Published : 01 Aug 2025, 12:47 AM
জুলাই মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় নয়জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)।
এই নয়জনের মধ্যে চারজন বিএনপির। আর পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে গোপালগঞ্জের সংঘাতে।
বিএনপির চারজনের মধ্যে তিনজনই দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে আর একজন জামায়াতের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন।
এর বাইরে বিএনপির আরও চার নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন আততায়ীর হাতে। এছাড়া বিএনপির এক কর্মীর লাশ উদ্ধার হয়েছে, যেটিকে রহস্যজনক বলছে পুলিশ।
নিহত ওই ব্যক্তি যুবদলের এক নেতার সহযোগী ছিলেন, যেই যুবদল নেতাও চার দিন আগে খুন হন।
জুলাই মাসের শেষ দিনে বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এমএসএফ এর মাসিক মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে দাবি করে প্রতিবেদনে বলা হয়, “ধর্ম অবমাননা এবং নানা অজুহাতে সনাতন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা বন্ধ হয়নি, বরং মাইকিং করে জনবল সৃষ্টি করে ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে।
“সীমান্তে হতাহতের ঘটনা বন্ধ হয়নি, বরং অনেকটাই বেড়েছে, সেই সাথে পুশইনের ঘটনা রয়েই গেছে।
“অপরদিকে পার্বত্য এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার অব্যাহত রয়েছে। গণপিটুনি ও মব সহিংসতার মত আইন হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা বন্ধ হয়নি, বরং সরকারের নিষ্ক্রিয়তায় এ বিষয়ে নাগরিকদের জীবনে আতংঙ্ক ও নিরাপত্তহীনতা বেড়েছে।”
জুনে মাসে ৪৯টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছে জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, “এসব অজ্ঞাতনামা লাশের বেশিরভাগই নদী বা ডোবায় ভাসমান, মহাসড়ক বা সড়কের পাশে, সেতুর নিচে, রেললাইনের পাশে, ফসলি জমিতে ও পরিত্যক্ত স্থানে পাওয়া যায়। অল্প সংখ্যক মৃতদেহ গলা কাটা, বস্তাবন্দি ও রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।”
‘মব’ তৈরি করে ১৬ হত্যা
প্রতিবেদনে এমএসএফ বলছে, জুলাই মাসে ‘মব’ সহিংসতায় গণপিটুনির অন্তত ৫১টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৬ জন নিহত ও ৫৩ জন গুরুতরভাবে আহত হয়েছে। গণপিটুনির শিকার ৩০ জনকে আহতাবস্থায় পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে দুজন ছিনতাইয়ের অভিযোগে, আটজনকে চোর সন্দেহে, একজনকে খুনের অভিযোগে, তিনজনকে মাদক কারবারের অভিযোগে, একজনকে বিএনপি কার্যালয়ের ভাড়া চাইতে গেলে ‘মব’ সৃষ্টি করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আরও একজনকে রাজনৈতিক কারণে হত্যা করা হয়। আহতদের মধ্যে সাতজনকে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছিল ‘আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী’ হওয়ার অভিযোগে।
জুনে মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে ১০ জন নিহত হওয়ার তথ্য এমএসএফের প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল।
সীমান্তে ৬ হত্যা
সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে বাংলাদেশিদের নির্যাতন ও হত্যা বন্ধ হয়নি তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, এই জুলাই মাসে সীমান্তে বিএসএফের ছোড়া গুলিতে ছয়জন নিহত ও গুলিবিদ্ধ হয়ে একজন বাংলাদেশি নাগরিক আহত হয়েছেন। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফের নির্যাতনে আহত হন আরও একজন। এছাড়াও ভারত সীমান্তবর্তী এলাকার নদীতে এক দিনমজুরের মৃতদেহ ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায়।
অপরদিকে মিয়ানমার সীমান্তে নাইক্ষ্যংছড়িতে একটি স্থলমাইন বিস্ফোরণে একজন আহত হন, যার ফলে সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকেরা ‘উৎকন্ঠা ও আতংকের’ মধ্যে জীবনযাপন করছেন।
এছাড়া সীমান্তে ‘পুশইন’ বন্ধ না হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই মাসে বিএসএফ ১৫৬১ জনকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। জুনে এই সংখ্যা ছিল ১১০২ জন।
রাজনৈতিক সহিংসতা
জুলাই মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ৪২টি ঘটনা ঘটার তথ্য দেওয়া হয়েছে এমএসএফের প্রতিবেদনে। এই ৪২টি সহিংসতার মধ্যে বিএনপির অন্তঃদ্বন্দ্বে ২৭টি, বিএনপি-আওয়ামী লীগের সংঘর্ষে ২টি, এনসিপির অন্তঃদ্বন্দ্বে ২টি, বিএনপি-এনসিপি দ্বন্দ্বে ৩টি, বিএনপি-পুলিশ সংঘর্ষের ১টি, এনসিপি-পুলিশ-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে ১টি, বিএনপি-জামাত সংঘর্ষে ৪টি, আওয়ামী লীগ-জামাত সংঘর্ষের ১টি ও উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়ার অনুসারী ও বিএনপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ১টি ঘটনা ঘটেছে।
গোপালগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘাতে পাঁচজনের প্রাণহাণির বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “সরকার স্বীকার করেছে তাদের কাছে গোয়েন্দা রিপোর্ট ছিল, তবে এতবড় ঘটনা ঘটবে তা জানা ছিল না। সঠিক তথ্য না থাকার এই ব্যর্থতার দায় সরকার কিভাবে এড়িয়ে যাবে?”
বিএনপির ৮ জন নিহত
জুলাই মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত নয়জনের মধ্যে গোপালগঞ্জের পাঁচজন বাদে বাকি চারজনই বিএনপির বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এদের মধ্যে একজন জামায়াতের হামলায় নিহত হন। বাকিরা প্রাণ হারিয়েছেন দলীয় সংঘাতে।
এর মধ্যে ১৫ জুলাই কক্সবাজারে জামায়াত নেতাকর্মীদের হামলায় আহত রহিম উল্লাহ সিকদার নামে এক বিএনপি নেতা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
৫ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে সোহরাব মিয়া নামে ছাত্রদলের এক নেতা নিহত হয়েছেন।
১৬ জুলাই পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনায় আহত মুবিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকায় ১৭ জুলাই মারা গেছেন।
রংপুরের বদরগঞ্জে ৫ এপ্রিল বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত বিএনপির কর্মী শফিকুল ইসলাম ২৫ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
সংঘাত ছাড়াও আরও কয়েকজন বিএনপি নেতা-কর্মী খুন হওয়ার তথ্য দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ১ জুলাই রাজধানীর মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে দুর্বৃত্তদের হামলায় মো. মিন্টু (২৫) নামের এক বিএনপি নেতা নিহত হয়েছেন।
২ জুলাই ঢাকার দোহার উপজেলায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে হারুনুর রশিদ (৬৫) নামের বিএনপির এক নেতা নিহত হয়েছেন।
৬ জুলাই চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের ইশান ভট্রের হাট নামক স্থানে বেলা ১২টার দিকে মো. সেলিম (৪২) নামে এক যুবদল কর্মীকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
১১ জুলাই খুলনা মহানগরীর দৌলতপুর থানা যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি মাহবুবুর রহমানকে (৪০) বেলা দেড়টার দিকে নিজ বাড়ির সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
এছাড়া আরও এক যুবদল কর্মীর লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ বলছে, তার ‘রহস্যজনক’ মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রামের রাউজানের যুবদল কর্মী মো. দিদারুল আলম রিংকুর (৪০) মরদেহটি উদ্ধার করা হয় রাঙ্গামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম লুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে। ৯ জুলাই রাত থেকে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। দিদারুল রাউজানের যুবদল নেতা সেলিমের সহযোগী ছিলেন, সেলিম খুন হন ৬ জুলাই দুপুরে।
ছাত্রলীগ-যুবলীগ খুন
এমএসএফের জুলাই মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ সময়ের মধ্যে অন্তত দুজ্ন ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। ‘রহস্যজনক’ মৃত্যু হয়েছে একজনের।
এর মধ্যে ৮ জুলাই কক্সবাজারের উখিয়ার জালিয়ার মনখালীর ইউপি সদস্য ও যুবলীগ নেতা কামাল হোসেনের বস্তাবন্দি লাশ পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, তাকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। সোমবার থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন।
১৯ জুলাই নিঁখোজ হন ছাত্রলীগ কর্মী সুইট (২১)। তার মরদেহ ২১ জুলাই উদ্ধার করেছে পুলিশ। তার গলায় আঘাতের চিহ্ন ছিল।
১১ জুলাই চট্টগ্রামের পটিয়ায় শামসেদ হিরু নামে এক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তার পরিবারের দাবি, শামসেদের পা মাটিতে লাগানো ছিল। কেউ পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করে লাশ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখেছে।