Published : 20 Jan 2026, 12:06 AM
রাজধানীর বাস চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে রঙ বদলের কৌশলে ব্যর্থতার পর এবার ই-টিকেটিং ব্যবস্থায় সব সমস্যার সমাধান খুঁজছে বাস মালিক, শ্রমিক ও পুলিশ।
এই ব্যবস্থা চালুর পরে বাসগুলোর মধ্যে অসম প্রতিযোগিতা ‘দূর হবে’। স্টপেজগুলোতে যাত্রীর অপেক্ষায় জটলা পাকিয়ে বাস দাঁড়িয়ে ‘থাকবে না’, টিকেট হাতে অপেক্ষা করবেন যাত্রীরা- এমন আশাই দেখাচ্ছেন তারা।
পর্যায়ক্রমে ভাঙাচোরা বাসগুলো তুলে নিয়ে ঢাকায় আধুনিক সুবিধা সম্বলিত দৃষ্টিনন্দন বাস নামনোর কথাও বলছেন তারা।
সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে অনুষ্ঠানিকভাবে এই পদ্ধতি উদ্বোধন করা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশ, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন, ঢাকা জেলা সড়ক পরিবহন যানবাহন শ্রমিক ইউনিয়নসহ কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে এই পদ্ধতি বাস্তবায়নের কথা বলা হচ্ছে। আরবানমুভ টেক নামের একটি কোম্পানি এ ব্যবস্থায় কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই পদ্ধতি পুরোদমে চালু করার কথা বলা হয় সংবাদ সম্মেলনে।
তবে ঢাকার ট্রাফিক ও গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়নের দায়িত্ব যেই সংস্থার, সেই ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ বা ডিটিসিএ’র কোনো প্রতিনিধিকে দেখা যায়নি ওই সংবাদ সম্মেলনে। ‘ডিটিসিএকে পাশ কাটিয়ে’ এমন উদ্যোগ নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের শুরুতেই গুচ্ছ পদ্ধতিতে বিভিন্ন রুটভিত্তিক বাসের রঙ পাল্টে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করেছিল সরকার। তবে বছর না ঘুরতেই তা দৃশ্যত ব্যর্থ হয়।
রঙ বদলের এই পদ্ধতি অবশ্য নতুন কিছু নয়। বিগত বছরগুলোতেও কিছু দিন পরপরই এসেছে নতুন নতুন পদ্ধতি। কখনো বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি, কখনো নগর পরিবহন, কখনো কাউন্টারভিত্তিক বাস চলাচল পদ্ধতির ঘটা করে উদ্বোধন দেখেছে নগরবাসী। তবে কয়েকদিন যেতে না যেতেই আবারও পুরনো চেহারায় ফিরেছে বাসগুলো।
ছাল-চামড়া ওঠা লক্কড়-ঝক্কড় বাসগুলো কালো ধোঁয়া ছেড়েও যেন চলতেই চায় না। যাত্রী ধরার অসম প্রতিযোগিতা। পেছনের বাসের পথ আটকাতে গিয়ে জায়গায় জায়গায় রাস্তা আটকে বাস রাখেন চালকেরা। থেমে থেমে পাঁচ মিনিটের পথ চলে আধা ঘণ্টা বা তারও বেশি সময়ে।
তবে এবার ঢাকার পুলিশের সঙ্গে বাস মালিক ও শ্রমিকরা জোট বেঁধে বলছেন এবার পরিবর্তন আসবে। আর সেই পরিবর্তনের ‘জাদুকাঠি’ হিসেবে তারা দেখাচ্ছেন ‘ই-টিকেটিং’।
‘নেই ডিটিসিএ’
বাস রুট র্যাশনালাইজেশন পদ্ধতি বাস্তবায়নের কাজটি করে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)।
এ সংস্থার কাজ হচ্ছে ঢাকার জন্য একটি সংহত ও নিরাপদ ট্র্যাফিক ব্যবস্থা প্রণয়নের জন্য কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং আন্তঃসংস্থা সহযোগিতা সমন্বিত করা। তবে সোমবারের ই-টিকেটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডিটিসিএ’র কোনো প্রতিনিধিই উপস্থিত ছিলেন না।
এ ব্যাপারে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মশিউর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কাজটা তো আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করেই করার কথা। তবে কেন আমাদের ডাকল না, তা তো বলতে পারছি না।”

অনুষ্ঠানে ডিটিসিএ নেই কেন- এ প্রশ্নে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, “আমরা এই উদ্যোগের জন্য সবসময়ই ডিটিসিএর সঙ্গে সমন্বয় করেছি, বিআরটিএর সঙ্গেও আলোচনা করেছি। তবে আজকের প্রোগ্রামটা তারা যেহেতু পারসোনালি স্বল্প পরিসরে করেছে, সেজন্য হয়ত সব সংস্থাকে বলতে পারেনি।”
‘ই-টিকেটিং’ কার্যকর হবে?
‘ই-টিকেটিং’ ব্যবস্থায় ঢাকার আটশর বেশি বাস স্টপেজে সাড়ে ৩ হাজারের বেশি টিকেট মাস্টার থাকবেন। তাদের কাছ থেকে যাত্রীরা টিকেট কিনে বাসে উঠতে পারবেন।
আর যাদের স্মার্টফোন আছে তারা বাসস্টপেজে থাকা অ্যাপের কিউআর কোড স্ক্যান করে অ্যাপ ডাউনলোড করে টিকেট কাটতে পারবেন। পর্যায়ক্রমে এই পদ্ধতিতে যুক্ত করা হবে র্যাপিড পাস, যা দিয়ে মেট্রো রেলের পাশাপাশি বাসের টিকেটও কাটতে পারবেন যাত্রীরা।
সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম পরিবহনের বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তির ‘চাবিকাঠি’ হিসেবে ‘ই-টিকেটিং’ ব্যবস্থাকে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “একটা একেবারে জরাজীর্ণ গাড়ির কাগজ যদি আপনি চেক করেন, দেখবেন যে ওটার বয়স হয়তো পাঁচ বছরও হয়নি। আজকে যে গাড়িটা রাস্তায় নামলো এক মাস পরে ওটার বডিতে ডেন্ট, স্ক্র্যাচ পরে এমন অবস্থা হয় যেন গাড়িটা নিয়ে মারামারি করেছে। কেউ কাউকে মারলে যেমন চেহারা হয় ওরকম।
“এর মূল কারণটা হল ‘অসুস্থ প্রতিযোগিতা’। বাসের কোনো নির্দিষ্ট স্টপেজ নেই, সব জায়গা থেকেই যাত্রী নেয় এবং সে কোনো শৃঙ্খলায় চলে না। যেহেতু সে কারও বেতনভূক্ত কর্মী নয়। এখন বাসগুলো চলছে চুক্তিভিত্তিক হিসেবে। এর মানে হচ্ছে, বাসের মালিক প্রতিদিন একটা জমার ভিত্তিতে গাড়িটা তাকে দিয়েছেন। আর এ কারণে সে সর্বোচ্চ লাভের জন্য কোনো নিয়ম না মেনে, লোড-ওভারলোড, ব্যারিকেড ইত্যাদি করতে গিয়ে গাড়িটার বারোটা বাজিয়ে ফেলে। আবার আমাদের এখনকার সিস্টেমে এক রুটের পারমিট পাওয়া গাড়ি হরদম আরেক রুটে চলছে। ই-টিকেটিং ব্যবস্থা কার্যকর হলে নির্দিষ্ট রুটের গাড়ি সেই রুটেই চলতে পারবে, তখন এসব বিশৃঙ্খলা অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে।”
বাসের রঙ বদলে শৃঙ্খলা ফেরাতে গিয়ে ব্যর্থতা এবং এরপর নতুন পদ্ধতিতে মানুষ কেন আস্থা রাখবে, সেই প্রশ্নে সাইফুল আলম বলেন, “এটার (ই-টিকেটিং) প্রথম শর্ত হল সবাই যদি সমর্থন করে এবং যাত্রীরা যদি স্বতস্ফূর্তভাবে বাস স্টপেজে গিয়ে বাসে ওঠে, ই-টিকেটিংয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে, মালিক ও শ্রমিকরা যদি সহযোগিতা করে তাহলে এগুলো বাস্তবায়ন হবে।
“রঙ পাল্টানো ব্যবস্থায় কিছু রুট ‘ওভারল্যাপিং’ হয়ে গেল এবং দেখা গেল একই রুটে কিছু গাড়ি টিকেট এ চলছে আর কিছু গাড়ি টিকেট ছাড়াই ‘লোকাল’ করে যাচ্ছে। বিআরটিসিসহ এভাবে চলছিল। এর ফলে যারা টিকেটিং ব্যবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছিল তারা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছিলেন। যাত্রীরা তো যেই গাড়ি সামনে পায় সেটাতেই উঠতে চান, এটাই আমাদের অভ্যস্থতা। এক্ষেত্রে আমরা যাত্রীদেরও নতুন অভ্যাস গড়তে চাই। যাতে নির্দিষ্ট স্টপেজে গিয়ে বাসে ওঠেন।”
তার ভাষ্য, “এবার যেখান থেকে যেই যাত্রী গাড়িতে উঠুক না কেন, তাকে টিকেট নিতে হবে। সেই কারণে আমরা এবার বিশ্বাস করি যে এটা কার্যকর হওয়া সম্ভব।”
কেউ টিকেট নিল কিনা তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “প্রথমত গাড়ির কোম্পানি বেইজড টিকেটিং হবে। যেমন কোনো যাত্রী গাজীপুরে যাওয়ার জন্য স্টপেজে এসে বলাকা সার্ভিসের টিকেট নিলে, সেই টিকেট দেখিয়ে বলাকার যেকোনো বাসেই তিনি উঠতে পারবেন।
“এটা একটা সততার বিষয়। আমরা আশা করব যাত্রীরা কেউ টিকেট ছাড়া বাসে উঠবেন না। আর উঠলে পরে ভেতরে কন্ডাক্টরের কাছে টিকেট চেকের একটা ব্যবস্থা থাকবে। রাস্তায় মোবাইল চেকিং থাকবে। এসব কারণে প্রাথমিকভাবে গাড়িতে কিছু লোকসান হতে পারে। এটার জন্য আমরা টিকেট ছাড়া যাত্রীদের চেকিংয়ের ব্যবস্থা রেখেছি।”
ঢাকার বাসগুলোর দরজা খোলা থাকায় যেখানে-সেখানে যাত্রী তোলেন বাসের কর্মীরা। সেটি কীভাবে বন্ধ করবেন- এ প্রশ্নে সাইফুল বলেন, “আর দরজা খোলার বিষয়টা আরটিসিতে (রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট কমিটি) আমরা অলরেডি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে এখন থেকে ‘অটোডোর’ ছাড়া কোনো গাড়ি ফিটনেস পাবে না।
“যেমন এখন আসছে প্রায় আড়াইশ অটোডোর গাড়ি। অটোডোরের সুইচ থাকবে ড্রাইভারের কাছে। শুধু স্টপেজ এলেই ড্রাইভার দরজা খুলে দেবেন। এটা পর্যায়ক্রমে সকল গাড়িতে করার জন্য বলেছি। আরটিসির দুটো মিটিংয়ের পর এই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।”

“পরের ধাপে আমরা দেখব, গাড়িগুলো রুটে চলার মত ফিট আছে। এরপর আমরা মানসম্পন্ন, দৃষ্টিনন্দন গাড়ি আনার পরিকল্পনায় আছি। এখন চলমান গাড়িগুলোকে তখন আমরা ‘ফেইজআউট’ করে নেব অথবা সেগুলোকে ভালো করে মেরামত করতে বলব।”
‘আশার আলো দেখছে’ পুলিশ
সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেওয়া ঢাকা মহানগর পুলিশের কর্মকর্তারা এই পদ্ধতিতে আশার আলো দেখাচ্ছেন।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিসুর রহমান বলেন, “আমাদের সমস্ত কিছুর সমাধান হয়েছে, সামনের পথ একেবারে নির্বিঘ্ন, সেটা আমরা বলি না। তবে আমরা একটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। আমাদের রাস্তা ও গণপরিবহনের যে অবস্থা…একটি দেশ কতটা সুন্দর, কতটা পরিপাটি, তার একটি ‘ইন্ডিকেটর’ হচ্ছে গণপরিবহন। আমরা সেরকম একটা স্বপ্ন দেখি, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম স্বপ্ন দেখে।
সংবাদ সম্মেলনের প্রধান অতিথি ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) সারওয়ার হোসেন বলেন, “এই টিকেট সিস্টেম সচল রাখার জন্য ডিএমপিসহ সরকারি সংস্থাগুলো কাাজ করবে। আন্তঃজেলা সকল বাস কিন্তু টিকেট সিস্টেমে চলে। এর একটা আধুনিক ভার্সন হচ্ছে ইটিকেট। বিশ্বের সব দেশেই এই টিকেট সিস্টেম রয়েছে। আমাদের হয়ত এখন ক্যাশলেস পদ্ধতি পুরোপুরি থাকবে না। তবে অচিরেই সরকারের যে র্যাপিড পাস রয়েছে, সেটা দিয়ে এই পদ্ধতিতে টিকেট কাটা যাবে।
“এই পদ্ধতিতে যাত্রীরা টিকেট কেটে বাসের জন্য অপেক্ষা করবেন। এক স্টপেজে অনেকগুলো বাস দাঁড়িয়ে থাকবে না। তাদের মধ্যে যে অসম প্রতিযোগিতা ছিল ই টিকেটেং ব্যবস্থার ফলে সেটা আর থাকবে না। যাত্রীরা টিকেট হাতে বাস এলে বাসে উঠবেন, যাত্রী উঠে গেলে বাস ছেড়ে দেবে।”
বাসের যাত্রী বাড়লে শহরে অন্যান্য ছোট যানবাহন কমবে। এর ফলে যানজট কমবে। পাশাপাশি বাস সুশৃঙ্খলভাবে চলবে বলেও আশা করছেন অতিরিক্ত কমিশনার সারওয়ার হোসেন।
“বিআরটিসির বাসও টিকেট সিস্টেমে চলবে বলে কথা হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে বাস রুট র্যাশনালাইজেশন কার্যক্রম চলবে। এই কার্যক্রমের প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে টিকেট সিস্টেমে বাস চালানো। টিকেট সিস্টেম কার্যকর হলে বাস রুট র্যাশনালাইজেশন পদ্ধতি বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হবে,” বলেন তিনি।