Published : 24 Sep 2025, 10:30 PM
সাড়া পাওয়ার আশা কম হলেও পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসীদের ভোট নিতে জনপ্রতি ৭০০ টাকা খরচের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারদের জন্য ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ নামের যে অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে, নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে তা উদ্বোধন করা হবে।
বুধবার নির্বাচন ভবনে ‘আউট অব কান্ট্রি ভোটিং’ বিষয়ে লন্ডনে বাংলাদেশ হাই কমিশন এবং যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে অনলাইনে মত বিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।
পোস্টাল ব্যালটে ভোটের জন্য কমিশনের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে সানাউল্লাহ বলেন, “এবার প্রবাসীদের ভোটপ্রতি সরকার ৭০০ টাকা ব্যয় করবে। কিন্তু পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধন ও ভোট দেওয়ার হার কম। ব্যয়বহুল হলেও যৌক্তিক বিবেচনায় পোস্টাল ভোটিং করা হচ্ছে; আর প্রত্যাশাকেও সীমিত রাখতে হবে।”
পোস্টাল ব্যালটের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রবাসীদের পোস্টাল ভোটিয়ে নিবন্ধনের হার মাত্র ২.৭%; তাদের মধ্যে ভোট দেওয়ার প্রবণতা ৩০ শতাংশের নিচে। ভারতে সবশেষ চার কোটি প্রবাসীর মধ্যে ১ লাখ ১৯ হাজার নিবন্ধন করেছেন; আর নির্বাচনে মাত্র ২ হাজার ৯০০ জন ভোট দিয়েছেন।”

অতীতের সীমাবদ্ধতা কাটল কীভাবে
নির্বাচনি আইনে প্রবাসীদের ভোটের ব্যবস্থা থাকলেও ২০০৮ সাল থেকে একটি ভোটও নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়নি।
নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার দিতে প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার পর বর্তমান নির্বাচন কমিশন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে শুরু করে এবং ‘আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিংয়ের’ সিদ্ধান্ত নেয়।
অতীতে ইসির সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতীক বরাদ্দের পর ভোটের বাকি থাকে ২০-২১ দিন। ব্যালট ছাপানোর পর রিটার্নিং অফিসারের কাছে পৌঁছাতে ১০-১২ দিন সময় লাগে। তখন বাকি থাকে ৭ থেকে ১০ দিন।
“যারা প্রবাসে থাকেন তাদের জন্য এই ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ব্যালট আনা-নেওয়া সম্ভব ছিল না বলেই আজ পর্যন্ত একটি ভোটও প্রবাস থেকে কাস্ট করা যায়নি।”
এ সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখে বর্তমান ইসির উদ্যোগ তুলে ধরে নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ বলেন, “আমরা এখন একটা বিকল্প ব্যবস্থা করেছি। আমরা ব্যালটের চেহারাটা পরিবর্তন করেছি। আমরা একটা হাইব্রিড সলিউশন এখানে ইন্ট্রোডিউস করতে যাচ্ছি।
“যারা ভোট দেবেন, তারা অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করবেন, তাদের কাছে ব্যালটটা আগেই চলে যাবে। এই ব্যালটটা হবে শুধুমাত্র প্রতীক সম্মলিত ব্যালট।”
এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, ব্যালটে একটি নির্দেশনা থাকবে এবং তার জন্য একটি ঘোষণাও থাকবে।
“নির্দেশনাতে লেখা থাকবে, তিনি কবে নাগাদ এই ভোটটা দিতে পারবেন। অর্থাৎ বাংলাদেশে যখন প্রতীক বরাদ্দ হবে, চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা কনফার্ম হবে, এরপরে তিনি তার মোবাইল ফোনে অ্যাপের মাধ্যমে অথবা আমাদের ওয়েবসাইটে দেখতে পাবেন যে তার সংসদীয় আসলে চূড়ান্ত প্রার্থী কারা। কজন দাঁড়িয়েছেন এবং তাদের প্রতীক কী।
“এটা দেখার পরে তিনি ভোট দেবেন এবং ভোট দেওয়ার পরে উনি এই খামটি আবার ফেরত পাঠাবেন।”
পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়া, আনা-নেওয়ায় ভোটারের কোনো অর্থ ব্যয় করতে হবে না। সরকার পুরো অর্থ বহন করবে বলে জানান সানাউল্লাহ।
তিনি বলেন, “এবারের ভোটের জন্য প্রবাসীদেরকে কোনো ধরনের চার্জ অ্যাপ্লাই করছি না। যদিও প্রতিটি ভোট কাস্ট করতে সরকারের তথা নির্বাচন কমিশনের খরচ হবে আনুমানিক ৭০০ টাকা। এর মধ্যে ৫০০ টাকা যাবে প্রবাসে আনা নেওয়ায়। আর বাকি খরচ ২০০ টাকা অন্যান্য খাতে। এটি ব্যয়বহুল বিষয়, ডেফিনেটলি। তবে আমরা মনে করি এটি একটি যৌক্তিক ব্যয়।”
ভোট দিতে নিবন্ধনের প্রক্রিয়াও তুলে ধরেন এ নির্বাচন কমিশনার। তিনি জানান, এখানে প্রবাসীদের দুইবার নিবন্ধনের বিষয় আছে। একবার ভোটার হিসেবে নিবন্ধন। আরেকবার ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন।
“যাদের হাতে বাংলাদেশের এনআইডি আছে তিনি ভোটার; তিনি ভোটার তালিকায় ইতোমধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। স্মার্ট এনআইডি, ১০ ডিজিটের বা ১৩/১৭ ডিজিটের লেমিনেটেডে এনআইডি যদি থাকে, বা বায়োমেট্রিক্স যদি দিয়ে থাকেন এবং দেশের ঠিকানায় ভোটার তালিকাভুক্ত হয়ে থাকেন, তিনি ভোট দিতে পারবেন।”
প্রবাসী ভোটারদের নিবন্ধন অ্যাপ উদ্বোধনের প্রস্তুতি চলছে জানিয়ে সানাউল্লাহ বলেন, “আউট অফ কান্ট্রি ভোটিং রেজিস্ট্রেশন অ্যাপটা ডেভেলপ করছি এবং ইনশাআল্লাহ নভেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে উদ্বোধন হবে। সেকেন্ড উইকে আমরা চেষ্টা করছি, লেটেস্ট বাই থার্ড উইক অব নভেম্বর, এ অ্যাপটা লঞ্চ হবে। আমরা আগে থেকে সার্কুলার দিয়ে জানিয়ে দেব। পৃথিবীর যে কোনো অঞ্চল থেকে রেজিস্ট্রার করতে পারবেন ভোটাররা।”
নিবন্ধনের জন্য কত সময় দেওয়া হবে, সেই তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “সাধারণভাবে আমরা ৭ থেকে ১০ দিন প্রত্যেক রিজিয়নকে দেব। সবশেষে আমরা চেষ্টা করব আরো তিন থেকে সাত দিন সময় রাখার, যাতে করে বাদ পড়া ভোটার যারা আছেন হয়ত তারা সুনির্দিষ্ট সময়ে রেজিস্ট্রেশনটা সম্পন্ন করতে পারেন নাই, ওই সময় যাতে রেজিস্ট্রেশনটা সম্পন্ন করতে পারেন।”

ইসির আশা সীমিত
নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ বলেন, ভারত গত তিনিটি নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোট নেওয়া হয়েছে। সবশেষ নির্বাচনে প্রায় চার কোটি ভোটার প্রবাসীর মধ্যে ভোটের জন্য নিবন্ধন করেছিলেন মাত্র ১ লাখ ১৯ হাজার। আর ভোট দিয়েছিলেন মাত্র ২ হাজার ৯০০ জন।
পাকিস্তান এখন পর্যন্ত প্রবাসীদের ভোটে আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। শ্রীলঙ্কা অনলাইনে বেশ কিছু পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছে।
মালয়েশিয়ার প্রায় ১৮ লাখ নাগরিক প্রবাসে আছেন। তারা গত তিন নির্বাচন ধরে চেষ্টা করে সর্বশেষ নির্বাচনে নিবন্ধন করাতে পেরেছে ৫৪ হাজার। সেখানে ভোটারদের পোস্টাল ব্যালটের খরচ দিতে হয় বলে আগ্রহও কম কাজ করে।
প্রবাসে বাংরাদেশির সংখ্যা ১ কোটি ৪০ লাখ থেকে দেড় কোটির মত। এত বড় জনগোষ্ঠীকে বাদ রেখে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন ভাবাটাই অমূলক মনে করে ইসি।
আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ভারতে নিবন্ধিত প্রবাসীদের মধ্যে ভোটদানের হার ৩০ শতাংশের নিচে, তবে বাংলাদেশের প্রবাসীদের মধ্যে ভোট নিয়ে আগ্রহ তুলনামূলক বেশি বলে তাদের মনে হয়েছে।
“আমাদের এটা শুরু করতে হবে। যে স্কেলেই হোক না কেন। আমাদের প্রত্যাশাটা হয়ত একটু লিমিটেড স্কেলে রাখতে হবে। বাট আমরা ডেফিনেটলি ফেল করব না। ইনশাআল্লাহ আস্তে আস্তে সবাই এটার সাথে সম্পৃক্ত হবেন।”

বড় চ্যালেঞ্জ কী
প্রবাসীদের নিবন্ধন ও ভোটদানের প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ।
তিনি বলেন, পোস্টাল ব্যালটের ‘গ্লোবাল ওয়েস্টেজ রেট’ ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি চারটা পোস্টাল ব্যালটের একটা দেশে এসে পৌঁছায় না।
“এর অন্যতম কারণ হচ্ছে ইন্ডিভিজুয়াল ভোটার যখন ওসিবির জন্য রেজিস্ট্রেশন করেন, যে ঠিকানাটা দেন, সেই ঠিকানায় ডাকটা পৌঁছায় না। আবার অনেকে আছেন, ডাক পৌঁছায়, কিন্তু আর সময়মত ভোটটা দিয়ে পোস্ট করেন না। সময় মতন ফেরত না আসার কারণে এটা গণনার মধ্যে নেওয়া সম্ভব হয় না।
“আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মূলত দুইটা। এক নম্বর চ্যালেঞ্জ হচ্ছে গোপনীয়তার। ইন্ডিভিজুয়াল ভোটাররা যেন এই গোপনীয়তাটা রক্ষা করেন এবং সময় মতন ভোটটা দেন। কেউ যেন তার ভোটে তাকে ইনফ্লুয়েন্স করতে না পারে।
তিনি জানান, ভোটারদের কাছ থেকেও এক ধরনের ঘোষণা নেওয়া হবে যে, তিনি কাকে ভোট দিয়েছেন তা তিনি প্রচার করবেন না।
“আর দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ যেটা হচ্ছে, চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা নিশ্চিত হওয়ার পরে (প্রবাসীর) ভোট শুরু হয়ে যাবে। কিন্তু যদি কোনো আসনে শেষ মুহূর্তে আদালতের আদেশে প্রার্থী তালিকা পরিবর্তন হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে সেই আসনে বিদেশ থেকে সংগ্রহ করা সকল ভোট বাদ পড়ে যাবে।”
আগামী রোজার আগে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ভোটের জন্য ডিসেম্বরে তফসিল দেওয়ার কথা রয়েছে এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের।
পুরনো খবর
প্রবাসী ভোট: কীভাবে পোস্টাল ব্যালট সামলাবে ইসি, চ্যালেঞ্জ কোথায়?