Published : 09 Jun 2026, 04:18 PM
সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হাই কোর্টের দেওয়া রায় রাষ্ট্রপক্ষ কেন স্থগিত চেয়েছিল, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল।
আপিল বিভাগে রায় স্থগিত হওয়ার পর তিনি বলেছেন, “রায়টি যদি স্থগিত না করা হয়, তাহলে আমাদের বিচার আইনে বা প্রশাসনে এক ধরনের স্থবিরতা কাজ করবে।
“কারণ যে অধ্যাদেশের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় করা হয়েছিল, সেটি পার্লামেন্ট কর্তৃক গৃহীত হয়নি; বরং এটা আরও অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পার্লামেন্টে পাস করা হয়নি।”
তিনি বলেন, “পার্লামেন্টে যে সংশোধনী আনা হয়েছে, সেখানে অধিকতর যাচাই-বাছাই করার কথা উল্লেখ করা আছে; সেটা করার জন্য সরকারের অবস্থান আমি ব্যাখ্যা করেছি।”
এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর ওই রায়ে সুপ্রিম কোর্টের জন্য তিন মাসের মধ্যে স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে বলেছিল।
মঙ্গলবার ওই রায় স্থগিত করে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল শুনানির জন্য ১৬ জুন দিন ঠিক করে দেয়।
২০২৪ সালের ২৫ অগাস্ট ১০ জন আইনজীবীর পক্ষে মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের নির্দেশনা চেয়ে রিট আবেদনটি করেছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।
বর্তমান সংবিধানের (সংশোধিত) ১১৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “অধস্তন আদালতের দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত থাকবে।”
১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, “বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্বে নিযুক্ত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে।”
হাই কোর্টের রায়ের পর গত ২০ নভেম্বর আলাদা সচিবালয় করার পদক্ষেপ অন্তর্বর্তী সরকারে অনুমোদন পায়। তার ১০ দিনের মাথায় ৩০ নভেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি হয়।
এ অধ্যাদেশ পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলাজনিত বিষয়, ছুটির পাশাপাশি নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগের সব কিছুর দায়িত্ব পায় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবন-৪ এ সচিবালয় উদ্বোধন করেন তখনকার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
তবে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিচারক নিয়োগ ও সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো রহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাস হয়।
সংসদে বিলটি পাসের সময় বিরোধী দলের সদস্যরা এটিকে ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ’ আখ্যা দিলেও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত ক্ষমতা সংসদেরই।
বিলে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ‘অধিকতর পরামর্শ ও যাচাই-বাছাই’ দরকার হওয়ায় এই রহিতকরণ বিল আনা হয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল কাজল মঙ্গলবার বলেন, “স্বার্থ সুরক্ষার স্বার্থে আমাদের পার্লামেন্টে রহিতকরণের যে কারণটি উল্লেখ করা হয়েছে—আরও অধিকতর যাচাই-বাছাই করা; আমার মনে হয়, সরকারের পক্ষ থেকে সেটিই করা হবে—এটা আমাদের প্রত্যাশা।
“তবে এই মুহূর্তে এই রায়টা স্থগিত না হলে যে প্রশাসনিক জটিলতা বিচার বিভাগে এবং বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে তৈরি হতো, তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।”
রহিতকরণের ওই আইন পাসের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় তার আইনগত ভিত্তি হারিয়েছে। এর ফলে বিচারক নিয়োগ ও প্রশাসনিক সব কার্যক্রম আবার আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরে গেছে।
গত ১৯ মে বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে কর্মরত জুডিসিয়াল সার্ভিসের ১৫ জন কর্মকর্তা ও বিচারককে আইন ও বিচার বিভাগে ফেরত নেওয়া হয়।
হাই কোর্টের রায় স্থগিত হওয়ার পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “হাই কোর্ট বিভাগে একটি রায় হয়েছিল দোসরা সেপ্টেম্বর ২০২৫। এই রায়টি আমাদের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ যেটি, অর্থাৎ নিম্ন আদালতের বিচারকদের পোস্টিং ও পদোন্নতি সংক্রান্ত ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রয়োগ করা হয়—তা নিয়ে।
“এই ১১৬ অনুচ্ছেদের একটা ইতিহাস আছে। ১৯৭২ সালের আমাদের মূল সংবিধানে এই ক্ষমতাটা ছিল সুপ্রিম কোর্টের ওপরে। পরবর্তীতে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে, স্বাধীনতা পরবর্তীতে জনাব শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের আমলে, এই অনুচ্ছেদটি সংশোধন করে সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়া হয়।”
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, “পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে এটাকে সংশোধন করে করা হয় যে—এই দায়িত্বটা রাষ্ট্রপতিই করবেন, তবে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে। আমাদের দেশে পঞ্চম সংশোধনী নিয়ে একটি রায় আছে, যে রায়ের মাধ্যমে আলটিমেটলি এই ১৯৭৯ সালে যে সংশোধনীটি করা হয়েছিল, সেটি বাতিল হয়ে যায়।
“আবার পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় অর্থাৎ শেখ হাসিনা যখন প্রধানমন্ত্রী, তার সরকারের সময় এ সংশোধনীটি কিন্তু পুনরায় সংশোধন করে আলটিমেটলি এটা রাষ্ট্রপতির কাছে ন্যস্ত করা হয়।”
রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “এই সংশোধনীটা এবং ২০১৭ সালের একটা বিধিমালা চ্যালেঞ্জ করে আলটিমেটলি হাই কোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়।
“সেখানে আর একটা প্রার্থনা করা হয়েছিল যে, সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটা স্বতন্ত্র সচিবালয় করা এবং সেই মর্মে একটা নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল, যার নির্দেশনাও আদালত দিয়েছিল। এই রায়টি প্রকাশিত হয়েছিল দোশরা সেপ্টেম্বর ২০১৫, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়।”
অ্যটর্নি জেনারেল বলেন, “যে সংবিধান সম্পর্কে রিটকারীদের আপত্তি, তার প্রথমটি সংগঠিত হয়েছে চতুর্থ সংশোধনীর সময়ে, যে সময়ে জনাব শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার বাংলাদেশে ছিল।
“আবার পঞ্চদশ সংশোধনী, যে সংশোধনীর ওপরে ভিত্তি করে এটি ’৭২ সালের সংবিধানের বাইরে গিয়ে পুনরায় রাষ্ট্রপতির কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে, যেটার বিরুদ্ধে রিট পিটিশন দায়ের হয়েছে, সেটাও কিন্তু বিগত শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে হয়েছে।”
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়: হাই কোর্টের রায় স্থগিত, আপিল শুনানি ১৬ জুন