০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

ডেঙ্গু: চাপ বাড়ছে শিশু হাসপাতালে, ‘গুরুতর’ রোগীও আসছে

প্রাথমিক পর্যায়ে যারা আসছেন, তারা দ্রুত বাসায় ফিরতে পারছেন, জানালেন হাসপাতালের এক চিকিৎসক।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 06 Aug 2023, 10:43 AM

Updated : 06 Aug 2023, 10:43 AM

ঢাকার শিশু হাসপাতালে জরুরি বিভাগের সামনে শিশুদের নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মায়েরা; দীর্ঘ লাইন এগোচ্ছে ধীরগতিতে, অপেক্ষায় ক্লান্ত হয়ে পড়ছে সঙ্গে থাকা অসুস্থ শিশুরা।

শিশুদের যন্ত্রণা দেখে অভিভাবকরা মাঝেমধ্যেই ঠেলেঠুলে আগে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। আগেভাগেই চিকিৎসকের দেখা পেতে লাইন এড়াতে চাইছেন। এমন পরিস্থিতিতে মাঝেমধ্যে সেখানে জটলা তৈরি হচ্ছে। নিরাপত্তাকর্মীরা বারবার বলেও লাইন ঠিক রাখতে পারছেন না।

মিরপুরে অবস্থিত বিশেষায়িত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের সামনে অপেক্ষারত শিশুদের অধিকাংশই এখন আসছে জ্বর নিয়ে। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার পর থেকে দিন যত যাচ্ছে ভিড়ও বাড়ছে।

অভিভাবকরা জানালেন, ডেঙ্গুর আতঙ্কে জ্বর দেখেই শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে আসছেন তারা। এদেরই একজন আসমা বেগম মিরপুর ১১ নম্বর থেকে ৯ বছর বয়সী তাহমিদ হোসেনকে এখানে ভর্তি করিয়েছেন।

আসমা বলেন, “হঠাৎ করে ছেলের জ্বর আসে। পরীক্ষা করেই ডেঙ্গু ধরা পড়ে। ডাক্তার বাসায় চিকিৎসা করে আবার আরেকটা রিপোর্ট করতে বলল। তখন প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় শিশু হাসপাতালে ভর্তি করাইছি। একটু বমিও হত।

“এইবারে এত মানুষ ডেঙ্গুতে মারা যাচ্ছে, এই ভয়ে বাচ্চাকে সাথে সাথে ভর্তি করাইছি।”

তার মতো এ হাসপাতালের আশপাশের এলাকার আরও অনেকে তাদের সন্তানকে নিয়ে এসেছেন। ঢাকার বাইরের রোগীও আসছে প্রতিনিয়ত।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় শিশুদের বিশেষায়িত এ হাসপাতালে জ্বর নিয়ে আসা রোগীর চাপ বেড়েছে। এতে চিকিৎসার পাশাপাশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বেগ পেতে হচ্ছে রোগীদের।

শনিবার হাসপাতালে ঢুকতেই রিপোর্ট সংগ্রহ কক্ষের সামনে রোগী ও তাদের স্বজনদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। কয়েকজন জানালেন, রিপোর্ট পেতে তাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে দুই-তিন ঘণ্টা।

বেলা পৌঁনে ১টায় লাইনে দাঁড়িয়ে দুপুর সাড়ে ৩টাতেও রিপোর্ট পাননি ফার্মেগেইট থেকে আসা হোসনে আরা। তিনি জানান, ১০ মাস আগে তার মেয়ের ডেঙ্গু হয়েছিল। এখন আবার জ্বর আসায় টেস্ট করিয়েছেন।

“একটা রিপোর্ট নিতে যদি এত সময় লাগে, তাহলে অন্য কাজ করব কখন? রিপোর্টগুলো গুছিয়ে রাখলে দিতে তো সুবিধা হয়। কিন্তু ওনারা ওইটা করেন না। একজনকে রিপোর্ট দিতেই অনেক সময় লাগছে,” কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়েই বলেন তিনি।

শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম জানান, ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়লেও চিকিৎসক ও কর্মী না বাড়ায় চিকিৎসা দিতে তাদেরও বেগ পেতে হচ্ছে।

তার ভাষ্য, “রোগী হঠাৎ করে বাড়ছে, কিন্তু ডাক্তার তো হঠাৎ বাড়াতে পারি নাই। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি একটা এমারজেন্সির জায়গায় দুইটা এমারজেন্সি করে রোগীদের চিকিৎসা দিতে। তারপরেও যদি ব্যাপক হারে রোগী আসে, তখন তো লাইনে দাঁড়াতেই হয়।”

রোগীর চাপ বেড়ে গেলে জনবলের সংকট দেখা দেওয়ার কথা বললেন তিনি। রোগীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, “আমাদের ইনভেস্টিগেশন বাড়ছে, কিন্তু জনবল তো আমরা বাড়াতে পারি নাই। হঠাৎ করে জনবল তৈরিও করা যায় না।“

শনিবার বিকালের তথ্য অনুযায়ী, এ হাসপাতালে ১১৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন এবং আইসিইউতে রয়েছেন ৯ জন।

শিশুদের দুটি ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, সব শিশুরই স্যালাইন চলছে। শিশুদের শান্ত রাখতে অনেক বাবা-মা তাদের হাতে মোবাইল ফোন দিয়ে রেখেছেন। কেউ কেউ স্যালাইনের পাশাপাশি শিশুকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন।

শেষ পর্যায়ে আসছেন অনেকে

১ নম্বর ওয়ার্ডে ডিউটিরত চিকিৎসক ফারহানা ইয়াসমিন জানান, রোগীদের নিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

“অনেক রোগী ভর্তি হচ্ছে। ক্রিটিক্যাল রোগীও আসছে। অনেক রোগী এসেও তাদের অবস্থা খারাপ হচ্ছে। শেষ পর্যায়ে আসলে তো অবস্থা খারাপের দিকে যায়।”

প্রাথমিক পর্যায়ে যারা আসছেন, তারা দ্রুত বাসায় ফিরে যেতে পারছেন বলে জানান ফারহানা।

পুরানো খবর:

ডেঙ্গুর টিকা তৈরির উদ্যোগ নেবে বিএসএমএমইউ
সরকারের ভাবনায় ডেঙ্গুর টিকা
ডেঙ্গু: ভয়ঙ্কর জুলাই মৃত্যু নিল ২৫১ জনে, রোগী ছাড়াল ৫১ হাজার
ডেঙ্গু: ২৪ ঘণ্টায় ৯ মৃত্যু, ঢাকার বাইরে রোগী বেশি

হাসপাতালে থাকা অভিভাবকদের অভিযোগ, বাচ্চারা স্কুল থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছে।

সাড়ে ৬ বছর বয়সী ফারিয়া শেরে বাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। ১০৪ ডিগ্রি জ্বর ও শরীরে র‌্যাশ নিয়ে শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

মেয়ে স্কুলে গিয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ধারণা করে ফারিয়ার বাবা জামাল হোসেন বলেন, “পাশের বেডের মেয়েটাও তো ওই স্কুলের। ওই বাচ্চারও ডেঙ্গু হইছে। স্কুলগুলা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। নয়তো তো আমরা বাসায় যত সচেতন থাকি না কেন, ওদের ডেঙ্গু হবে।”

ঢাকার তেজগাঁওয়ের বাসিন্দা তাসলিমা ১০ মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বাচ্চার কান্না থামাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন তিনি। জানালেন, তার মেয়ে নিউমোনিয়া ও ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছে।

২ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি পৌনে ২ বছরের সারাহ মোবাইলে কার্টুন দেখে মায়ের হাতে খাবার খাচ্ছিল।

তার মা নাসরিন নাহার বলেন, “হঠাৎ জ্বর আসল। জ্বর বেশি থাকায় টেস্ট করায় দেখলাম ডেঙ্গু। বাচ্চা খেতে চায় না, তাই হাসপাতালে ভর্তি করলাম। স্যালাইন চলতেছে। আর জোর করে একটু খাওয়াই।”

আদাবরের বাসিন্দা চিনু মজুমদারের ৮ বছর বয়সী ছেলেও ভর্তি আছে সেখানে।

তিনি বলেন, ছেলের প্রথমে ১০০-১০১ ডিগ্রি জ্বর ছিল। নাপা খাওয়ার পর তা চলে গেলেও এক সপ্তাহ পরে আবার জ্বর আসে।

“তখন শিশু স্পেশালিস্ট অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ দেয়। কিন্তু ওষুধে খেয়ে ছেলের বমি, পাতলা পায়খানা শুরু হয়ে যায়। পরে ডাক্তার টেস্ট করে দেখল ডেঙ্গু হইছে।”

চিনু মজুমদারেরও দাবি, তার ছেলে স্কুল থেকে এইডিস মশার কামড়ে আক্রান্ত হয়েছে।

“আমরা মশারি ছাড়া ঘুমাই না। আমার বড় ছেলের, আমাদের কারও ডেঙ্গু হইল না। ওর কিভাবে হলো? স্কুল থকেই ওর হইছে।”

শুধু রাজধানীর নয়, বাইরের অনেক শিশুও ডেঙ্গু নিয়ে আসছে হাসপাতালে। ১ নম্বর ওয়ার্ডে শনিবার দুপুরে হেমায়েতপুরের দেড় বছর বয়সী মহুয়াকে ভর্তি হতে দেখা গেল। শিশুটির চিৎকার আর কান্না থামছিলই না।

তার মা আফরোজা বেগম জানান, মেয়ের জ্বর কমছিল না দেখে হাসপাতালে এসেছেন।

”ভর্তি না করে করব কী? জ্বরেই মেয়েটা অনেক কান্নাকাটি করছে। বাচ্চাকে তো বাঁচানো লাগবে,” বলেন তিনি।

পরিচালকের পরামর্শ

আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ৯ জন রোগী জ্বরের শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে আসায় তাদের অবস্থা সংকটাপন্ন হয়েছে বলে জানান পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম। ভর্তি অন্য শিশুদের অবস্থা অনেকটা স্থিতিশীল যাদের ৬০ শতাংশের বয়স ৩-১০ বছর। এক বছরের নিচে রয়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ।

পুরানো খবর:

ডেঙ্গু: রোগীরা ছুটছে রাজধানীতে, হিমশিম খাচ্ছে ঢাকা মেডিকেল
ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৩০০ ছাড়াল, এক বছরে সর্বোচ্চ
এ বছর হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ৬০ হাজার ছাড়াল

জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ডেঙ্গু ও সিবিসি পরীক্ষা করানোর তাগিদ দিয়ে এ রোগের বিপদ চিহ্নগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি।

এর মধ্যে রয়েছে- পেটে ব্যাথা, বমি হওয়া, পেট ফুলে যাওয়া, শরীরের কোনো জায়গা থেকে রক্তক্ষরণ হওয়া, প্রচণ্ড মাথা ব্যাথা, শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া, নিস্তেজ হয়ে যাওয়া, বুকে ব্যাথা, পালস ও প্রেসার কমে যাওয়া, প্লাটিলেট কমে যাওয়া।

এগুলো দেখা গেলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে পরামর্শ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। শুরুর দিকে এলে অতটা ভয়ের কিছু নেই বলেও মনে করেন তিনি।

ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে তার পরামর্শ- ঘরের আঙিনা পরিষ্কার রাখতে হবে, ঘর মশামুক্ত রাখতে হবে, মশারি টানিয়ে ঘুমাতে হবে, স্কুলে গেলে বাচ্চাকে হাঁটু পর্যন্ত মোজা পরিয়ে দিতে হবে, বিনোদনকেন্দ্রে বিকালে না যাওয়া এবং স্কুল কর্তৃপক্ষকে স্কুল পরিষ্কার রাখতে হবে।