Published : 05 Jul 2025, 06:21 PM
বর্তমান পুলিশ বাহিনী দিয়ে দেশে ‘অবাধ ও নিরপেক্ষ’ নির্বাচন সম্ভব কিনা, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন 'আমার দেশ' পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক মাহমুদুর রহমান।
তার ভাষ্য, জুলাই অভ্যুত্থানের আগের বাংলাদেশে পুলিশ একটা 'দানবীয় ফোর্স' ছিল, অভ্যুত্থানের পর আজকের পুলিশ বাহিনী 'ডিমোরালাইসড', এটা হচ্ছে বাস্তবতা।
শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে 'বাংলাদেশ অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতির' আয়োজনে 'বাংলাদেশ পুলিশ সংস্কার প্রেক্ষিত নাগরিক ভাবনা' শিরোনামে গোলটেবিলে তিনি এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
মাহমুদুর রহমান মনে করেন, ফ্যাসিবাদ যেন ফিরে না আসে, সেজন্য প্রথমে গণতন্ত্রে উত্তরণ করতে হবে।
“উত্তরণের রাস্তাটা কী— একটা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন যদি করতে হয়, আমি কি পুলিশ ছাড়া করতে পারব— সেটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ।”
সস্প্রতি পটিয়া থানা ঘেরাও করে ওসিকে সরাতে বাধ্য করা এবং পাটগ্রাম থানা থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এরকম যদি ঘটতে থাকে, আমি এই ডিমোরালাইজড পুলিশ দিয়ে কীভাবে একটা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করব?”
তিনি বলেন, “বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পুলিশের হারিয়ে যাওয়া মোরালটা ফিরিয়ে আনা। আর কোনো রিফর্ম আপনারা এ সরকারের কাছে আশা করবেন না। সময় নাই, শেষ হয়ে গেছে। একমাত্র টার্গেট পুলিশের মোরালটাকে ফিরিয়ে আনা।”
থানা আক্রমণ করে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার চেয়ে বড় অপরাধ হতে পারে না মন্তব্য করে এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বলেন, “এরকম একটা পুলিশ দিয়ে আমি শঙ্কিত, আসলেই কি একটা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারব!”
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক ও এর ফল নিয়েও সন্দিহান মাহমুদুর রহমান।
তিনি বলেন, “কমিশন প্রতিদিন মিটিং করছেন; আসলে জানি না এটার রেজাল্ট কী হবে। অন্তত এটা তো চাই আমরা, আপনারা একটা নির্বাচনের মতো পরিস্থিতি তৈরি করেন। আর সেটা তৈরি করতে হলে পুলিশের মনোবল অবশ্যই ফিরিয়ে আনতে হবে।”
তার মতে, নির্বাচন নিয়ে আলোচনা এখনই শুরু করা উচিৎ।
“রাজনৈতিক দলগুলো বিশৃঙ্খলা করলে গণতন্ত্র উত্তরণ সম্ভব না। আর সেটা না হলে বাংলাদেশের কী পরিণতি হবে, আশঙ্কা বোধ করি।”
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে দেশে ১২৪টি মামলা করা হয়। একটি মামলায় মাহমুদুর রহমান ও তার স্ত্রীকে ৭ বছর কারাদণ্ড দেয় আদালত।
প্রথম দফায় ২০১০ সালের জুন মাসে এবং দ্বিতীয় দফায় ২০১৩ সালের এপ্রিলে তাকে গ্রেপ্তার পুলিশ। তার সম্পাদিত আমার দেশ পত্রিকাও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
গণঅভ্যুত্থানের পর মাহমুদুর রহমান দেশে ফেরেন এবং আদালত থেকে মামলায় অব্যাহতি দেওয়া হয়।
২০১০ সালে গ্রেপ্তারের পর নিজের ৩৯ দিন রিমান্ডের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “রিমান্ডে থাকা অবস্থায় বেশির ভাগ সময় ডিবিতে ছিলাম। তখন যে কজন এসি, যাদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল, তারা প্রত্যেকেই ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন।“
বর্তমান পুলিশের ভাবমূর্তির সংকটের জন্য 'সিস্টেম দায়ী' মন্তব্য করে তিনি বলেন, “পুলিশের চেইন অব কমান্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, হাসিনা অনেক ক্ষেত্রে ডিরেক্টলি পুলিশ চালাতেন। ডেসট্রয় করা হয়েছিল পুরা সিস্টেম।“
রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই পুলিশের এতটা অধঃপতন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মাহমুদুর রহমান বলেন, “পুলিশের সংস্কার মিনিংফুল করতে হলে প্রথমেই চ্যালেঞ্জটা নিতে হবে কীভাবে পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হয়। এটা বাদ দিয়ে কোনো সংস্কারেই লাভ নাই।”
র্যাবে সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়োগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “র্যাবে একটা মৌলিক দুর্বলতা আছে। সেখানে সামরিক কর্মকর্তা ঢুকানো একটা ভুল সিদ্ধান্ত। এর ফলে দুটা বাহিনীর সর্বনাশ করেছেন আপনারা। আপনারা পুলিশেরও সর্বনাশ করেছেন, সামরিক বাহিনীরও সর্বনাশ করেছেন।
“সামরিক বাহিনী র্যাবে ঢুকে করাপটেড হয়েছে, র্যাবে ঢুকে তারা ক্রিমিনাল হয়েছে। এর ফলে সামরিক বাহিনীরও রাজনীতিকীকরণ হয়েছে। পুলিশের মধ্যে সামরিক বাহিনী নিয়ে আসা একটা ‘রং কনসেপ্ট’।”
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আপনাদের হাতে সাত মাস সময় আছে। অন্তত একটা কাজ করে যান, এই র্যাব থেকে সামরিক কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার করে নিন। এই সংস্কারটুকু যদি করে যেতে পারেন, তাহলে আপনাদের দেশবাসী মনে রাখবে।
“আমার এলিট ফোর্স লাগবে পুলিশে, কিন্তু এলিট ফোর্স মাস্ট বি কম্পোজড বাই পুলিশ ইটসেলফ। তাদের ট্রেনিংয়ের জন্য সেনাবাহিনীতে পাঠান। কিন্তু সামরিক বাহিনী ঢুকিয়ে দুটি প্রতিষ্ঠানের সর্বনাশ করবেন না।”
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, “পুলিশের মধ্যে ব্রাহ্মণ রিক্রুট করার জন্য বিসিএস আছে। নমশূদ্র, অচ্ছুত ও নিন্মবর্নের লোকদের নিয়োগ করার জন্য কনস্টেবল, এসআই, ইনসপেক্টর আছে। আলাদা রুট আছে। অথচ ইংল্যান্ডে, যাদের আইন দিয়ে আমাদের পুলিশ চলে, তাদের রিক্রুটের জন্য তো আলাদা রুট নাই।
“আজ সব অফিসারদের নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সেই সংখ্যাটা কত, ছয় হাজারের কিছু বেশি। দুই লাখ ফোর্সের কোনো রিপ্রেজেন্টেশন নাই, যারা কনস্টেবল, যারা ইন্সপেক্টর, এসআই। এখানেও ব্রাহ্মণদের জন্য ব্রাহ্মণদের স্বার্থে ব্রাহ্মণরা এসে আলোচনা করতেছে ফিউচারে ব্রাহ্মণদের কীভাবে প্রফেশনাল করা যায়। দুই লাখের রিপ্রেজেন্টেশন নাই কেন?”
অবসর প্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর বলেন, “সেনাবাহিনী ক্ষণিকের জন্য পুলিশের দায়িত্ব পালন করতে পারে। কিন্তু কোনোমতেই আর্মি সেটা রিপ্লেস করতে পারে না। পুলিশের কাজটা পুলিশকেই করতে হবে।
“সেনাবহিনী সিভিলিয়ান পাওয়ারে রিপ্লেস হচ্ছে মানে এটা পুলিশের ব্যর্থতা। এটা কখনোই কোনো দেশের জন্য, কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য সুসংবাদ নয়।”
একজন আইজিপির আওতায় পুলিশ বৃহত্তর বাহিনী উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি মনে করি কমান্ড স্ট্রাকচারটাকে রিস্ট্রাকচার করা উচিৎ। প্রয়োজন বিশেষে ডিউটি বিবেচনা করে একাধিক আইজিপি মনে হয় এখন সময়ের ব্যপার।
বিচারপতি ফরিদ আহমেদ বলেন, “এ দেশে পুলিশের ও আমলার সফলতার কোনো শেষ নাই। কিন্তু তাদের বিফলতা অনেক। তারা বছরের পর বছর সফলতা দেখাইছে, কিন্তু গত ১৭ বছর তাদের ভূমিকা ছিল একদলীয়।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসান বলেন, “পুলিশ সংস্কারের আলোচনা খুব বিলম্বিত। পুলিশ বিভাগ স্বয়ং সংস্কারটি চায়, সেখানে এক্যমত্য কমিশনের সুপারিশে বিষটি যায়নি। যতদূর জানি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এসেছে বাধাটা।
“ঐক্যমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে যে প্রস্তাবগুলো পাঠিয়েছে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো কি এড্রেস করা হয়েছে, যেখানে পুলিশ বাদ যাচ্ছে। তাহলে এ আলোচনার মানে কি অল আর অ্যারেঞ্জড শো।”
তার ভাষ্য, “সারাক্ষণ গল্প আর গোলটেবিল দিয়ে কিছু হবে না। এ জাতি ধ্বংস হয়েছে বৈঠকের কারণে।”
সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা বলেন, “পুলিশ সংস্কার কমিশন নিয়ে মানুষের যে আগ্রহ ও কৌতুহল ছিল, তার বাস্তবায়ন তো অনেক দূরের কথা। সেখানে কি হচ্ছে এটাই আমরা জানতে পারছি না।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান বলেন, “আমি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আইন পরিবর্তনের সুপারিশ করি না। বিদ্যমান যে আইনগুলো আছে, সেসবের সঠিক প্রয়োগ করে ইমপ্রোভমেন্টের দিকে যাওয়া প্রয়োজন। তবে পুলিশের ক্ষেত্রে আবার আমি আইন পরিবর্তনের কথা বলি।
“একটা অদ্ভুত কারণে পুলিশ আইনে পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল (পিআরবি) রয়ে গেছে। দেশের কোনো আইনের সঙ্গে বেঙ্গল শব্দটি নাই। কিন্তু পুলিশের ক্ষেত্রে বেঙ্গলটা রেখেছি গর্ব ভরে। সেখানে অনেক সংশোধন এসেছে, কিন্তু ওনারা বেঙ্গল শব্দটি রেখে দিয়েছে, কারণ সাকসেস সরকার ঔপনেবেশিক মনোভাবটা রাখতে চান “
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন সাবেক ডিআইজি ড. মো মতিয়ার রহমান। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সাবেক ডিআইজি ড. এম আকবর আলী, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির তথ্য সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব এসএম জহিরুল ইসলাম।