Published : 30 Jun 2026, 07:22 PM
জুয়া, অনলাইন জুয়া, অনলাইন বেটিং, ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং, ভিপিএন বা মিরর সাইট ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার অর্থ লেনদেনের শাস্তির বিধান রেখে ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।
মঙ্গলবার সংসদের বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি পাসের প্রস্তাব করেন। পরে বিরোধী দলের সদস্যদের আনা জনমত যাচাই, বাছাই কমিটিতে পাঠানো ও সংশোধনী প্রস্তাবগুলো কণ্ঠভোটে নিষ্পত্তির পর বিলটি পাস হয়।
বিদ্যমান পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭ রহিত করে নতুন আইনটি করা হচ্ছে। সংবিধানের ১৮(২) অনুচ্ছেদে জুয়া নিরোধে রাষ্ট্রের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নীতির কথাও বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ অংশে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিলে বলা হয়েছে, সাধারণ জুয়ার অপরাধে কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
অনলাইন জুয়া বা দূরবর্তী জুয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
আর অনলাইন বেটিংয়ের অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
বিলে খেলাধুলা, প্রতিযোগিতা, ই-স্পোর্টস, নির্বাচন, বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান বা অন্য কোনো ঘটনার ফলাফলের ওপর অর্থ বা সম্পদের বিনিময়ে অনলাইন, ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে পরিচালিত বেটিংকে ‘অনলাইন বেটিং’ বলা হয়েছে।
স্পোর্টস বেটিং, লাইভ বেটিং, এক্সচেঞ্জ বেটিং, ক্যাসিনো বেটিং, ভার্চুয়াল বেটিং, ফ্যান্টাসি বেটিং ও ই-স্পোর্টস বেটিংও এর মধ্যে পড়বে।
বিলে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
স্পট ফিক্সিংয়ের অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
আদালত চাইলে ম্যাচ ফিক্সিং বা স্পট ফিক্সিংয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অথবা স্থায়ীভাবে সংশ্লিষ্ট খেলাধুলা, প্রতিযোগিতা বা ক্রীড়া কার্যক্রমে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করতে পারবে।
জুয়ার বিজ্ঞাপন, প্রচার, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং বা রেফারেল ক্যাম্পেইনও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী, খেলোয়াড় বা সেলিব্রিটি জুয়ার উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তিকর প্রচার, মিথ্যা লাভের প্রতিশ্রুতি বা প্রলোভনমূলক বিজ্ঞাপন দিলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, হোস্টিং, ডোমেইন সার্ভিস, ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা, তথ্য গোপন বা ব্লক করা জুয়ার প্ল্যাটফর্ম পুনরায় চালুর অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
ভুয়া সিম, ‘ঘোস্ট’ সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট বা বায়োমেট্রিক জালিয়াতি ব্যবহার করে জুয়া বা বেটিং চালালে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
এ অপরাধ সংঘবদ্ধভাবে বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
জুয়ার অর্থ লেনদেন, ব্যাংক, এমএফএস, ডিজিটাল ওয়ালেট, হাওলা, হুন্ডি বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর বা গোপন করাকে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের অধীনে সম্পৃক্ত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।
বিলে বলা হয়েছে, এ আইনের অধীন অপরাধ হবে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস অযোগ্য।
অনলাইন জুয়া, অনলাইন বেটিং এবং সাইবার স্পেস ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধের বিচার হবে সাইবার ট্রাইব্যুনালে। অন্য অপরাধের বিচার হবে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে।
মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিলভুক্ত হওয়া সাপেক্ষে ভ্রাম্যমাণ আদালতেও এসব অপরাধের বিচার করা যাবে।
জুয়ার কাজে ব্যবহৃত অর্থ, সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টো অ্যাসেট, সার্ভার, ডোমেইন, সিম, ডিভাইস বা অন্য কোনো সম্পদ আদালত বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিতে পারবে।
বিলে কোম্পানি, করপোরেট সংস্থা, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, হোস্টিং প্রোভাইডার বা পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালক, নির্বাহী কর্মকর্তা, ব্যবস্থাপক, সচিব, অংশীদার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায় নির্ধারণের বিধানও রাখা হয়েছে।
জুয়া, অনলাইন জুয়া, বেটিং, অর্থপাচার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রতিরোধে ‘জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট’ ডেটাবেজ তৈরির বিধান রাখা হয়েছে বিলে।
এই ডেটাবেজে অপরাধীর তথ্য, জাতীয় পরিচয়পত্র, সিম, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ব্যাংক হিসাব, ওয়ালেট, ডিভাইস, ডোমেইন, আইপি অ্যাড্রেস, ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।
এছাড়া এনআইডি-সিম-এমএফএস লিংকিং সিস্টেম, বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন, ফেসিয়াল রিকগনিশন ও ঝুঁকিভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থা চালুর কথাও বলা হয়েছে।
বিলে এআই মনিটরিং সিস্টেম, ডিপ প্যাকেট ইন্সপেকশন, রিস্ক স্কোরিং, ট্রানজেকশন মনিটরিং ও ডেটা অ্যানালিটিকস ব্যবহার করে অনলাইন জুয়া শনাক্তের ক্ষমতা রাখা হয়েছে।
সংসদে আপত্তি
বিলের আলোচনায় রংপুর-৪ আসনের এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, বিলের বাহ্যিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে তিনি একমত। তবে কয়েকটি ধারায় ভবিষ্যতে ‘অপব্যবহারের আশঙ্কা’ আছে।
তল্লাশি, জব্দ, জুয়ার স্থান সিলগালা এবং ওয়েবসাইট, অ্যাপ, সার্ভার, ডোমেইন ও আইপি অ্যাড্রেস ব্লক করার ক্ষমতা নিয়ে আপত্তি জানান তিনি।
আখতার বলেন, “সরকার হয়ত মিসইউজ করতে চায় না, কিন্তু সেই কর্তৃপক্ষ যদি আইনটাকে মিসইউজ করতে চায়, তাহলে নাগরিক যে অধিকার সেটা খর্ব হতে পারে মাননীয় স্পিকার।”
আদালতের অনুমতি ছাড়া এসব ক্ষমতা দেওয়া হলে নাগরিক অধিকারের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার আশঙ্কা, “জুয়া প্রতিরোধের কথা বলে সরকারের সমালোচনা করছে এমন কোনো ওয়েবসাইট এমন কোনো নিউজ পোর্টাল এমন কোনো ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট সেগুলোকে ব্লক করে দেওয়া হতে পারে।”
এনআইডি, সিম ও এমএফএস লিংকিং নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আক্তার। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ ব্যবস্থা না হলে নিরপরাধ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রসঙ্গ টেনে আক্তার বলেন, শুরুতে অনলাইন অপরাধ দমনের কথা বলা হলেও পরে সেই আইন ‘রাজনৈতিক বিরোধী মত দমনে’ ব্যবহার করা হয়েছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাব
আখতার হোসেনের আপত্তির জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এখন জুয়া সাইবার স্পেসে, অনলাইনে এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইটে হয়। আদালতের অনুমতি নিতে গেলে অপরাধের আলামত বা স্থান দ্রুত সরিয়ে ফেলার ঝুঁকি থাকে।
তল্লাশি ও জব্দের ক্ষমতার বিষয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন আইনে পুলিশের তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা রয়েছে; এই বিলেও সেই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।
ওয়েবসাইট, অ্যাপ, ডোমেইন, আইপি অ্যাড্রেস বা যোগাযোগ চ্যানেল ব্লক করার ক্ষমতার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এটা ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নয়। এটা কোনো সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট নয়।”
তিনি বলেন, অবৈধ জুয়ার ওয়েবসাইট বন্ধ করতে এখন অনেক সময় অনানুষ্ঠানিকভাবে পদক্ষেপ নিতে হয়। একটি ওয়েবসাইট বন্ধ করা হলে পরদিন আবার আরেকটি সাইট চালু হয়।
বিরোধী দলের সদস্যরা আইন প্রণয়নে যথাযথ ভূমিকা রেখেছেন বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
‘আনকন্ডিশনাল’ ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বিশেষ কমিটির রিপোর্টে দেওয়া নিজের ভিন্নমতের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, পুলিশকে আদালতের অনুমতি ছাড়া মালামাল জব্দের ক্ষমতা দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা দরকার।
তিনি বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধিতে আদালতের অনুমতি ছাড়া জব্দ করার ক্ষমতা থাকলেও অনতিবিলম্বে ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করার বিধান আছে।
নাজিবুর বলেন, এই আইনে পুলিশকে একেবারে ‘আনকন্ডিশনাল’ ক্ষমতা দিলে তা ফৌজদারি কার্যবিধি ও বিলের বিদ্যমান ধারার সঙ্গে ‘সাংঘর্ষিক’ হতে পারে।
আইনটি যুগোপযোগী হলেও অপব্যবহার ঠেকাতে জব্দের পর দ্রুত ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নেওয়ার বিধান যুক্ত করা উচিত বলে মত দেন তিনি।
‘অপব্যবহার না হয়’
বিল পাসের পর পয়েন্ট অব অর্ডারে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, “আইনটির পক্ষে আমরা আছি, সরকারের প্রতি সাধুবাদও জানিয়েছি। কিছু সুনির্দিষ্ট ধারায় বিরোধী দলের সংশোধনী ছিল, সেগুলো সরকার সেগুলো গ্রহণ করলে আমরা খুশি মনে, আরও সাদরে সমর্থন করতে পারতাম।”
তিনি বলেন, “আমরা আশা করব, যাতে এই আইনে সংশোধনীগুলো সরকার পরবর্তীতে বিবেচনা করে। কারণ আইনটি প্রয়োগে গেলে, ভালো করে বুঝতে পারব। এই আইনের যাতে অপব্যবহার না হয়, নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার হরণ না হয় সে দিকে খেয়াল রাখেন।”