Published : 11 Mar 2026, 05:30 PM
জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং, মোবাইল কোর্টের নজরদারি এবং পাম্পে দীর্ঘ লাইনের চাপে ফিলিং স্টেশন চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।
বুধবার ঢাকার স্কাই সিটি হোটেলে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পাম্প মালিক ও কর্মচারীদের ‘নাভিশ্বাস’ উঠছে, কিন্তু তাদের নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষায় ‘পর্যাপ্ত সহায়তা’ মিলছে না।
তিনি বলেন, “প্রতিটা পেট্রোল পাম্পে এক ধরনের বিভীষিকাময় ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের আদেশ-নির্দেশ ও তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নাভিশ্বাস আমরা।”
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় গত কয়েক দিনে পাম্পে পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। ঢাকায় তেল বিক্রি ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার খবর আসে।
এই পরিস্থিতিতে গত ৬ মার্চ ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসি।
ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মোটরসাইকেলে দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার, ব্যক্তিগত গাড়িতে ১০ লিটার, এসইউভি, জিপ ও মাইক্রোবাসে ২০ থেকে ২৫ লিটার পর্যন্ত অকটেন বা পেট্রোল বিক্রি করা হচ্ছে।
ডিজেলচালিত পিকআপ ও লোকাল বাসে ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও কনটেইনারবাহী যানবাহনে ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
এরপর অনিয়ম, মজুদদারি ও বেশি দামে বিক্রি ঠেকাতে জেলা প্রশাসকদের মোবাইল কোর্ট চালানোর নির্দেশ দেয় সরকার। অবৈধ মজুদ, বেশি দাম নেওয়া ও চোরাচালান ঠেকাতে এই অভিযান পরিচালনার কথা বলা হয়।
পাম্প মালিকদের সংগঠন বলছে, এই মনিটরিং পদ্ধতি মাঠপর্যায়ে তাদের জন্য ‘নতুন চাপ’ তৈরি করছে।
সংবাদ সম্মেলনে নাজমুল হক বলেন, কোনো পাম্পে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে মোবাইল কোর্ট ঢুকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেন ‘কোনো ডাকাত বা সন্ত্রাসী’ ধরতে যাওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, এতে পাম্প মালিকদের ‘সোশাল পানিশমেন্ট’ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকার চাইলে কোম্পানি থেকে সরবরাহ হওয়া তেল পাম্পের আন্ডারগ্রাউন্ড ট্যাংক ও ডিসপেনসারের মিটার রিডিং মিলিয়েই অনিয়ম শনাক্ত করতে পারে। সে জন্য মোবাইল কোর্টের প্রয়োজন নেই।
তবে একই সঙ্গে সংগঠনটি বলেছে, কোনো ফিলিং স্টেশন বা নৌযানে অবৈধ মজুদ ধরা পড়লে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পক্ষে তারা।
কেউ অনিয়ম করলে পাম্প মালিকরা সরকারকে সহযোগিতা করবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় সংবাদ সম্মেলনে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘কিছু অসাধু ব্যক্তি’ মজুদ; করে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে, তাই মাঠপর্যায়ে নজরদারি প্রয়োজন। এমন অভিযোগের ভিত্তিতেই সরকার মোবাইল কোর্ট নামানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
পাম্প মালিকদের আরেকটি আপত্তি রাইড-শেয়ারের মোটরসাইকেলের জন্য জ্বালানি সীমা বাড়ানো নিয়ে।
মঙ্গলবার বিপিসি মহানগর এলাকায় রাইড-শেয়ারিংয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের জন্য দৈনিক ৫ লিটার পর্যন্ত অকটেন বা পেট্রোল সরবরাহের নির্দেশ দেয়। এর জন্য নিবন্ধন নম্বর ও চালকের তথ্য অ্যাপভিত্তিক রাইড-শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার শর্ত দেওয়া হয়।
সংগঠনটির দাবি, একটি মোটরসাইকেলের কাগজপত্র যাচাই করতে যে সময় লাগবে, তাতে পাম্পে আরও দীর্ঘ জট তৈরি হবে এবং লাইনে দাঁড়ানো অন্য ক্রেতারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারেন। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে পাম্প মালিকরা বলেন, সরকার একদিকে বলছে দেশে পর্যাপ্ত তেলের মজুদ আছে, অন্যদিকে আবার রেশনিং করছে। এই দ্বৈত বার্তা সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘বিভ্রান্তি’ বাড়িয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘তেল নাই’ ধরনের গুজব ছড়ানোয় আতঙ্ক আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
সরকার বলছে, দেশে জ্বালানি ও বিদ্যুতের ‘তাৎক্ষণিক’ সংকট নেই এবং আমদানি ও সরবরাহ কার্যক্রম চালু আছে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত মঙ্গলবার বলেন, গত সপ্তাহে পাঁচ দিনে স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ জ্বালানি সরবরাহ করা হলেও আতঙ্ক কমানো যায়নি, আর পাম্পে বড় লাইন মূলত ‘প্যানিক বায়িংয়ের’ ফল।
পাম্প মালিকদের সংগঠন বলছে, মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি রাজধানীর বাইরে ‘আরও খারাপ’। উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং সিলেট অঞ্চলের অনেক পাম্পে নিয়মিত তেল সরবরাহ না হওয়ায় ভোক্তাদের চাপ আরও বেড়েছে এবং পাম্পগুলোতে ‘বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি’ তৈরি হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি কয়েকটি দাবি তুলে ধরেছে।
এর মধ্যে রয়েছে বিপণন কোম্পানি থেকে সরবরাহ বাড়ানো, এজেন্সি, প্যাক পয়েন্ট ও ডিস্ট্রিবিউটর পর্যায়ে সরবরাহ চালু রাখা, মনিটরিংয়ের নামে ‘সোশাল পানিশমেন্ট’ বন্ধ করা, এবং ডিপোগুলোতে বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা।
নাজমুল হক বলেন, সরকার যদি তাদের ‘জানমাল, কর্মচারী ও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা’ নিশ্চিত না করে, তাহলে পাম্প চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
তেমন হলে ব্যবসা বন্ধ রাখার ঘোষণাও দিতে হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেন সংগঠনটির নেতারা।
সাধারণ মানুষকে অহেতুক আতঙ্কিত না হয়ে সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার এবং ট্যাংক পূর্ণ করার প্রতিযোগিতায় না নামার আহ্বান জানানো হয় সংবাদ সম্মেলন থেকে।
সংগঠনটি বলেছে, সবাই যদি একসঙ্গে বাড়তি তেল তুলতে যায়, তাহলে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।