Published : 11 Feb 2025, 01:08 AM
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক কাজী সায়েমুজ্জামানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি সংক্রান্ত অনুসন্ধান ও মামলার তদারককারী কর্মকর্তার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারের পর তার দপ্তরও বদলে দেওয়া হয়েছে।
তাকে বীমা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পরিচালক থেকে সরিয়ে এনআইএস ও ইউএনসিএসি ফোকাল পয়েন্ট এর পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সোমবার দুদক এক অফিস আদেশে তাকে নতুন বিভাগে বদলি করে।
এর আগে এদিন দুপুরের দিকে দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন তদারককারী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন থেকে তাকে প্রত্যাহার করার কথা জানিয়েছিলেন।
একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনুসন্ধান ও তদন্তাধীন বিষয় নিয়ে লেখালেখির কারণে তাকে কারণ দর্শানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছিলেন মহাপরিচালক। বলেন, কোনো বিতর্ক যাতে না হয় সেজন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সায়েমুজ্জমানের নেতৃত্বে রোববার দুপুর সাড়ে ১২টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগ অনুসন্ধানের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরাপত্তা ভল্টে তল্লাশি চালায় দুদকের একটি দল।
সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে অভিযান চালানোর পর বিকালে দুদকের পরিচালক সায়েমুজ্জমান বলেন, “যে ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে এসেছিলাম, তাদের নামে লকার নেই। আরও অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। আদালতের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরবর্তী অভিযান চালাবে দুদক।”
এরপর সামনে আসে সায়েমুজ্জমানের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নালিশের বিষয়টি।
এ বিষয়ে রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছিলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নিয়ে মন্তব্যের কারণে সায়েমুজ্জামানের নামে গত সপ্তাহে দুদক চেয়ারম্যানের কাছে নালিশ করে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নির্বাহী পরিচালক বলেন, “সায়েমুজ্জামান ধারণাবশত সামাজিক মাধ্যমে বক্তব্য পেশ করেছেন। সরকারি কর্মকর্তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে যে বিধিমালা রয়েছে তা লঙ্ঘন হয়েছে।
“দুদক চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে সায়েমুজ্জামান সেই নির্দেশনা মানছেন না।”
বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযানের পর দুদক কর্মকর্তা সায়েমুজ্জামান সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নালিশের বিষয়টি সামনে আসার পরে এ নিয়ে তিনি কোনো কথা বলছেন না।
ফেইসুবক পোস্টের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফোন করা হলে তার সাড়া মেলেনি।
কী লিখেছেন সায়েমুজ্জামান
ফেইসবুকে কাজী সায়েমুজ্জামান নামে একটি প্রোফাইল রয়েছে, যেখানে দুদক পরিচালকের ছবি প্রোফাইল পিকচার হিসেবে দেওয়া রয়েছে। সেখানে সাবেক সাংবাদিক ও দুর্নীতি দমনে নিয়োজিত তরুণ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় তুলে ধরার পাশাপাশি পাশাপাশি প্রোফাইলে নিজের পরিচয় দেওয়া হয়েছে লেখক হিসেবে।
সায়েমুজ্জামান ফোন না ধরায় ফেইসবুকের এ প্রোফাইল ও পোস্টের বিষয়ে তার বক্তব্য মেলেনি। তবে এই আইডিতে যুক্ত তার এক ফেইসবুক ফ্রেন্ড বলেছেন এটি দুদকের এই পরিচালকেরই আইডি। দুদকে তার সহকর্মীরাও এটি তার ফেইসবুক আইডি বলে তথ্য দিয়েছেন।
এ আইডি থেকে গত ৪ ফেব্রুয়ারি দৈনিক মানবজমিনের ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের লকার খোলার অনুমতি পেল দুদক’ শিরোনামের একটি খবরের লিংক পোস্ট করে লেখা হয়েছে, “বিজ্ঞ আদালতের আদেশ মিলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মহানিরাপত্তা এলাকার কয়েন ভল্টে রক্ষিত সেইফ ডিপোজিটে কী আছে আদেশ অনুযায়ী সেটা শিগগিরই দেখা হবে। ধন্যবাদ মাননীয় দুর্নীতি দমন কমিশনকে। এবার আরো রহস্যের উন্মোচন সময়ের ব্যাপার মাত্র।”
একই দিন সমকালের ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের সব লকার ফ্রিজ’ শিরোনামের খবরের লিংক পোস্ট করে লেখা হয়, “এখন এসব লকার খুলতে শুধু আদালতের অনুমতির অপেক্ষা’।
এর আগে ১ ফ্রেব্রুয়ারি ’লকারে চোখ দুদকের’ শিরোনামের সংবাদ শেয়ার দিয়ে লেখা হয়, “আমার ধারণা দেশের বৈদেশিক মূদ্রার একটা অংশ দেশের ব্যাংকগুলোর লকারে আটকে আছে। আমি সফলতার কাছাকাছি রয়েছি। শিগগিরই বড় ধরণের আপডেট দিতে পারবো ইনশাআল্লাহ।“
ফেইসবুকে তার এসব পোস্টের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক মাসুম বিল্লাহ ফেইসবুকে এ সংক্রান্ত একটি পোস্ট দিয়েছেন। সেই পোস্ট তিনি লেখেন, ''মিডিয়া ট্রায়াল! সংশ্লিষ্টের বিচার চাই!
“বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিকভাবে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। কর্মকর্তারা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের প্রাণ। মিথ্যা তথ্য এবং প্রোপাগাণ্ডার মাধ্যমে এরূপ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এবং তার কর্মকর্তাগণকে বিতর্কিত করার মাধ্যমে কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে হিরো হওয়ার চেষ্টা করে তাহলে তার উপযুক্ত বিচার খুবই জরুরী।”
এ পোস্টে তিনি সায়েমুজ্জামানের বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পর্কিত তিনটি পোস্ট শেয়ার করে লেখেন, “কিছুদিন ধরে ২৮ বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা যিনি বর্তমানে দুদকে কর্মরত জনাব Kazi Saemuzzaman একটার পর একটা বিতর্কিত এবং মনগড়া মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং তার কর্মকর্তাগণকে হেয় করে চলেছেন।”
ওই পোস্টে মাসুম বিল্লাহ আরও লিখেছেন, “আমার লেখায় মনে হতে পারে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সব কর্মকর্তা কি তাহলে সৎ? জোর দিয়ে বলতে পারি, দুই/একজন কর্মকর্তা অসৎ বা দূর্নীতিবাজ হতে পারেন কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের অধিকাংশ কর্মকর্তা ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সৎ এবং দেশের প্রতি নিবেদিত।
”আমরা অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান ও সাবেক সকল দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তার (তদন্তে প্রমাণ সাপেক্ষে) বিচার চাই। কিন্তু তার আগে মিডিয়া ট্রায়াল এর মাধ্যমে যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সকল কর্মকর্তাকে অপমান করা হচ্ছে বা হয়েছে তার বিচার চাই।''
বাংলাদেশ ব্যাংকের নালিশের পর দুদকের সেই পরিচালককে প্রত্যাহার