Published : 23 Apr 2026, 08:37 PM
সুপ্রিম কোর্টের ভার্চুয়াল কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত এবং এজলাসে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার প্রতিবাদে কালো পতাকা মিছিল ও সমাবেশ করেছেন আইনজীবীরা।
বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে এই কর্মসূচি পালন করে সশরীরে নিয়মিত আদালত চালুর দাবি জানান তারা।
বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি বিবেচনায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন একটি নির্দেশনা জারি করে।
ওই নির্দেশনায় বলা হয়, প্রতি বুধবার ও বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগে ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে আদালত পরিচালিত হবে। সপ্তাহের অন্যান্য কার্যদিবসে সশরীরে উপস্থিতির মাধ্যমে বিচারকাজ চলবে।
এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন আইনজীবীরা।
কালো পতাকা মিছিলের পরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সহ-সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহফুজুর রহমান খান বলেন, “তেল ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য এই বিশেষ পরীক্ষামূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও গত দুই দিনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এতে কিছুই সাশ্রয় হচ্ছে না। সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গন গাড়িতে ভরে যাচ্ছে, বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরাও নিয়মিত আসছেন।”
তিনি বলেন, “দেশের বিচার বিভাগ হচ্ছে আইনের শাসন ও নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার জায়গা। এটা কোনো শপিং মল নয় যে রাত ৮টার পর বন্ধ করে দিলে সমস্যা হবে না। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখতে হলে যেকোনো মূল্যে বিচার বিভাগকে সচল রাখতে হবে।”
ভার্চুয়াল কোর্টের কারণে মামলা নিষ্পত্তির হার তলানিতে ঠেকেছে বলে অভিযোগ করেন আইনজীবী মাহফুজুর রহমান।
সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তার তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, গতকাল আপিল বিভাগে মাত্র ৯৫টি মামলার শুনানি হয়েছে এবং ২১টি নিষ্পত্তি হয়েছে। অথচ চেম্বার জজ একাই নিয়মিত ১০০ থেকে ২০০ মামলার শুনানি করেন। হাই কোর্ট বিভাগের ৬৩টি বেঞ্চে মাত্র ৬১২টি মামলার শুনানি হয়েছে, যার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১৫৬টি।
এ সংখ্যা নিয়মিত কোর্টের তুলনায় অর্ধেকও নয় দাবি করে এই আইনজীবী বলেন, “এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া স্থবির ও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।”
দাবি মানা না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে যদি তারা এই পরীক্ষামূলক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে নিয়মিত আদালত চালু না করে, তবে সেদিন বেলা ১টায় আমরা কালো পতাকা নিয়ে অবস্থান ধর্মঘট পালন করব।”
আদালতে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেন সমাবেশে উপস্থিত আইনজীবীরা।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, “আজকের এই অসাধারণ মেধাসম্পন্ন আপিল বিভাগ কোনো আইনের দ্বারা হয়নি, এটি জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও ৫ অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানের ফসল। সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার না থাকলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে বিচার বিভাগের এবং ন্যায়বিচারপ্রার্থী জনগণের।”
সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে এজলাসে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছে। এ কারণে আদালতের কাজ চলাকালে সংবাদিকরা এজলাসে প্রবেশ করতে পারেন না।
ভার্চুয়াল কোর্টের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মামুন মাহবুব বলেন, “যেকোনো ব্যক্তি জুম কোড নিয়ে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে শুনানিতে যুক্ত হতে পারেন। তাই এই সিদ্ধান্তের কোনো যৌক্তিকতা নেই।
“সাংবাদিকতাকে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়, তাদের বাধা দেওয়া মানে গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। প্রধান বিচারপতি তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন এবং অবিলম্বে সাংবাদিকদের আগের মতো সব আদালতে স্বাধীনভাবে প্রবেশের সুযোগ দেবেন বলে আমরা আশা করি।”
মাহফুজুর রহমান খান বলেন, “বর্তমানে সবচেয়ে স্পর্শকাতর আইসিটি ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজও লাইভ প্রচার হচ্ছে। সেখানে সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে সাংবাদিকদের প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা কোথায়, তা আমাদের বোধগম্য নয়। প্রকাশ্য বিচারে কোনো অন্তরায় থাকা উচিত নয়।”
এর আগে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে কালো পতাকা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ প্রদক্ষিণ করেন আইনজীবীরা।
সমাবেশে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী মাহবুবুর রহমান খান, মোকছেদুল ইসলাম, শাহ আহমেদ বাদল, মাকসুদ উল্লাহ, আনিসুর রহমান বিশ্বাস রায়হান, আশরাফুল ইসলাম।