Published : 07 Jun 2026, 01:10 PM
ঢাকার পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় শুনতে আদালতে এসেছিলেন একদল শিক্ষার্থী।
তাদের একজনের জিজ্ঞাসা, “আসামিটার একবারো হাত কাঁপে নাই!”
ঢাকার সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের এই শিক্ষার্থীরা আলোচিত এই মামলার রায় শুনতে রোববার সকালে পুরান ঢাকার আদালতে আসেন। তারা সবাই উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী।
ঢাকা মহানগরের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এদিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তারা দুজন পল্লবীতে রামিসাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন।
রায় শুনতে আসা মিথিলা ভুইয়া হীরা মনি সোহরাওয়ার্দী কলেজের একাদশ শ্রেণির বাণিজ্য বিভাগের ছাত্রী। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বললেন, রামিসার বয়সী একটি ছোট বোন আছে তার।
“যেদিন চার্জ গঠন হয়, পুরো ঘটনা জানানো হয়, আইনজীবীরা বললেন–এরকম এরকমভাবে মারা হয়েছে, গলা কাটা হইছে, হাত কাটা হইছে আরো নৃশংসভাবে মারা হয়েছে, এই আসামিটাকে দেখা দরকার ও আসলেই কী! একবারো হাত কাঁপে নাই একটা বাচ্চা মেয়েকে এভাবে মারতে?"
আদালত প্রাঙ্গণে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে হীরা বলেন, "এখন আমি ধর্ষণ নিয়ে কিছু বললে ট্রলড হব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ধর্ষণ নিয়ে বিচার চাইলেও এক শ্রেণির মানুষ ট্রল করে ফেইসবুকে ছাইড়া দেয়।
"একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি রাষ্ট্রকে বলব, রামিসার মত সকল ধর্ষণের ঘটনায়, যেটা আলোচিত হচ্ছে, সেটা ছাড়াও প্রত্যেকটাতে যেন দ্রুত বিচার হয় এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। আমরা মব চাই না, সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার করতে হবে।"
একই কলেজের মানবিক বিভাগের ছাত্র শাকিবুল হাসান বলেন, "আমি নিজে থেকে এখানে এসেছি। আসলে এরকম কুরুচিপূর্ণ যে মানুষের মনমানসিকতা তারা কেমন হতে পারে, তাদেরকে দেখার জন্যই আসা।”
মানুষের ‘বিকৃত মানসিকতাই’ ধর্ষণের কারণ বলে মনে করেন এই কলেজছাত্র।
তার সঙ্গে মামলার রার শুনতে আসা সহপাঠী সুরাইয়া তাসনিম বলেন, “আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে, তারা পোশাকের স্বাধীনতাকে এমনভাবে উল্লেখ করে…, তো ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে তো এগুলো তত একটা খাটে না। তারা কি পোষাকের কারণে ধর্ষণের শিকার হল?
“যে ধর্ষক, বাচ্চা বলেন, বুড়ো বলেন তারা তা করবেই। ৮০ বছরের বৃদ্ধ ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। তো উনি কি বেপর্দা ছিল?”
ধর্ষণ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে এই শিক্ষার্থী বলেন, "রামিসা হত্যার ব্যাপারটা নিয়ে অনেকে অনেক গুরুত্ব দিচ্ছে, এই বিষয়টা নিয়ে অনেক দ্রুত কাজ করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি এটাকে ফালায় রাখি, ঠিকভাবে হচ্ছে কিনা দেখাশোনা না করি, তাহলে এটাও আছিয়ার মামলার মত পড়ে থাকবে। হত্যার পরে দুই একদিন অনেক বেশি হাইপ করবে তারপর...।
"আমার দাবি হচ্ছে একটা সুষ্ঠু বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সর্বপ্রথম নারীদের সম্মান, শ্রদ্ধা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। "
পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশন এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সঙ্গে থাকত রামিসা। সে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। আসামি সোহেল ও স্বপ্না ওই বাসার অন্য ফ্ল্যাটে সাবলেট থাকতেন।
গত ১৯ মে দুপুরে সোহেলদের বাসা থেকে রামিসার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ সেখান থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। পরে সন্ধ্যায় সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না বলেন, রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মেরে ফেলেন সোহেল। লাশ গুম করার জন্য মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করেন এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ বিচ্ছিন্ন করে মৃতদেহ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেন। কাটা মাথা বাথরুমের বালতির মধ্যে রেখে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যান।
ধর্ষণ ও হত্যার নৃশংস ঘটনাটি সারাদেশে ক্ষোভের জন্ম দেয়। ঘটনার ২০ দিনের মাথায় এ মামলার রায় ঘোষণা করল আদালত।