Published : 20 Jun 2026, 08:28 PM
সংবাদমাধ্যমে যেন কারও বিচার না হয়, সে বিষয়ে সাংবাদিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
শনিবার ঢাকা ক্লাবে সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার্স ফেরামের (এসআরএফ) বার্ষিক সাধারণ সভায় রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা এ পরামর্শ দেন।
সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়েও কথা বলেন তিনি।
কাজল বলেন, “আমাদের দেশে বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিচার হবে আদালতের মাধ্যমে। মিডিয়ার মাধ্যমে যেন কোনো কারণে বিচার না হয়, সেক্ষেত্রে আপনাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে।”
সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমাদের সংবিধানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কিন্তু সুনিশ্চিত, কিন্তু এটি সরাসরি ফান্ডামেন্টাল রাইটস কিন্তু না। এর কতগুলো ক্ষেত্রে আমাদের যৌক্তিক বিধিনিষেধ, বাধানিষেধ সাপেক্ষেই কিন্তু এটি। একদিকে যেমন জনগণের এবং প্রত্যেকটা মানুষের তথ্য জানার অধিকার আছে, তেমনিভাবে আপনারা অবাধ সংবাদ প্রবাহ সেটাও যেন সুনিশ্চিত থাকে তার একটা ব্যালেন্স করতে হবে।"
আপিল বিভাগে সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি তিনি প্রধান বিচারপতির কাছে উপস্থাপন করেছেন বলে অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন। বলেন, “প্রধান বিচারপতি বিষয়টি নিশ্চয়ই ভাববেন। আমার মনে হয় আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে যদি বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলাদাভাবে বিষয়টি বলতে পারি, আমি নিশ্চিত উনি আমাদের এই বিষয় বিবেচনা করবেন।"
আদালতের খণ্ডিত বক্তব্য প্রকাশের বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “অনেক সময় আমরা যখন বিচারিক প্রক্রিয়ায় অনেক বিচারপতির সঙ্গে যখন আইনজীবীদের যখন কথা বলি, সব কথা কিন্তু আলটিমেটলি রিপোর্টেড হয় না, চূড়ান্ত রায়ে কিন্তু প্রতিধ্বনিত হয়। কিন্তু একটা মামলা বোঝার জন্যে বিচারকদের পক্ষ থেকেও হয়তো অনেক মন্তব্য করা হয়... এই মন্তব্যগুলো অনেক সময় মাঝপথের কেউ টুইস্ট করে; এবং এর প্রেক্ষাপট যেহেতু কেউ জানতে পারে না, এগুলো কিন্তু অনর্থক একটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো ‘অপতথ্য’ ও ‘গুজব’ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এর অপব্যবহারের বিষয়ে সাংবাদিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেকোন ব্যক্তির যেকোন তথ্যকে হুট করে বিশ্বাস করা যাবে না।
প্রচলিত বিচার ব্যবস্থায় বাংলাদেশে মামলা জট কমানো কখনও সম্ভব নয় তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমাদের বিচারকের অপ্রতুলতা আছে, আমাদের অনেকের দক্ষতার অভাব আছে, অনেক ক্ষেত্রে মামলার নানা বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে যেটা আইনসম্মত হওয়া দরকার সেটি না হয়ে নানারকম ‘রাজনীতি’ কাজ করেছে। বিশেষ করে ৫ অগাস্টের পূর্ববর্তী দিনগুলোতে আমরা বাংলাদেশে বিভিন্ন বিচারিক অফিসারদের নানারকম অবিচারের কথা শুনেছি।”
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের এবং সেই রেফারেন্সগুলো, আপিলগুলো নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতি অতি সম্প্রতি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেছেন জানিয়ে কাজল বলেন, “আমি প্রত্যাশা করব মৃত্যুদণ্ডের আসামি যারা থাকেন... তাদেরও কিন্তু যত দ্রুত সম্ভব বিচার, বিচারের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয় খালাস অথবা তাদের সাজা বহাল করার অন্তত একটা রায় হওয়া দরকার; এবং এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব, এট সুনিশ্চিত করা।"
অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে সুরা সদস্য মোহাম্মদ শিশির মনির সাংবাদিকদের আপিল বিভাগে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে কথা বলেন।
তিনি বলেন, “যেহেতু সাংবাদিক বন্ধুগণ প্রচলিত প্রসিডিংয়ের সঙ্গে নিজেদেরকে পার্টিসিপেট করতে পারছেন না, আমার ধারণা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতেও এক ধরনের হ্যাম্পার ফিল হচ্ছে।"
এই সমস্যার সমাধানে একটি সুনির্দিষ্ট আচরণবিধি তৈরির প্রস্তাব করে তিনি বলেন, "এখন আমাদের মাননীয় প্রধান বিচারপতি যে কারণে কাজটা করেছেন, প্রয়োজন হলে ওই কারণটাকে ঠিক রেখে কোনো একটা সুলিখিত আচরণ বিধি তৈরি করে একদিকে সুপ্রিম কোর্টের স্ট্যান্ডার্ডও ঠিক থাকতে পারে, আরেকদিকে সাংবাদিক বন্ধুদেরও পেশাগত দায়িত্ব পালনে যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, এটাও হতে পারে।"
শিশির মনির প্রয়াত সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানের স্মৃতিচারণ করেন।
"প্রথম আলোতে যখন আর্টিকেল লিখতেন, তখন ওনার আর্টিকেল আমরা এত মনোযোগ দিয়ে পড়তাম যে অনেক সময় আমাদের লিগ্যাল রিসার্চকেও হার মানাত।"
জুলাইয়ের বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতির হয়ে যাওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, "জুলাইয়ের বিচারটা কেমন জানি ধীর হয়ে গেছে। এই বিচারটাকে দ্রুত করলেই যে সমাধান হয়ে যাবে আমি এটারও পক্ষে না। কিন্তু মান অনুযায়ী যেভাবে করা উচিত সেভাবেই করা উচিত।"
সুপ্রিম কোর্টে মামলাজট নিরসনের জন্য বিশেষ মামলা নিষ্পত্তিরি জন্য বিচারক নিয়োগের কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নবনির্বাচিত সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌসুলি মো. আমিনুল ইসলাম এবং এসআরএফের বিদায়ী সভাপতি মাসউদুর রহমান রানা বক্তব্য দেন।
এর আগে সুপ্রিম কোর্টের প্রতিবেদকদের সংগঠন এসআরএফের ২০২৬-২০২৭ মেয়াদের কমিটি ঘোষণা করা হয়।
নববির্বাচিত কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন ইত্তেফাকের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মো. দিদারুল আলম এবং দ্বিতীয়বারের মত সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন ঢাকা পোস্টের বিশেষ প্রতিনিধি মেহেদী হাসান ডালিম।
এছাড়া সহ-সভাপতি কালবেলার হেড অব নিউজ কবির হোসেন, যুগ্ন সম্পাদক বৈশাখী টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এজাজুল হক মুকুল, কোষাধ্যক্ষ স্টার নিউজের ইমন মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক কালের কন্ঠের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক পিয়াস তালুকদার, দপ্তর সম্পাদক যমুনা টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার মো. রাব্বি হোসেন, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ইমরান নাফিজ, প্রশিক্ষণ ও কল্যাণ সম্পাদক ডেইলি স্টারের সিরাজুল ইসলাম রুবেল নির্বাচিত হয়েছেন।
কার্য নির্বাহী কমিটির ৫ সদস্য হলেন- চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি মাজহারুল হক মান্না, আগামীর সময়ের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী, দৈনিক সমাচারের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আমিনুল ইসলাম মল্লিক, নাগরিক টিভির স্টাফ রিপোর্টার অলিউল ইসলাম রনি ও সময় টিভির স্টাফ রিপোর্টার সৈয়দা সাবরিনা মজুমদার।