Published : 18 Dec 2025, 03:58 PM
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে এবার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হবে ৫ দিনের জন্য।
১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের তারিখ রেখে ইতোমধ্যে তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ভোটের আগে ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ভোটের পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাঠে থাকবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
বৃহস্পতিবার নির্বাচনের ‘আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিশেষ পরিপত্রে’ এই পরিকল্পনা জানানো হয়।
সেখানে বলা হয়, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা দল ছাড়া সকল বাহিনী ভোটের সময় ৫ দিন (নির্বাচন আগে ৩ দিন, নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিন এবং নির্বাচন পরবর্তী এক দিন) মোতায়েন থাকবে।
আনসারদের জন্য এ সময় হবে ৬ দিন (নির্বাচন আগে ৪ দিন, নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিন এবং নির্বাচন পরবর্তী এক দিন)।
অর্থাৎ, ভোটের চারদিন আগে নামবে আনসার-ভিডিপি। আর ভোটের তিনদিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে কেন্দ্রভিত্তিক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োজিত হবে।
এই সময়ের মধ্যে মোতায়েনের জন্য কমিশন প্রচলিত নিয়মে বাজেট বরাদ্দ করবে বলে পরিপত্রে জানানো হয়।
ভোটের নিরাপত্তায় কত সদস্য
>> এবারের নির্বাচনে ভোটার রয়েছেন পৌনে ১৩ কোটি। ৩০০ আসনে প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রে দুই লাখ ৬০ হাজারের মত ভোটকক্ষ থাকবে।
>> প্রাথমিক সভায় প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৩ থেকে ১৮ জন সদস্য রাখার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।
>> আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৭ লাখের বেশি সদস্য এবার ভোটের নিরাপত্তায় দায়িত্বে পালন করবেন। ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে আনসার-ভিডিপি সদস্যদের সংখ্যাই হবে সাড়ে ৫ লাখের মত। সশস্ত্রবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ৯০ হাজারের বেশি। এছাড়া পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড থাকবে।
বাহিনীগুলো মোতায়েন যেভাবে
>> সময়কাল: তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন পরবর্তী ৭ দিন স্বাভাবিক (বর্তমানে চলমান) মোতায়েন থাকবে।
>> নির্বাচনকালীন মোতায়েন: আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা দল ছাড়া সকল বাহিনী ভোটের আগে ৩ দিন, ভোটের দিন এবং ভোটের পরদিন মোতায়েন থাকবে। আনসারদের জন্য এই সময় হবে ভোটের আগে ৪ দিন, ভোটের দিন এবং ভোটের পরদিন।
>> স্থায়ী মোতায়েন: কেন্দ্রভিত্তিক স্থায়ী মোতায়েন হবে কেবল ভোট ঘিরে পাঁচ দিনের জন্য। এছাড়া তফসিল ঘোষণার পর থেকে পুরো সময়ের জন্য কিছু স্থায়ী বা অস্থায়ী চেক পোস্ট থাকবে।
>> মোবাইল মোতায়েন: তফসিল ঘোষণার পর থেকে সম্পূর্ণ সময়ের জন্য টহল বা আভিযানিক দল মোতায়েন করা হবে। পাশাপাশি থাকবে স্ট্রাইকিং ফোর্স। এছাড়া এলাকা ভিত্তিক সংরক্ষিত ফোর্স রাখা হবে।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগ্রহী প্রার্থীরা ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর প্রতীক বরাদ্দ হবে। প্রার্থীরা ২২ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত প্রচার চালাতে পারবেন।
ভোট সামনে রেখে আচরণবিধি প্রতিপালনে মাঠে রয়েছেন নির্বাহী হাকিমরা। নির্বাচন পূর্ব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে তিনশ বিচারিক তদন্ত কমিটি কাজ করছে।
১১ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভোটের তফসিল ঘোষণা করেন। পরদিন সম্ভাব্য একজন প্রার্থী গুলিবিদ্ধ হন।
এরপর দুটো নির্বাচনী অফিসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সার্বিক পরিস্থিতিতে সিইসি, ইসি, সচিবসহ রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিস, নির্বাচন অফিসে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়।
তফসিল ঘোষণার আগে দুই দফা এবং তফসিলের পর বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করে ইসি। এরপরই ‘আইন শৃঙ্খলা বিষয়ক এ বিশেষ পরিপত্র’ জারি হল।
বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য আগে থেকেই সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন রয়েছে, যা নির্বাচনের সময়ও অব্যাহত থাকবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সশস্ত্র বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
১৩ বিষয়ে গুরুত্ব
সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের এ পরিপত্র পাঠানো হয়েছে। সেখানে ১৩টি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে বলেছে ইসি।
>> সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিক রাখা।
>> সকল দল ও প্রার্থী যাতে নির্বিঘ্নে নিয়মানুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে, তা নিশ্চিত করা।
>> ভোটাররা যাতে নিঃশঙ্কচিত্তে ও স্বস্তির সাথে ভোট দিতে পারেন তা নিশ্চিত করা।
>> ভোট কেন্দ্র ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রসহ সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ও অফিসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
>> নির্বাচনী সামগ্রী ও ব্যালটের (পোস্টাল ব্যালটসহ) নিরবচ্ছিন্ন পরিবহন ও সংরক্ষণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
>> গুজব ও অপতথ্যের বিস্তার রোধ এবং প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা।
>> জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ-গোত্র নির্বিশেষে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
>> পঙ্গু, আহত, বয়স্ক, অসুস্থ ও সন্তানসম্ভবাদের জন্য চলাচল ও ভোটাধিকার প্রয়োগে সহনীয় সুযোগ ও পরিবেশ তৈরি করা।
>> নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
>> ইলেকটোরাল এনকোয়ারি ও অ্যাডজুডিকেশন কমিটি, বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সার্ভেইলেন্স কমিটি, মনিটরিং কমিটি এবং আইন-শৃংখলা কমিটিসহ মাঠ পর্যায়ে কর্মরত সকল কমিটির কর্মকর্তার কাজে সহায়তা করা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
>> দল ও প্রার্থীদের আচরণ বিধিমালা প্রতিপালনে প্রয়োজনীয় অনুশাসন প্রতিপালন নিশ্চিত করা।
>> গণভোটসহ নির্বাচনের বিভিন্ন বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে গৃহীত কার্যক্রমে যথাযথ নিরাপত্তা সহায়তা করা।
>> নির্বাচনি সামগ্রী ও ব্যালট (পোস্টাল ব্যালটসহ) গ্রহণ করার পর থেকে নির্বাচনি ফলাফল রিটার্নিং অফিসার/সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছে হস্তান্তর করা পর্যন্ত কেন্দ্রভিত্তিক নিয়োজিত পুলিশ/আনসার-ভিডিপি কর্তৃক প্রিজাইডিং/পোলিং অফিসাররদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসীদের ধরতে বিশেষ অভিযান
নির্বাচন কমিশন বলছে, আচরণবিধি অনুযায়ী নির্বাচন পূর্ব সময় এবং নির্বাচন পরবর্তী সময় আইন শৃংখলা রক্ষায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘লিড মন্ত্রণালয়’ হিসেবে বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রণয়ন, সমন্বয় ও তদারকি করবে।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার রোধ, নির্বাচনে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী যে কোনো কর্মকাণ্ড/ প্রবণতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড রোধে কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনে স্থাপিত সমন্বয় সেল নিয়মিত সমন্বয় ও যোগাযোগ রক্ষা করবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, বাহিনী ও সংস্থার মাঝে সার্বক্ষণিক আন্তঃসমন্বয় রক্ষা করা হবে।
>> বাহিনীগুলো চেইন অব কমান্ড সমুন্নত রেখে মাঠ পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে আন্তঃবাহিনী সমন্বয় সাধন করবে।
>> বিভিন্ন প্রশাসনিক পর্যায়ে (বিভাগ/জেলা/উপজেলা/নির্বাচনী আসন) আইন-শৃঙ্খলা কমিটি এবং বাহিনীগুলোর সমন্বয় সেল এর মাধ্যমে মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয়তা নিরুপণ, সমন্বয় ও কার্যপরিধি বিন্যাস করবে।
>> মাঠ পর্যায়ে রিটার্নিং অফিসার এবং তার অধীনস্ত সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও প্রিজাইডিং অফিসারদের প্রয়োজন অনুযায়ী অগ্রগণ্যতার ভিত্তিতে সহায়তা করতে হবে।
>> সংবেদনশীলতা, ভৌগলিক অবস্থান এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় কেন্দ্রে বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে কার্যকরী আইন শৃঙ্খলাবাহিনী মোতায়েন নিশ্চিত করতে হবে।
>> ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
>> সম্ভাব্যতা অনুযায়ী কেন্দ্রে সিসিটিভি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। মাঠে ব্যবহৃত বডি ওর্ন ক্যামেরার একটি লাইভ ফিড নির্বাচন কমিশন সমন্বয় সেলে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে।
ইসির আইন-শৃঙ্খলা ও অপতথ্য মনিটরিং সেল
নির্বাচন কমিশন, মন্ত্রণালয়, বিভাগ, বিটিআরসি ও সকল বাহিনী/সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে এই সেল গঠিত হবে।
প্রাথমিকভাবে এই সেলের আকার হবে সীমিত, যা ভোটের সময় ৭ দিনের জন্য “নির্বাচনের আগে ৪ দিন, ভোটের দিন ও ভোটের পরের ২ দিন) পূর্ণাঙ্গরূপে কাজ করবে।
>> সংশ্লিষ্ট কমিশন, মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সকল বাহিনী/সংস্থা থেকে একজন যোগ্য প্রতিনিধি ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে নির্বাচন কমিশনের সমন্বয় সেলের সাথে সমন্বয় করবেন।
>> অপতথ্যের প্রভাব ও এর বিস্তার রোধে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সম্পন্ন বাহিনী/সংস্থাগুলো নির্বাচন কমিশনে তথ্য ও প্রযুক্তি সহায়তা করবে।
পুরনো খবার
ভোটের মাঠে ৮ দিন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী রাখার প্রস্তাব
আইনশৃঙ্খলার ছক চূড়ান্ত, তফসিলের পর থেকেই কঠোর ভূমিকা চায় ইসি
সংসদ নির্বাচন: অঞ্চলভেদে থাকবে কমান্ডো বাহিনী, কঠোর বার্তা ইসির