Published : 12 Mar 2026, 07:27 PM
‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে’ যত দ্রুত সম্ভব পেট্রোল ও অকটেনের রেশনিং তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীদের একটি সংগঠন।
তারা বলছেন, সরকারের রেশনিংয়ের ‘ভুল’ হিসাব-নিকাশ পরিস্থিতি আরও ‘জটিল’ করেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটার্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন নামের এই সংগঠনটি বৃহস্পতিবার দুপুরে ধানমন্ডির একটি রেস্তোরাঁ সংবাদ সম্মেলনে এসে তাদের দাবির কথা তুলে ধরেছে।
দেশের পেট্রোল পাম্প মালিক, সকল ধরনের জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী ও ট্যাংক লরি মালিক এই সংগঠন এই অ্যাসোসিয়েশনের আওতাভুক্ত।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় গত কয়েক দিনে পাম্পে পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। ঢাকায় তেল বিক্রি ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার খবর আসে।
এই পরিস্থিতিতে গত ৬ মার্চ ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসি।
ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মোটরসাইকেলে দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার, ব্যক্তিগত গাড়িতে ১০ লিটার, এসইউভি, জিপ ও মাইক্রোবাসে ২০ থেকে ২৫ লিটার পর্যন্ত অকটেন বা পেট্রোল বিক্রি করা হচ্ছে।
ডিজেলচালিত পিকআপ ও লোকাল বাসে ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও কনটেইনারবাহী যানবাহনে ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
এরপর অনিয়ম, মজুদদারি ও বেশি দামে বিক্রি ঠেকাতে জেলা প্রশাসকদের মোবাইল কোর্ট চালানোর নির্দেশ দেয় সরকার। অবৈধ মজুদ, বেশি দাম নেওয়া ও চোরাচালান ঠেকাতে এই অভিযান পরিচালনার কথা বলা হয়।
এমন প্রেক্ষাপটে সংবাদ সম্মেলনে আসেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটার্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।
এর আগে তারা রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহ উন্মুক্ত করার জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসির চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেছেন, “সারাদেশে পেট্রোল ও অকটেনের প্রকৃত ঘাটতি নেই। সিলেট গ্যাস ফিল্ড থেকে উৎপাদিত কনডেনসেট পরিশোধনের মাধ্যমে দেশের মোট পেট্রোল ও অকটেন চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সিলেটেই উৎপাদিত হয়।
“মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক অস্থিরতার সাথে সিলেটের গ্যাস ও কনডেনসেট উৎপাদনের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক নেই।”
সারাদেশে পেট্রোল ও অকটেনের ওপর আরোপ করা যৌক্তিক নয় দাবি করে তিনি বলেন, সিলেট গ্যাস ফিল্ড এবং দেশের বেসরকারি শোধনাগারে পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদিত হয়, যার পুরাটাই বিপিসি পেয়ে থাকে। ফলে এই পণ্যের সাথে যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই।
সে কারণে পেট্রোল ও অকটেনে রেশনিং বন্ধ হওয়া জরুরি বলে মনে করে জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীদের এ সংগঠনটি।
তাদের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, “মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সারাদেশে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমে গুজবের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত জ্বালানি ক্রয় শুরু হয়। এর ফলে বাজারে হঠাৎ চাপ তৈরি হয়।
“তবে সংকটের সূচনা গুজব থেকে হলেও, পরবর্তীতে বিপিসি তড়িঘড়ি করে জ্বালানি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে কোনো প্রকার আলোচনা না করেই রেশনিংয়ের একটা নীতিমালা দেয়। এই বিপণন নীতিমালা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত ও দীর্ঘায়িত করেছে।”

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটার্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন দাবি করছে, “এই সংকট মূলত প্রকৃত মজুদ ঘাটতির ফল নয়, বরং এটি বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ কাঠামো এবং নীতিগত ত্রুটির ফল।”
সংগঠনের আহ্বায়ক সাজ্জাদুল করিম বলেন, গত রোববার থেকে বিপিসি প্রতিটি পেট্রোল পাম্পের ওপর ‘কোটা’ আরোপ করে এবং পূর্ববর্তী সময়ের গড় উত্তোলনকে ভিত্তি ধরে ২৫ শতাংশ কম সরবরাহের নীতি গ্রহণ করে। দেশে সামগ্রিকভাবে জ্বালানি মজুদ সংরক্ষণের দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের নীতি বিবেচ্য হতে পারে, তবে সারাদেশের বাস্তবতায় এই নীতির প্রয়োগে একাধিক গুরুতর ‘ত্রুটি’ রয়েছে।
রেশনিংয়ের ক্ষেত্রে বিপিসি ভুল সময়কালকে ভিত্তি হিসেবে ধরেছে দাবি করে সাজ্জাদুল করিম বলেন, “বিপিসি মার্চ থেকে জুন সময়কালের গড় উত্তোলনকে ভিত্তি ধরে সরবরাহ কমিয়েছে। অথচ জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে চাহিদা তুলনামূলক বেশি থাকে। ফলে মার্চ-জুনের গড় ধরে বর্তমান সরবরাহ নির্ধারণ করা বাস্তবসম্মত নয়। মাসভিত্তিক বা সমমানের সময়কালভিত্তিক তুলনা অধিক যৌক্তিক হতো।”
পেট্রোল পাম্পগুলো বাস্তবে সপ্তাহে সর্বোচ্চ পাঁচ দিন এবং মাসে গড়ে ২০-২২ দিন জ্বালানি তেল উত্তোলন করে, কিন্তু বিপিসি ৩০ দিন ধরে ভাগ করে দৈনিক কোটা নির্ধারণ করেছে, বলেন তিনি।
এর ফলে কাগজে ২৫ শতাংশ সরবরাহ হ্রাস দেখালেও, বাস্তবে সরবরাহ আরও অনেক বেশি কমে গেছে দাবি করে সাজেদুল করিম বলেন, “হিসাবগত ত্রুটির কারণে কোটা বাস্তবে এক-তৃতীয়াংশের বেশি কম পড়েছে। ফলে এখন মোট ৪৫ শতাংশ তেল বাজারে কম আসছে।”
সংগঠনের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, বহু পাম্পের জন্য বরাদ্দ এমনভাবে কমে গেছে যে, ৫০০০ থেকে ৯০০০ লিটার ধারণক্ষম ট্যাংক লরি ‘পূর্ণ লোডে’ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ‘আংশিক লোডে’ তেল উত্তোলন করতে গেলে পরিবহন ব্যয় ডিলারের প্রাপ্য কমিশনের চেয়েও বেশি হয়ে যাচ্ছে। ফলে জ্বালানি উত্তোলন বাণিজ্যিকভাবে ‘অলাভজনক ও অকার্যকর’ হয়ে পড়ছে।
“অর্থাৎ, কাগজে বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে অনেক পাম্প তেল তুলতে পারছে না। ডিলাররা যে পরিমাণ তেল বরাদ্দ পাচ্ছেন, সেটার পরিবহণ খরচ ডিলার কমিশন থেকেও বেশি।”
এই পরিস্থিতির জন্য সাজ্জাদুল করিম আমলাদের দায়ী করে বলেন, “মাঠপর্যায়ের চাহিদা, পরিবহন বাস্তবতা, সপ্তাহভিত্তিক ওঠানামা এবং পাম্পভিত্তিক প্রয়োজন সম্পর্কে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা বিপণন কোম্পানিগুলোর প্রত্যক্ষ ধারণা রয়েছে।
“কিন্তু তাদের পর্যাপ্ত কার্যকর স্বাধীনতা না দিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে কঠোর সীমা আরোপ করায় বাস্তব পরিস্থিতির সাথে নীতির বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে।”
সরকারের এই নীতিগত সীমাবদ্ধতার ফলে সারাদেশে সরবরাহ ব্যবস্থায় কৃত্রিম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, “বহু পাম্প বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও কার্যকরভাবে তেল উত্তোলন করতে পারেনি। বাজারে দীর্ঘ লাইন, অসন্তোষ, বিশৃঙ্খলা এবং পাম্পকর্মীদের উপর আক্রমণ ও হেনস্থার ঘটনাও ঘটেছে। অর্থাৎ শুধু সরবরাহ-সংকট সৃষ্টি করেনি, এটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটিয়েছে।”
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দৈনিক কোটার পরিবর্তে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে কোটা নির্ধারণের দাবি তুলে ধরেন তেল ব্যবসায়ীদের এ সংগঠনটির আহ্বায়ক। সেই সাথে চাহিদার ওঠানামা অনুযায়ী সরবরাহ সমন্বয় করার দাবি তুলেছেন তিনি।
আগের খবর:
রেশনিং, মোবাইল কোর্ট আর লাইনের চাপে পাম্প চালানো কঠিন হচ্ছে, বলছে
বিভাগীয় শহরে অকটেন-পেট্রোল সরবরাহ কমানোর হার ১৫ শতাংশে নামাল বিপিসি