কারাগারে ‘আয়নাবাজি’ আর নেই: ডিজি আনিসুল

মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া বন্দিদের যে আলাদা কক্ষে রাখা হয়, সেই ‘কনডেম সেল’ নিয়ে বাজারে ‘কাল্পনিক গল্প চালু আছে’ বলে কারা মহাপরিদর্শকের ভাষ্য।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 Jan 2024, 02:04 PM
Updated : 30 Jan 2024, 02:04 PM

বড় পর্দার ‘আয়নাবাজি’র মত বাস্তবে একজনের হয়ে আরেকজনের জেল খাটার ঘটনা এখন আর নেই বলে দাবি করেছেন কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ এস এম আনিসুল হক।

প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে একজনের নাম দিয়ে অন্যজনের এখন কারাগারে যাওয়ার ‘উপায় নেই’ বলে তার ভাষ্য।

আনিসুল হক বলেন, “এনটিএমসির (ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার) সঙ্গে সমন্বয় করে একটি ডেটাবেইজ তৈরি করা হয়েছে। একজন বন্দি যখন জেলখানায় প্রবেশ করে, তখন তার ফিঙ্গার প্রিন্ট, আইরিশ ও জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে এন্ট্রি করা হয়। সুতরাং আয়নাবাজি নিয়ে যে সিনেমা দেখেছি যে একজনের নামে আরেকজন…. এটা আর নেই।”

বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) নবনির্বাচিত কমিটি মঙ্গলবার সৌজন্য সাক্ষাত করতে কারা অধিদপ্তরে গেলে এ কথা বলেন কারা মহাপরিদর্শক।

তিনি বলেন, জামিনের তথ্য বন্দিদের না জানানো বা হয়রানির নানা ‘গল্প’ আছে। বাস্তবে এসব ‘ঠিক নয়’।

“আপনারা  (সাংবাদিক) কারাগারে গেলে দেখতে পাবেন, প্রতিটি কারাগারে দুটি বড় বড় ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড রয়েছে। একটি বোর্ডে দর্শনার্থীরা বিভিন্ন তথ্য জানতে পারবেন। আরেকটি থাকে কারাগারের ভেতরে।

“এতে সুবিধা যেটা হচ্ছে, কার জামিন হয়েছে- এটা আসা মাত্র ডিসপ্লেতে দেখানো হয়। যে আত্মীয় নিতে আসছেন উনিও দেখতে পান, আর যে বন্দি রয়েছেন তিনিও জানতে পারেন যে- তার জামিন হয়েছে।”

কারা মহাপরিদর্শক বলেন, “এই যে জবাবদিহিতার কালচার তা চেষ্টা করছি আমাদের মত করে সাজাতে।”

কারাবন্দিদের উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষ মনোযোগ দিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “জনবল বৃদ্ধির দিকেও আমরা মনোযোগী। প্রায় ৫ হাজার জনবল পাইপলাইনে রয়েছে রিক্রুট করার জন্য।”

ডিজি এ এসএম আনিসুল হক জানান, কারা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট রাজশাহীতে নির্মাণ করা হয়েছে, আর কারা প্রশিক্ষণ একাডেমি ঢাকার কেরাণীগঞ্জে বানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আলাপচারিতায় বন্দিদের ডান্ডাবেড়ি পরানোর বিষয়টিও আসে।

আনিসুল হক বলেন, “ডান্ডাবেড়ি কে দেয়? এটা পুলিশ দেয়। পুলিশ বন্দিকে যখন কারাগার থেকে বুঝে নেয়, তখন ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে দেওয়া হয়।

“(সংবাদমাধ্যমে) লেখালেখি করা হয় জেলখানায় ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা ঠিক না। পুলিশের রিকুইজেশন অনুযায়ী পরিয়ে দেওয়া হয়, কারণ ডান্ডাবেড়ি থাকে কারাগারে। পুলিশের চাহিদের পরিপ্রেক্ষিতে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে দেওয়া হয়।”

মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া বন্দিদের যে আলাদা কক্ষে রাখা হয়, সেই ‘কনডেম সেল’ নিয়ে বাজারে ‘কাল্পনিক গল্প চালু আছে’ বলেও মন্তব্য করেন আনিসুল।

“আসলে বন্দি কোনো গুহার মধ্যে থাকে না। সে তার নিরাপত্তায় পৃথক একটি কক্ষে থাকে। সেখানে তারা গোসল করা, বইপত্র পড়া আরও অনেক কিছু বরাদ্দ থাকে।”

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আনিসুল বলেন, “কনডেম বলে কিছু্ নেই। কারাবিধিতে লেখা থাকে, ওই বন্দি সাধারণ কয়েদিদের থেকে পৃথক থাকবে।  গল্পে গল্পে কালের বিবর্তনে চিঠিপত্রে আদালতে ভাষায় এটা হয়ে গেছে কনডেম সেল।”

বর্তমানে কয়েদি বন্দির চাইতে হাজতি বন্দির সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বলে তথ্য দেন কারা মহাপরিদর্শক।

তিনি বলেন, বর্তমানে ২০ হাজারের মত কয়েদি বন্দি থাকে, আর হাজতি থাকে ৫৫ থেকে ৬০ হাজারের মত।

বন্দিদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের বেশ কিছু উদ্যোগের কথা তুলে ধরে আনিসুল বলেন, বন্দিদের খাদ্য তালিকায় বেশ পরিবর্তন আনা হয়েছে। তাদেরকে সমাজে পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ চলমান। বর্তমানে ৩৮টি কারাগারে ৩৯টি ট্রেডে বন্দিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

কারা মহাপরিদর্শক বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার বন্দিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাতে এসব প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বন্দি যখন স্বাভাবিক জীবনে ফেরত যায়, তখন যেন কর্ম করে খেতে পারে।

“কর্ম অধিদপ্তর থেকে সিটিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে ৩৮টি কারাগার মনিটরিং করা হয়। সব কারাগারকে সেন্ট্রাল মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হবে। গুদাম থেকে বন্দিদের খাবার দেওয়া, বাজার ঢোকা, মাছের সাইজ, রান্নাঘর- সবকিছু মনিটরিং করা হয়।

“যদি বলা হয়, কাশিমপুর কারাগারে গত মাসের ওইদিন মাছ দেওয়া হয়নি। এটা প্রমাণ করতে আমার কোথাও যেতে হবে না। অধিদপ্তরে থেকে বের করতে পারব যে, ওইদিন খাবারে কি মেন্যু দেওয়া হয়েছিল।”

ক্র্যাব সভাপতি কামরুজ্জামান খান, সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলামসহ সংগঠনের সদস্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।