Published : 17 Sep 2025, 08:40 PM
কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে নেতৃত্বদানকারী সমন্বয়করা জীবন হুমকির মুখে পড়লে গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে চলে যান বলে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষ্য দেওয়ার সময় একথা বলেন জুলাই আন্দোলনে এ সমন্বয়ক।
চব্বিশের ১৮ জুলাইয়ের ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেদিন সারা দেশের সর্বস্তরের ছাত্রজনতা রাস্তায় নেমে আসে। বিশেষ করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীরা রাজপথে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
“আমরা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ জীবনের হুমকির মুখে পড়ি এবং গ্রেপ্তার এড়াতে আমরা আত্মগোপনে চলে যাই। সেদিন সারা দেশে অনেক ছাত্রজনতা আহত ও নিহত হয়।”
নাহিদ বলেন, “সেদিন রাতে সারা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। একইভাবে ১৯ জুলাই পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা আন্দোলনরত ছাত্রজনতার ওপরে নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে অনেক ছাত্রজনতা আহত ও নিহত হয়।
“১৯ই জুলাই আমরা বুঝতে পারি যে সরকার ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গেছে। আমাদের আন্দোলনের এবং আহত ও নিহতদের কোনো খবর কোনো মিডিয়ায় প্রচার হচ্ছিল না।”
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার ৪৭ নম্বর সাক্ষী নাহিদ ইসলাম। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় এক নম্বর সমন্বয়কের ভূমিকায় ছিলেন তিনি।
বুধবার ট্রাইব্যুনালে তিনি ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে একই দাবিতে ২০২৪ সালের আন্দোলনেও নিজের সম্পৃক্ততা নিয়ে কথা বলেন। আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেন।
এদিন বিকাল ৪টা ২০ মিনিট পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য চলে। এরপরও সাক্ষ্য শেষ না হওয়ায় বৃহস্পতিবারের ফের সাক্ষ্য গ্রহণের সূচি রেখেছেন বিচারক।
নাহিদ বলেন, ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্রলীগ রাতে হলে হলে গিয়ে আক্রমণ করে। পুলিশ দমন পীড়ন চালায়। আন্দোলন তীব্র হলে শেখ হাসিনা সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন।
“যদিও আমরা চেয়েছিলাম কোটা সংস্কার, তবে সরকার কোটা পদ্ধতি সম্পূর্ণ বাতিল করে। তবুও আমরা এটিকে আপাতত মীমাংসা হিসেবে ধরে নিয়েছিলাম।…পরবর্তীতে সরকারের আচরণে আমরা বুঝতে পারি যে, সরকার আন্দোলন দমনের জন্য কোটা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কোটা বাতিল চায়নি। কিছুদিন পর শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমি রাগের বশবর্তী হয়ে কোটা বাতিলের কথা বলেছি’। আমরা ইতোমধ্যেই আশঙ্কা করেছিলাম যে, কোটা প্রথা আবার ফিরে আসতে পারে।”
এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাই কোর্ট ২০২৪ সালের ৫ জুন সরকারের কোটা বাতিল সংক্রান্ত ২০১৮ সালের পরিপত্র বাতিল করে দেয়। এরপর থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলন আবার দানা বাঁধতে থাকে।
নাহিদ বলেন, হাই কোর্ট পরিপত্র বাতিলের দিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা। পরে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রতিবাদ হয়। ৩০ জুনের মধ্যে সরকার সাড়া না দেওয়ায় ১ জুলাই থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ২০১৮ সালে জারিকৃত পরিপত্র পুনর্বহাল করে কোটা প্রথার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে আন্দোলন শুরু হয়।
২, ৩, ৪ জুলাই ধারাবাহিক কর্মসূচির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ৪ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে কোটা সংক্রান্ত বিষয়ে শুনানি ও আদেশ প্রদানের কথা থাকলেও সেদিন শুনানি হয়নি। তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকে। সরকার বলে, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় সরকারের কিছু করার নেই। কোনো বক্তব্য থাকলে তা আদালতে গিয়ে যেন বলা হয়।
“তখন আমরা জানতাম বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করা হয়েছে এবং বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে সরকার পরিকল্পিতভাবে কোটা প্রথা পুনর্বহাল করে। সে কারণে আদালতে না গিয়ে রাজপথে আন্দোলন অব্যাহত রাখি”, সাক্ষ্য দেন নাহিদ।
‘বাংলা ব্লকেড’ নামে ৭ জুলাইয়ের কর্মসূচি কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ১০ জুলাই আপিল বিভাগ হাই কোর্টের আদেশ স্থগিত না করে এক মাসের স্থিতাবস্থার আদেশ জারি করে।
“আমরা এতে হতাশ হই এবং নিশ্চিত হই যে বিচার বিভাগ থেকে এ বিষয়ে কোনো সমাধান পাওয়া যাবে না। অতঃপর আমাদের দাবি কিছুটা পরিবর্তন করে সরকারি চাকরিতে সকল পর্যায়ে কোটা প্রথার যৌক্তিক সংস্কার দাবি করি।”
তার ভাষ্য, “এ সময় আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হন। তারা কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর গেইট ছাত্রলীগ বন্ধ করে দিত, যাতে ছাত্ররা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে না পারে।”
আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলার প্রসঙ্গ টেনে এনসিপির এ নেতা বলেন, সেসময় সারাদেশের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের যুক্ত করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি সমন্বয়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
নাহিদ বলেন, “১৪ই জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি বরাবর একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়। ১৪ জুলাই রাতে শেখ হাসিনা একটি সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারী ছাত্রদেরকে রাজাকারের বাচ্চা এবং রাজাকারের নাতিপুতি অভিহিত করে কোটা প্রথার পক্ষে অবস্থান নেন। মূলত এই বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের উপর আক্রমণের একটি বৈধতা প্রদান করা হয়।
“কারণ আমরা সবসময় দেখেছি, সরকারের বিরুদ্ধে কোনো ন্যায্য আন্দোলন করা হলে তাদেরকে ‘রাজাকার’ আখ্যা দিয়ে আন্দোলনের ন্যায্যতা নস্যাৎ করা হত। ছাত্রদেরকে রাজাকারের বাচ্চা এবং রাজাকারের নাতিপুতি আখ্যায়িত করায় সমগ্র দেশের ছাত্রছাত্রীরা অপমানিত বোধ করে। সেই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল বক্তব্য প্রত্যাহার করে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের কাছে তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমা চাইতে হবে।”
১৫ই জুলাই বিক্ষোভ কর্মসূচি দিলে ছাত্রলীগও সেদিন পাল্টা কর্মসূচির ডাক দেয়। সেদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেসময়ের সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দেন, ‘আন্দোলন দমনের জন্য ছাত্রলীগই যথেষ্ট’। তার এই ঘোষণায় উজ্জীবিত ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণ করে ব্যাপক নির্যাতন চালায় বলে নাহিদের অভিযোগ।
হামলায় নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম, সাধারণ সম্পাদক ইনান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি শয়ন, সাধারণ সম্পাদক সৈকতের নাম বলেন তিনি।
নাহিদ বলেন, “১৬ই জুলাই সেই হামলার প্রতিবাদে সারা দেশে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়। সেদিন রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। চট্টগ্রামে ওয়াসিমসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ছয়জন নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডেরর প্রতিবাদে ১৭ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশে গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিলের ডাক দেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণা দেয়।
“সেদিন যাত্রাবাড়ীতে একজন আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়। সেদিন বিজিবি, পুলিশ ও র্যাব সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয় ঘেরাও করে ফেলে এবং গায়েবানা জানাজা শেষে কফিন মিছিল শুরু করলে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে।
“বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং পুলিশ আমাদেরকে হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়। সেদিন ডিজিএফআই আমাদেরকে কর্মসূচি প্রত্যাহার করার এবং সরকারের সাথে সংলাপের জন্য চাপ দেয়। হলের বিদ্যুৎ, পানি ও খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকারের সঙ্গে সংলাপে আমরা অস্বীকৃতি জানাই এবং বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার দাবি জানাই।”
নাহিদ বলেন, “১৮ই জুলাই সারাদেশের সর্বস্তরের ছাত্রজনতা রাস্তায় নেমে আসে, বিশেষ করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীরা সেদিন রাজপথে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আমরা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ জীবনের হুমকির মুখে পড়ি এবং গ্রেপ্তার এড়াতে আমরা আত্মগোপনে চলে যাই। সেদিন সারাদেশে অনেক ছাত্রজনতা আহত ও নিহত হয়।”
এরপর সরকার আন্দোলন দমাতে সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়, পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা নির্বিচারে গুলি চালায়, বলেন তিনি।