২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮ কার্তিক ১৪৩৩

গণহত্যা দিবস: কালরাতের শহীদদের স্মরণের দিন

সেই কাল রাতে চালানো অপারেশন সার্চলাইটের বীভৎসতার ওপর দাঁড়িয়ে মুক্তির যে যুদ্ধ শুরু করে বাঙালি জাতি, তার পথ ধরে নয় মাস পার বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Mar 2024, 08:32 AM

Updated : 25 Mar 2024, 08:32 AM

পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী বাঙালির আন্দোলন কঠোরহস্তে দমনের জন্য একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞের সূচনা করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী, ভয়াবহ সেই নৃশংসতায় শহীদদের স্মরণে পালিত হচ্ছে গণহত্যা দিবস।

সেই কাল রাতে চালানো অপারেশন সার্চলাইটের বীভৎসতার ওপর দাঁড়িয়ে মুক্তির যে যুদ্ধ শুরু করে বাঙালি জাতি, তার পথ ধরে নয় মাস পার বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

নানা আয়োজনে সোমবার সেই রাতের শহীদদের বিনম্রচিত্তে স্মরণ করছে জাতি; হত্যাযজ্ঞের যেই দিনটি জাতীয়ভাবে স্বীকৃত ‘গণহত্যা দিবস’ হিসাবে।

তেইশ বছরের শোষণ থেকে বাঙালির মুক্তির আন্দোলনের শ্বাসরোধ করতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে এ দেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের সেই অভিযানে কালরাতের প্রথম প্রহরে ঢাকায় চালানো হয় গণহত্যা।

এ অপারেশনের উদ্দেশ্য ছিল ঢাকাসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান শহরগুলিতে আওয়ামী লীগ নেতা ও ছাত্র নেতৃবৃন্দ এবং বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের গ্রেপ্তার ও হত্যা, সামরিক আধা সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের নিরস্ত্রীকরণ, অস্ত্রাগার, রেডিও ও টেলিফোন এক্সচেঞ্জ দখলসহ প্রদেশের সামগ্রিক কর্তৃত্ব গ্রহণ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলন কঠোর হস্তে দমন করে প্রদেশে পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।

জাতীয় নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে পাকিস্তানের দুই অংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের দুই নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর আলোচনার মধ্যেই ফেব্রুয়ারি থেকে অপারেশনের ছক কষে পাকিস্তানি বাহিনী, যা চূড়ান্ত হয় মার্চের ১৭ তারিখে এসে।

সিদ্ধান্ত হয়, ২৫ মার্চ রাত ১টায় অপারেশন সার্চলাইটের আওতায় ঢাকায় অভিযানের নেতৃত্ব দেবেন পাকিস্তানি বাহিনীর ৫৭ ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে নেতৃত্ব দেবেন ১৪ ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম রাজা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী রাত ১০টার দিকে ঢাকা সেনানিবাস থেকে সেনাবাহিনীর একটি বড় কনভয় যুদ্ধ সাজে শহরের দিকে রওনা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় কালরাতের বিভীষিকা

২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবসের স্বীকৃতি দিল সংসদ

পুরনো খবর:

‘একাত্তরের মার্চেই ঘটেছিল পৃথিবীর বৃহত্তম গণহত্যা’

শহরমুখী সেনাবাহিনীর মেকানিক্যাল কলামটি প্রথম প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় ফার্মগেইটে। সেখানে বড় বড় গাছের গুঁড়ি, অকেজো স্টিম রোলার এবং ভাঙা গাড়ির স্তূপ জমিয়ে রাখা হয়েছিল পথ আটকানোর জন্য। মুক্তিকামী বেপরোয়া প্রতিরোধোন্মুখ জনতার মাঝ থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উঠছিল।

গুলি করে এ প্রতিরোধ ভেঙে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ট্যাংকগুলো সামনে এগিয়ে যায়। রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ রেসকোর্স ময়দানের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে সেনাবাহিনীর অন্তত ৮০টি সাঁজোয়া যানকে পূর্ণ যুদ্ধপ্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।

রাত ১১টা ২০ মিনিটের মধ্যেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি অংশ রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের চারিদিকে অবস্থান নিতে শুরু করে। এ আক্রমণের সংবাদ তাৎক্ষণিকভাবে দেশের জেলা ও সাব ডিভিশনে বেতার বার্তার মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়।

রাত সাড়ে ১১টার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অধিনায়ক কর্নেল তাজের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাদের কনভয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আক্রমণ শুরু করে।

ব্যারাকে অবস্থানরত বাঙালি পুলিশ সদস্যরা সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে পাল্টা গুলি করে।

একই সময়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২২তম বালুচ রেজিমেন্টের সেনারা পিলখানায় ইপিআর-এর ওপর হামলা করে। ব্যারাকে থাকা বাঙালি সেনারা চরম সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন।

পিলখানা ইপিআর ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনস আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাঁখারি বাজারসহ সমগ্র ঢাকায় শুরু হয় প্রচণ্ড আক্রমণ; বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় রাতের অন্ধকারে গুলি, বোমা আর ট্যাংকের আওয়াজে প্রকম্পিত হয় পুরো শহর।

সেনাবাহিনী সেই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, শিক্ষকদের আবাসিক এলাকা, এবং বস্তিবাসীর ওপর নজিরবিহীন নৃশংসতা চালায়।

রাত ১টার পর পাকিস্তানের সেনারা ট্যাংক আর সাঁজোয়া যান নিয়ে ধানমণ্ডির বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে বাঙালি জাতির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান।

এরপর নয় মাসের যুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মদান, আড়াই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং জাতির অসাধারণ ত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।

১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় সাংবাদিক সায়মন ড্রিংয়ের করা প্রতিবেদনে বলা হয়, “আল্লাহর নামে আর অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষার অজুহাতে ঢাকা আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত এক সন্ত্রস্ত নগর।

“পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুর ও ঠাণ্ডামাথায় গোলাবর্ষণের ২৪ ঘণ্টা পর, অন্তত ৭ হাজার মানুষ মৃত, বিশাল এলাকা মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার সংগ্রামকে নৃশংসভাবে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

পাকিস্তানি হায়েনাদের কাছ থেকে রক্ষা পায়নি রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব ও জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য, ড. মনিরুজ্জামানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ৯ জন শিক্ষককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়।

২০১৭ সাল থেকে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসাবে পালন করে আসছে বাংলাদেশ; গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রচেষ্টা চালানোর কথাও বলছে সরকার।

Image

২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতার নজির তুলে ধরে এরকম অনেক ছবি

দিবসের বাণীতে গণহত্যা দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে বিদেশে বাংলাদেশ মিশনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

তিনি বলেন, একাত্তরের বীভৎস গণহত্যা শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বমানবতার ইতিহাসেও একটি কালো অধ্যায়। এমন গণহত্যা আর কোথাও যাতে না ঘটে, গণহত্যা দিবস পালনের মাধ্যমে সে দাবিই বিশ্বব্যাপী প্রতিফলিত হবে।

“আমি ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের যে সকল দেশে এখনো গণহত্যা হচ্ছে তার নিন্দা জানাই। বিশ্বব্যাপী গণহত্যা বন্ধে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানাই।”

২০৪১ সালে উন্নত-সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশে পরিণত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘রূপকল্প ২০৪১’ অর্জনে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে অবদান রাখার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, “দেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত করার মধ্য দিয়েই আমরা একাত্তরের গণহত্যায় জীবনদানকারী প্রতিটি প্রাণের প্রতি জানাতে পারি আমাদের চিরন্তন শ্রদ্ধাঞ্জলি।”

দিবসের বাণীতে বিভীষিকাময় সেই সময়ের বর্ণনা দিয়ে শান্তির অন্বেষণে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, “আমরা ২৫ শে মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছি। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে গণহত্যা এড়াতে ভীত-সন্ত্রস্ত ১১ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছি। বিশ্বের যে কোন স্থানে সংঘটিত গণহত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছি।

পুরনো খবর:

একাত্তরের জেনোসাইডকে স্বীকৃতি দিল আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘জেনোসাইড ওয়াচ’
একাত্তরের গণহত্যার স্বীকৃতি এল যুক্তরাষ্ট্র থেকে
একাত্তরের জেনোসাইডের স্বীকৃতি দিতে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে প্রস্তাব

“আমরা জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত করেছি। ২০৪১ সালের বাংলাদেশ হবে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’।”

যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নেওয়ার কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, “আমরা যুদ্ধ ও সংঘাত চাই না, নর-নারী-শিশু হত্যা আমাদের তীব্রভাবে ব্যথিত করে। আমরা যুদ্ধ চাই না। আমরা শান্তিতে বিশ্বাস করি। টেকসই শান্তি বিরাজমান থাকলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর শান্তির নীতি অনুসরণ করি।”

গণহত্যা দিবসের কর্মসূচি

২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস পালনের লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। পৃথক কর্মসূচি নিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনও।

সোমবার রাত ১১টা থেকে রাত ১১টা ১ মিনিট পর্যন্ত সারাদেশে প্রতীকী 'ব্ল্যাক আউট' পালন করার কথা জানিয়েছে সরকার। তবে কেপিআই ও জরুরি স্থাপনাসমূহে এ কর্মসূচির আওতার বাইরে থাকবে।

তার আগে সকাল সাড়ে ১০টায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এ দিবসের ওপর আলোচনা সভা হবে। সারাদেশে গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গীতিনাট্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।

গণহত্যা দিবস উপলক্ষে সোমবার ঢাকায় সমাবেশের করবে আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা। দুপুর ২টায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এ সমাবেশ হবে বলে জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া।

কাল রাত্রি ও গণহত্যা দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্মৃতি চিরন্তন’ এবং জগন্নাথ হলে স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় উপাচার্যের বাসভবনের সামনের ‘স্মৃতি চিরন্তন’-এ মোমবাতি প্রজ্বালনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হবে।

এরপর সেখানে ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করবে বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফি বিভাগ।

সন্ধ্যা ৭টা ৩৫ মিনিটে ‘স্মৃতি চিরন্তন’-এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে রাত সোয়া ৮টায় জগন্নাথ হল প্রাঙ্গণে অবস্থিত গণ-সমাধিতে মোমবাতি প্রজ্জ্বালন ও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে।