১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

বন্দর পরিচালনায় হাই কোর্টের রায় বহাল, বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা যাবে: আপিল বিভাগ

“বাংলাদেশ সরকারের সাথে দুবাই গভমেন্টের, সেটির স্বচ্ছতাকে চ্যালেঞ্জ করে যে রিটটি করা হয়েছিল, রিটটি প্রথমে খারিজ হয়ে যায় দুই-এক ব্যবধানে।”

বন্দর পরিচালনায় হাই কোর্টের রায় বহাল, বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা যাবে: আপিল বিভাগ
ফাইল ছবি

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 12 Mar 2026, 01:39 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:08 PM

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তির চলমান প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নে জারি করা রুল খারিজের রায় বহাল রেখেছে আপিল বিভাগ। 

এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় বন্দর কর্তৃপক্ষের বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে কোনো বাধা থাকল না বলে রাষ্ট্রের আইনজীবী জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।

গত ২৯ জানুয়ারি এই চুক্তির চলমান প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নে জারি করা রুল খারিজ করে রায় দেয় বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাই কোর্ট বেঞ্চ। 

বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের করা রিটে ওই রুল জারি করেছিল হাই কোর্ট।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট জমির উদ্দিন সরকার, অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম, অ্যাডভোকেট মাহবুব উদ্দিন খোকন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।

অনীক আর হক সাংবাদিকদের বলেন, “নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালের সাথে বিদেশিদের যে ম্যানেজমেন্টের চুক্তিটা হচ্ছিল বাংলাদেশ সরকারের সাথে দুবাই গভমেন্টের, সেটির স্বচ্ছতাকে চ্যালেঞ্জ করে যে রিটটি করা হয়েছিল, রিটটি প্রথমে খারিজ হয়ে যায় দুই-এক ব্যবধানে। 

“মানে দুজন বিচারপতি বলেন যে এটিতে তাদের কোনো সারবত্তা নেই, আর একজন বলেন যে হ্যাঁ, রুলটিতে সারবত্তা রয়েছে, তাই তিনি রুলটিকে অ্যাবসলিউট করেন। সেটার বিরুদ্ধে যুব অর্থনীতিবিদ ফোরাম আপিল বিভাগে আপিলের অনুমতি চেয়ে লিভ টু আপিল দরখাস্ত ফাইল করে এবং আজকে... গতকালকে শুনানির পরে আজকে আদেশ দিয়ে ওই হাই কোর্টের অর্ডারের বিরুদ্ধে তারা যে লিভ টু আপিল করেছেন সেটিকে খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। 

"ফলে এখন সরকার বিদেশি যাদের সাথে চুক্তি করতে যাচ্ছে বা যাদের সাথে তাদের কথা চলছিল, তাদের সাথে চুক্তি করার ব্যাপারে আর কোনো বাধা থাকল না।"

অনীক আর হক বলেন, "বাংলাদেশ সরকারের সাথে দুবাই গভমেন্টের একটা জিটুজি চুক্তি, যেটাকে আমরা বলি গভমেন্ট টু গভমেন্ট চুক্তি হয়। এবং সেটার সাথে আরো আইন থাকে, সেটা হচ্ছে যে প্রাইভেট পার্টনারশিপ অ্যাক্ট, বিদেশ থেকে যারা আমাদেরকে এখানে এসে ইনভেস্ট করবেন তাদের সাথে কাজ করার জন্য আলাদা একটা আইন তৈরি করা হয়। তার সাথে সাথে চট্টগ্রাম পোর্ট অথরিটি যারা, তাদেরও আইনের মধ্যে বলা আছে যে, যে পোর্টের যেকোনো কন্টেইনার টার্মিনাল বা এই যেগুলো রয়েছে সেগুলোকে তারা বিদেশিদের ম্যানেজমেন্টে অপারেট করার জন্য দিতে পারবে।

"তো যখন ওই দুবাই গভমেন্টের সাথে এই চুক্তিটা হয়, তারপরে তখন এই নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালটাকে আইডেন্টিফাই করা হয় যে এখানে তারা ইনভেস্ট করবে।"

তিনি জানান, ইনিশিয়ালি ইনভেস্টমেন্টের কথা বাংলাদেশ সরকার থেকে চিন্তা করা হয়েছিল ২০০ কোটি টাকা। পরবর্তীতে যখন এটাকে প্রোপারলি ইভালুয়েট করা হলো, তখন দেখা গেল যে না, এটা ২০০ কোটি টাকার প্রজেক্ট না, এটা ২৪০০ কোটি টাকার প্রজেক্ট। এবং দুবাই গভমেন্ট রাজি হলেন যে তারা ২৪০০ কোটি টাকা ইনভেস্ট করে এটাকে নতুন মডার্নাইজেশন করবেন, আধুনিকায়ন করে, সংস্কার করে, এটাকে তারা অপারেট করবেন এবং ম্যানেজমেন্ট করবেন।

এই পুরো প্রক্রিয়াটাকে চ্যালেঞ্জ করেছে হাই কোর্টে এসে যুব অর্থনীতিবিদ ফোরাম নামে একটি অর্গানাইজেশন। 

"হাই কোর্টে শুনানি শেষে হত বিচারপতি ফাতেমা নজীব এবং বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার একটা স্প্লিট জাজমেন্ট দিলেন, অর্থাৎ দুইজন দুই রকম বললেন। বিচারপতি ফাতেমা নজীব বললেন যে রুলের সারবত্তা তিনি খুঁজে পেয়েছেন এবং রুলটাকে অ্যাবসলিউট করলেন, যে এটাতে স্বচ্ছতা ছিল না, এটা প্রোপার আইন ফলো করে করা হয়নি। অন্যদিকে বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার বললেন যে সকল আইনগুলো দেখে সঠিকভাবেই এটা করা হয়েছে এবং আরেকটি জিনিস বললেন যে, যারা রিট পিটিশনটা করেছেন তাদের লোকাস স্ট্যান্ডাই নেই, তাদের এই মামলাটার ব্যাপারে কোনো অধিকার নেই যে তারা এই কেসটি করবেন।"

অনীক বলেন, “যেহেতু স্প্লিট জাজমেন্ট হল, তৎকালীন মাননীয় প্রধান বিচারপতি কেসটাকে পাঠিয়ে দিলেন তৃতীয় জাজের কাছে, দ্যাট ইজ জাস্টিস জাফর আহমেদের কাছে এবং জাস্টিস জাফর আহমেদ, এখানে প্রচুর লম্বা সময় ধরে শুনানি হলো, প্রায় চার ছয় সপ্তাহের মতো শুনানি হয়েছিল ওখানে। উনি বললেন যে অ্যাকচুয়ালি এই চুক্তির ব্যাপারে যা যা আইনগত দিকগুলো রয়েছিল, যা যা আইনগত প্রক্রিয়ার ইনগ্রেডিয়েন্টগুলো ছিল, প্রত্যেকটাই সরকার ফলো করেছে। এবং ফলে এই চুক্তি করতে কোনো বাধা নেই এবং এখানে কোনো অস্বচ্ছতা তিনি খুঁজে পাননি।

"সেই রায়ের বিরুদ্ধেই অ্যাকচুয়ালি গতকালকে শুনানি হয় আপিল বিভাগে এবং আপিল বিভাগ সবকিছু শুনে ফাইনালি একদম বলে দিলেন যে তাদের করা আপিলটিকে লিভ টু আপিলটিকে খারিজ করে দেওয়া হলো। কারণ যে এখানে কোনো আইনের ব্যত্যয় ঘটেনি, কোনো অস্বচ্ছতা ছিল না এবং যারা মামলা করতে এসেছেন তাদের এখানে মামলাটি করার অধিকার বা লোকাস স্ট্যান্ডাই নেই।'

মামলার পূর্বাপর 

গত ৩০ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির চলমান প্রক্রিয়া কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দেয় হাই কোর্ট। 

বিচারপতি হাবিবুল গনি ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ এ রুল দেন। একইসঙ্গে যেকোনো অপারেটরকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব (নিযুক্ত) দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতি অনুসারে ন্যায্য ও প্রতিযোগিতামূলক পাবলিক বিডিং (দরপত্র আহ্বান) নিশ্চিত করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা-ও জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে।

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের পক্ষে সংগঠনটির সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন রিটটি করেন। রিটে নৌসচিব, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হয়।

নিউমুরিং টার্মিনালে সবই আছে, তবু কেন বিদেশির হাতে যাচ্ছে’ শিরোনামে গত ২৬ এপ্রিল একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন ছাপা হয়। এ প্রতিবেদনসহ এ বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে এনসিটি পরিচালনায় ন্যায্য ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করার নির্দেশনা চেয়ে রিটটি করা হয়।