Published : 13 Jun 2026, 08:11 PM
দেশে একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে অংশীজনদের কাছ থেকে প্রেস কাউন্সিল বিলুপ্ত করে সব মাধ্যমের জন্য একটি সমন্বিত ও সরকার নিয়ন্ত্রণমুক্ত ‘গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব এসেছে।
একই সঙ্গে গণমাধ্যমে কেবল মত প্রকাশের স্বাধীনতাই নয়, ‘ফ্রিডম আফটার এক্সপ্রেশন’ বা মত প্রকাশের পর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
শনিবার মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়াটিভ-এমআরডিআইয়ের এক মতবিনিময় সভায় অংশীজনরা এই প্রস্তাব করেন।
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে রাষ্ট্র সংস্কারে ১১টি কমিশন করেছিল মুহাম্মদ ইউনূনের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। সেগুলোর মধ্যে একটি গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন।
এ কমিশন সাংবাদিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করাসহ গণমাধ্যম সংস্কারে ২০টি সুপারিশসহ প্রতিবেদন দিয়েছে গত বছর গত বছর ২২ মার্চ।
ঢাকার দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে আয়োজিত ‘গণমাধ্যম কমিশন: সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক এমআরডিআইয়ের এই মতবিনিময় সভায় গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কামাল আহমেদ, সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতিআরা নাসরীন গীতিআরা নাসরিনও ছিলেন।
এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান মুকুর বলেন, “গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে খুব পরিষ্কারভাবেই বলা হয়েছে, এই কমিশন কীভাবে কাজ করবে এবং এর ভূমিকা কী হবে।
“সংক্ষেপে বলতে গেলে, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সুরক্ষা, সাংবাদিকদের মানসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতার লঙ্ঘন বা বিচ্যুতির অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনের প্রস্তাব করা হয়েছে।”
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্ব-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার অভিজ্ঞতার আলোকে এই কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে তুলে ধরে তিনি বলেন, “বর্তমানে সম্প্রচার ও অনলাইন গণমাধ্যমের বড় একটি অংশ প্রেস কাউন্সিলের আইনগত এখতিয়ারের বাইরে রয়েছে। সে কারণে এসব গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের জন্য একটি অভিন্ন তদারকি ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন মনে করেছে।”
মতবিনিময় সভায় প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সংবাদ সংস্থায় কর্মরত সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি গণমাধ্যম কমিশনের আওতায় আনার প্রস্তাব এসেছে।
এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর উত্তম চর্চা, শুদ্ধাচার ও স্ব-নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির নীতিমালা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও কমিশনকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পাঠক-দর্শকের অভিযোগ প্রতিকারের কার্যকর ব্যবস্থা দেশে প্রায় নেই তুলে ধরে হাসিবুর রহমান মুকুর বলেন, “গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিক, সম্পাদক এবং সংশ্লিষ্ট সবার জন্য গ্রহণযোগ্য আচরণবিধি প্রয়োজন। সম্পাদকীয় নীতিমালার পাশাপাশি মালিকদের জন্যও নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে। মালিকদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি বলেন, “মালিকানা কাঠামোর স্বচ্ছতার সঙ্গে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থার একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সামগ্রিকভাবে সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের আস্থা দিন দিন কমে যাচ্ছে বলেই আমরা মনে করি।”
এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক বলেন, “গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আবেদন কিংবা স্বপ্রণোদিত হয়ে কমিশন তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারবে বলে প্রস্তাবে বলা হয়েছে।”
কমিশনের কাঠামো চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তা, গণমাধ্যম মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক সংগঠন, আইন বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক ও গণমাধ্যম উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। এই পরামর্শ প্রক্রিয়া শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক না হয়ে সারা দেশে হওয়া উচিত এবং খসড়াটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে জনসাধারণের মতামতের জন্য উন্মুক্ত রাখা প্রয়োজন। পরবর্তীতে জাতীয় পর্যায়ের সেমিনারের মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদের কাছে উপস্থাপন করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট-ব্লাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও ক্ষমতার মধ্যে যেমন ‘ওভারল্যাপ’ রয়েছে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু ক্ষেত্রে শূন্যতাও আছে।
সাংবাদিকদের সুরক্ষা, কাজের পরিবেশ এবং বাকস্বাধীনতা রক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি থাকার কথা তুলে তিনি গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনার আহ্বান জানান।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, ওই প্রতিবেদনে দেশের গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থার পেছনের ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপটও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
বর্তমান ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, প্রিন্ট, ব্রডকাস্ট ও ডিজিটাল মিডিয়া বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার আওতায় থাকায় কার্যকর সমন্বিত তদারকি সম্ভব হচ্ছে না।
“প্রেস কাউন্সিল প্রায় অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে বিটিআরসি, তথ্য মন্ত্রণালয়, আদালত ও কপিরাইট অফিসের মধ্যে দায়িত্ব বিভক্ত।”
জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন গঠনের প্রস্তাব প্রসঙ্গে এই আইনজীবী বলেন, “একই সঙ্গে প্রেস কাউন্সিল বহাল থাকলে ক্ষমতার দ্বৈততা ও ওভারল্যাপের ঝুঁকি তৈরি হবে। আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে প্রেস কাউন্সিল বিলুপ্ত করে একটি ইউনিফাইড (সমন্বিত) প্রতিষ্ঠান গঠন করা, যা সব ধরনের গণমাধ্যম-সংক্রান্ত মানদণ্ড ও অভিযোগ দেখভাল করবে।”
কমিশনের পরিধি নিয়ে ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশে যদি প্রিন্ট, ব্রডকাস্ট, অনলাইনসহ সমস্ত মিডিয়া মিলিয়ে যদি এই কমিশনের ম্যান্ডেট হয়, তাহলে বেশি ভালো হবে।”
আইনের প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের নির্বাহী সম্পাদক সাখাওয়াত লিটন বলেন, “ভালো ভালো কথা আমরা অনেক লিখে দিতে পারি, কিন্তু সেটার এনফোর্সমেন্ট সবচেয়ে বড় কথা। আমাদের এখন ‘ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন’ আছে, আমাদের প্রয়োজন ‘ফ্রিডম আফটার এক্সপ্রেশন’।”
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সাবেক প্রেস সচিব ও দ্য ডেইলি ওয়াদা-এর সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, “ডিজায়ার্ড (কাঙ্ক্ষিত) জায়গায় যেতে পারব কিনা, সেটা আমরা পরবর্তীতে বুঝব, কিন্তু আগেই যদি আমরা এটাকে ‘কিল’ করি তাহলে তো হল না। আমার মনে হয় এটা আমাদের দরকার।”
এছাড়াও মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা বক্তব্য রাখেন।