Published : 09 Jun 2026, 12:19 PM
সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হাই কোর্ট গত বছর যে রায় দিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের আপিল শুনানি হবে আগামী ১৬ জুন।
আর এ আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাই কোর্টের সেই রায় স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বেঞ্চ আপিল শুনানির এ দিন নির্ধারণ করে দেয়।
অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে এ সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করে গেলেও বিএনপি ক্ষমতায় এসে তা বাতিল করেছে।
আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “আজকে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের চার বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ আমাদের আবেদন মঞ্জুর করেছেন। অর্থাৎ হাই কোর্ট যে রায় দিয়েছিল, যে রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিল এবং একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, সেটি স্থগিত থাকবে।
“২০১৭ সালে যে বিধি মোতাবেক ইতিপূর্বে পরিচালিত হচ্ছিল বিচারকদের ব্যাপারে, সেটিই পরিচালিত হবে এই আদেশের ফলে।”
স্থগিতাদেশ চাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “রায়টি যদি স্থগিত না করা হয়, তাহলে আমাদের বিচার আইনে বা প্রশাসনে এক ধরনের স্থবিরতা কাজ করবে। কারণ যে অধ্যাদেশের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় করা হয়েছিল, সেটি পার্লামেন্ট কর্তৃক গৃহীত হয়নি; বরং এটা আরও অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পার্লামেন্টে পাস করা হয়নি।
“পার্লামেন্টে যে সংশোধনী আনা হয়েছে, সেখানে অধিকতর যাচাই-বাছাই করার কথা উল্লেখ করা আছে; সেটা করার জন্য এটাই সরকারের অবস্থান হিসেবে আমি ব্যাখ্যা করেছি।”
সুপ্রিম কোর্টের জন্য তিন মাসের মধ্যে স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর রায় দিয়েছিল হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ। এ বছর ৭ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ১৮৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করা হয়।
এর মধ্যে গত ২০ নভেম্বর আলাদা সচিবালয় করার পদক্ষেপ অন্তর্বর্তী সরকারে অনুমোদন পায়। তার ১০ দিনের মাথায় ৩০ নভেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি হয়।
এ অধ্যাদেশ পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলাজনিত বিষয়, ছুটির পাশাপাশি নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগের সব কিছু সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় দায়িত্ব পায়।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী ১১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবন-৪ এ সচিবালয় উদ্বোধন করেন তখনকার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
তবে নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিচারক নিয়োগ ও সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো রহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাস হয়।
সংসদে বিলটি পাসের সময় বিরোধী দলের সদস্যরা এটিকে ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ’ আখ্যা দিলেও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত ক্ষমতা সংসদেরই।
রহিতকরণের ওই আইন পাসের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় তার আইনগত ভিত্তি হারায়। এর ফলে বিচারক নিয়োগ ও প্রশাসনিক সব কার্যক্রম আবার পুরোনো কাঠামোয় অর্থাৎ আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরে যায়।
তারই ধারাবাহিকতায় ১৯ মে বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে কর্মরত জুডিসিয়াল সার্ভিসের ১৫ জন কর্মকর্তা ও বিচারককে আইন ও বিচার বিভাগে ফেরত নেওয়া হয়।
এর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ–সংবলিত হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে তা শুনানির জন্য আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন চেম্বার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব। মঙ্গলবার প্রাথমিক শুনানি নিয়ে প্রধান বিচাপতি নেতৃত্বাধীন পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাই কোর্টের রায় স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত দিয়েছে।
এদিকে জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল’ পাস হওয়ার পর ২০ এপ্রিল সেই আইন চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট আবেদন করেন সাতজন আইনজীবী। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রমের ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশনা চাওয়া হয় সেখানে।
বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাই কোর্ট বেঞ্চে সেদিন সিদ্ধান্ত হয়, হাই কোর্ট এখনই এ বিষয়ে বিস্তারিত শুনানি হবে না। এ বিষয়ে রায় হওয়া রিট মামলার আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি অপেক্ষমান রাখা হবে।
বাংলাদেশে স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবি কয়েক যুগ ধরে বিভিন্ন মহল থেকে করা হচ্ছিল। এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা ও সভা-সমাবেশের মধ্যে ১৯৯৫ সালে বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসদার হোসেন ও তার সহকর্মীরা বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে মুক্ত করার দাবিতে মামলা করেন।
সেই মামলায় ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রায় দিয়েছিল।