আসামি স্বীকার করে, রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এরপর লাশ গুমের দেহ খণ্ডিত করা হয়, তার শরীর রক্ষবিক্ষত করার হয়।
সবশেষে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অহিদুজ্জামান আদালতে সাক্ষ্য দেন। তিনি বলেন, আসামিদের থানাহাজতে রেখে তিনি জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং তাদের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করেন। একই দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আশপাশের সিসিটিভি ভিডিও সংগ্রহ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে এক নম্বর আসামি সোহেল রানা স্বেচ্ছায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে সম্মত হন এবং পরে আদালতে জবানবন্দি দেন।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, “ডিএনএ রিপোর্টে দেখা গেছে মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামতগুলো পানি দিয়ে ধুয়ে নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আসামিরা একই ফ্লোরে বসবাস করতেন। কমন বাথরুমে নিয়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়। উপর্যুপরি আঘাতে রামিসা নিস্তেজ হয়ে পড়লে তাকে হত্যা করা হয়। পরে লাশ গুমের উদ্দেশ্যে দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করা হয়।
তিনি বলেন, “রামিসার মা বারবার ডাকাডাকি করলেও আসামিরা দরজা খোলেনি। বরং তখনও তারা লাশ গুমের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।”
এরআগে একই ভবনের বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে শব্দ শুনে নিচে নেমে দেখেন রামিসার মা সোহেল রানার দরজায় ধাক্কা দিচ্ছেন। পরে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে রক্ত দেখতে পান। স্বপ্নাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। ভেতরের আরেকটি গেট তালাবদ্ধ ছিল। সেটি খোলার রামিসার মাথাবিহীন মরদেহ দেখতে পান।
প্রতিবেশী জাকিরুল ইসলাম রাজনও প্রায় একইরকম বর্ণনা দিয়ে জবানবন্দি দেন। আরেক প্রতিবেশী আবু সামা বলেন, সকাল প্রায় ১০টার দিকে নাস্তা করছিলেন, তখন দেখেন পাশের বাসার জানালা বেয়ে এক ব্যক্তি খালি গায়ে নিচে নামছে।
“আমি তাকে চোর মনে করে ‘চোর চোর’ বলে চিৎকার করি। পরে পাশের বাসা থেকে চিৎকার শুনে গিয়ে রামিসার মরদেহ দেখি।”
আরেক সাক্ষী মনিরুজ্জামান শাহীন আদালতে বলেন, “ঘটনাস্থলে গিয়ে একটি পাতলা ছুরি এবং বালতির মধ্যে রামিসার মাথা দেখতে পাই।”
গেল ১৯ মে দুপুরে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ বলেছে, ওইদিন সকালে পাশের ফ্লাটের বাসিন্দা ৩২ বছরের সোহেল শিশুটিকে গলা কেটে হত্যার পর মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এরপর ফ্ল্যাটের সাবলেট এই ভাড়াটে গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। তবে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ঘরেই ছিলেন।
পুলিশ বাসা থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। সন্ধ্যায় সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সোহেল রানা আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুইজনকে আসামি করে ঘটনার দিনই পল্লবী থানায় মামলা করেন।
মামলাটি তদন্ত করে গত ২৪ মে তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান দুইজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালত অভিযোগপত্রটি দেখে বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় বদলির আদেশ দেন। মামলাটি ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। মঙ্গলবার অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
আরও পড়ুন: