Published : 04 May 2026, 07:15 PM
‘জাতীয় দুর্যোগ’ বজ্রপাত বাংলাদেশে এমন প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে, যা ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার তুলনায় প্রতিবছর বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটাচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এগারো বছরে বজ্রপাতে দেশে ৩ হাজার ৬৫৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
এমন বাস্তবতায় বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক আয়োজিত এক কর্মশালায় বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে ‘পূর্বাভাস ও আগাম পদক্ষেপ’ দুটোই জরুরি বলে মত দিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা।
সংস্থার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সোমবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহযোগিতায় 'বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঝুঁকি হ্রাস ও প্রস্তুতি' শীর্ষক কর্মশালায় বজ্রপাতের ঝুঁকি রোধে চলমান উদ্যোগগুলো পর্যালোচনা, ঘাটতি ও চ্যালেঞ্জ শনাক্তকরণ এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গৃহীত উদ্যোগগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়।
কর্মশালায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব আবু দাউদ মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, "দেশে উচ্চ জনঘনত্বের কারণে কৃষক, শিশু-কিশোর ও নারীরা বজ্রপাতে মৃত্যুর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের অন্যতম। তাই এই ধরনের মৃত্যু কমাতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পূর্বাভাস, সচেতনতা বৃদ্ধি ও বজ্রনিরোধক যন্ত্রসহ উপযুক্ত আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।”
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করা আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক (চলতি দ্বায়িত্ব) মমিনুল ইসলাম বলেন, “তিন দিন আগে থেকে সতর্কবার্তা দেওয়ার পরও ২৬ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত বজ্রপাতে ৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগাম সতর্কবার্তা তখনই কার্যকর হয় যখন যথাযথভাবে সময়োপযোগী পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা হয়। এ জন্য সব স্তরের সহযোগিতা প্রয়োজন।”
বজ্রপাত সম্পর্কিত সুরক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপরই প্রাণহানি হ্রাসের পরিমাণ নির্ভর করে বলেও মত তার।
ব্র্যাকের দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির পরিচালক ড. লিয়াকত আলী বলেন, “পূর্বাভাসের সব তথ্য অবশ্যই সময়োপযোগী হতে হবে এবং প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য কয়েক ঘণ্টা আগে থেকে দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে প্রচার চালাতে হবে। বজ্রপাতে মুত্যুহার কমাতে সময়মত পূর্বাভাস প্রদান একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ। এ জন্য সব অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।”
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক দেশে বজ্রপাত প্রবণতা, ঝুঁকি এবং এর পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কতা বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
‘বজ্রঝড়, বজ্রপাত ও বাংলাদেশ পরিপেক্ষিত’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বজ্রপাত কোন ব্যক্তিকে পাঁচভাবে আঘাত করতে পারে। সরাসরি শরীরে পড়তে পারে, খুব কাছে থাকা কোন বস্তুতে বজ্রপাত হলে তার কিছু অংশ শরীরে পড়তে পারে। ভূমিতে বজ্রপাত হলে বিদ্যুৎ পানিতে প্রবাহিত হয়ে শরীরে আঘাত করতে পারে। কোন ধাতব বস্তুতে বজ্রপাত হলে তার সংস্পর্শে থাকা কোন ব্যক্তির শরীরে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে। আবার বজ্রপাতের কারণে ভূমিতে সৃষ্ট বিদ্যুৎ কোন ব্যক্তির শরীরে প্রবাহিত হতে পারে।
বজ্রপাতে সরাসরি আক্রান্ত না হলে আহত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। হাসপাতালে দূরে থাকলে, সম্ভব হলে সদ্য আহত ব্যক্তিকে দ্রুত কার্ডিও পালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) বা প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া যেতে পারে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এগারো বছরে বজ্রপাতে ৩ হাজার ৬৫৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে তুলে ধরা হয় প্রবন্ধে। এরমধ্যে ২০১৫ সালে ২২৬ জন, ২০১৬ সালে ৩৯১ জন, ২০১৭ সালে ৩৮৮ জন, ২০১৮ সালে ৩৮৮ জন, ২০১৯ সালে ৩৫৯ জন, ২০২০ সালে ৪০১ জন, ২০২১ সালে ৪২৭ জন, ২০২২ সালে ৩৬৩ জন, ২০২৩ সালে ৩২২ জন, ২০২৪ সালে ২৭১ এবং ২০২৫ সালে ১৭৩ জন বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন বলে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে প্রবন্ধে।
অনুষ্ঠানে রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম, ইউএনডিপি, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল এবং ব্র্যাক-এর প্রতিনিধিরা বজ্রপাত মোকাবিলায় প্রস্তুতি এবং ঝুঁকি হ্রাসে তাদের বর্তমান কার্যক্রম ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।