Published : 29 Jan 2026, 06:35 PM
কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি এবং পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে পৃথক দুই অধ্যাদেশের খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে সভায় খসড়া দুটি অনুমোদন পেয়েছে বলে সহকারী প্রেস সচিব সুচিস্মিতা তিথি জানিয়েছেন।
ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ব্রিফিংয়ে সুচিস্মিতা তিথি বলেন, “‘কর্মক্ষেত্র-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ২০২৬’ এর খসড়ায় চারটা অধ্যায় এবং ২০টি ধারা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক হচ্ছে, এই খসড়ায় শারীরিক, মৌখিক, মানসিক, ইঙ্গিতপূর্ণ ও ডিজিটাল স্পেসের আচরণকে যৌন হয়রানি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।”
‘পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ২০২৬’ এর কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টার সহকারী প্রেস সচিব তিথি বলেন, “এর খসড়ায় সাতটি অধ্যায়ে ৩০টি ধারা রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আশ্রয়কেন্দ্র, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, আইনত এবং জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
“নির্যাতনকারী ব্যক্তির সঙ্গে যাতে যোগাযোগ বা ঘনিষ্ঠতা সীমিত করা যায়, সেজন্য এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী আদালতের অভিযোগের ভিত্তিতে অস্থায়ী সুরক্ষা আদেশ এবং তদন্ত শেষে স্থায়ী আদেশ জারি করা যাবে। নির্ধারিত ফর্মে অভিযোগ গ্রহণের পর সাত দিনের মধ্যে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করতে হবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা করতে হবে।”
কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশের খসড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নারীরা ডিজিটাল স্পেসে ভয়াবহ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। নারী নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি মৌখিকভাবে লিখিতভাবে বা অনলাইনের মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণ করতে পারবে এবং অভিযোগ গ্রহণ করার ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে।
“অভিযোগকারীকে নিরাপত্তা ও মানসিক সহায়তা প্রদানের বিষয়টিকে বিবেচনা করা হয়েছে এবং শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদাভাবে বিশেষ ব্যবস্থা এই অধ্যাদেশে আছে। তদন্তের সম্পূর্ণ গোপনীয়তা যাতে নিশ্চিত করা হয় সেটার প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।”
কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির ক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তির বিধান থাকছে বলেও জানান সহকারী প্রেস সচিব।
“শাস্তি হিসেবে সতর্কীকরণ, বরখাস্ত বা চাকরিচ্যুত করা, বহিষ্কার করা বা ক্ষতিপূরণের বিধান এখানে আছে। আর অভিযোগ যদি মিথ্যা প্রমাণিত হয় সেক্ষেত্রেও এক ধরনের শাস্তির বিধান এই অধ্যাদেশের মধ্যে আছে।
“অভিযোগ কমিটিগুলো হবে স্থানীয় পর্যায়ে, জাতীয় পর্যায়ে, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে। ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে আসলে এই কমিটির বিধিমালাটা কীভাবে প্রণয়ন করা হবে, তা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।”

১১টি অধ্যাদেশ, প্রস্তাব ও নীতি অনুমোদন
উপদেষ্টা পরিষদের বৃহস্পতিবারের সভায় মোট ১১টি অধ্যাদেশ, প্রস্তাব ও নীতির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
তিনি বলেন, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ অধ্যাদেশ-২০২৬, বাংলাদেশ প্রাণী ও প্রাণিজাত পণ্য সঙ্গনিরোধ অধ্যাদেশ-২০২৬ এর খসড়া অনুমোদন, প্রতি বছর ২৩ মার্চ ‘বিএনসিসি ডে’ ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন, ‘কনভেনশন অ্যাগেইনস্ট টর্চার অ্যান্ড আদার ইন হিউমান ডিগ্রেডিং ট্রিটমেন্ট অর পানিশমেন্ট’ (সিএটি) শীর্ষক আন্তর্জাতিক কনভেনশনের অনুচ্ছদ ১৪ এর ১ এ বাংলাদেশের ‘ডিক্লারেশন’ প্রত্যাহারের প্রস্তাব অনুমোদন হয়েছে।
“বাংলাদেশের যে সমস্ত জায়গায় অ্যাম্বাসি ও মিশন আছে, তার থেকে কিছু আমাদের কর্মকর্তাদের নিয়ে ক্যারিবিয়ান কান্ট্রি গায়ানায় আমাদের একটি ‘চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স’ বা ‘ফার্স্ট সেক্রেটারি লেভেলের’ একটা মিশন খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে।”
এর বাইরে বৃহস্পতিবারের সভায় আমদানি নীতি আদেশ-২০২৫ থেকে ২০২৮ এর খসড়া, ‘দ্য হেগ কনভেনশন অন দ্য সিভিল অ্যাসপেক্টস অব ইন্টারন্যাশনাল চাইল্ড অ্যাবডাকশন-১৯৮০’ তে বাংলাদেশ পক্ষভুক্ত হওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন এবং নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ-২০২৬ এর খসড়া, কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ-২০২৬ এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ অধ্যাদেশে ‘কিছু’ পরিবর্তন আনার কথা তুলে ধরে প্রেস সচিব বলেন, “স্থানীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলো হত জেলা পর্যায়ে ও বিভাগীয় পর্যায়ে। এখন থেকে মহানগরেও ক্রীড়া সংস্থাগুলো প্রতিষ্ঠা করা যাবে। মহানগর ক্রীড়া সংস্থাগুলো স্থানীয় পর্যায়ে খেলাধুলোর ব্যাপারে উৎসাহ প্রদানের জন্য যে ধরনের কর্মসূচি নেওয়া যায়, সেগুলো নেবে।”
বাংলাদেশ প্রাণী ও প্রাণিজাত পণ্য সঙ্গনিরোধ অধ্যাদেশ নিয়ে তিনি বলেন, “এই আইনটার নাম বিভ্রান্তিকর ছিল। এটা খুবই শুনতে খারাপ শোনা যেত। নাম ছিল ‘পশু পশুজাত’। তো এই জায়গাটা একটু চেঞ্জ হয়ে হচ্ছে ‘প্রাণী ও প্রাণিজাত’। এ খসড়া অধ্যাদেশে বিদ্যমান আইনের ধারা ১৫-তে প্রদত্ত দায় মুক্তির বিধান বিলুপ্তি করা হয়েছে। প্রস্তাবিত অধ্যাদেশের মাধ্যমে ‘পশু ও পশুজাত পণ্য সঙ্গনিরোধ আইন-২০০৫’ রহিত করা হবে।”
বিএনসিসি নিয়ে শফিকুল আলম বলেন, “যে আদেশের মাধ্যমে বিএনসিসি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলে, সেটি ১৯৭৯ সালের ২৩ মার্চ জারি হয়েছিল। প্রতিবছর এ দিনটি ‘বিএনসিসি ডে’ পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে “
সিএটি কনভেনশনে বাংলাদেশ ‘ডিক্লারেশন’ প্রত্যাহারের প্রস্তাব অনুমোদন নিয়ে তিনি বলেন, “১৯৮৪ সালে চুক্তিটা গৃহীত হয়। ৯৫টি রাষ্ট্র এটাকে অনুমোদন দিয়েছে। এটার মেম্বার হয়েছে। তার মধ্যে বাংলাদেশ যোগ দেয়। বাংলাদেশ চুক্তিটি অনুসমর্থন করে ১৯৯৮ সালে। এটার আর্টিকেল ১৪ এর প্যারা ১ এর বিষয়ে অনেকগুলো দেশ ‘রিজারভেশন’ (অসম্মতি/আপত্তি) দেয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ ছিল বাহামা, ফিজি নিউজিল্যান্ড, সামোয়া এবং ইউনাইটেড স্টেটস এটার বিষয়ে এক ধরনের ‘রিজারভেশন’ জানিয়েছিল। এখন বাংলাদেশ যেটা করল যে আর্টিকেল ১৪ এর প্যারা ১ এর যে ‘রিজার্ভেশন’, সেটা উঠিয়ে ফেলল।
“এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যারা রাষ্ট্রপক্ষ বা রাষ্ট্রের মাধ্যমে নির্যাতিত হয়েছে, যারা গুমের শিকার হয়েছে, বিভিন্ন ধরনের ন্যায্যতা পায়নি, তাদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করবে। ফলে রাষ্ট্রের মাধ্যমে যারা নির্যাতিত হবে, এই ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের পথটা প্রশস্ত হল। সঙ্গে সঙ্গে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে সরকার। এমনকি রাষ্ট্রের নির্যাতনের ফলে ভুক্তভোগীর মৃত্যু ঘটলে তার উপর নির্ভরশীল ব্যক্তিরা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী হবেন।”
গত দুই দশক ধরে মানবাধিকার কর্মীরা এই ‘রিজার্ভেশন’ উঠিয়ে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছিলেন, বলেন প্রেস সচিব।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সভায় সভাপতিত্ব করেন