Published : 23 Dec 2025, 04:35 PM
নির্বাচন সুষ্ঠু করতে মাঠ প্রশাসন ও পুলিশের আশ্বাসে ‘বুকের জোর’ বেড়ে যাওয়ার কথা বললেন
আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটে রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ মাঠ প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন।
তিনি বলেছেন, “কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব নিয়ে কাজ করবেন না; পেশাদারত্বের সাথে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে। আজকে খুব অসম্ভব রকমভাবে আমার বুকের জোর বেড়েছে আপনাদের কথাবর্তা শুনে।”
মঙ্গলবার নির্বাচন ভবনে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে মত বিনিময় ও ব্রিফিংয়ে একগুচ্ছ নির্দেশনা দেন সিইসি।
চার নির্বাচন কমিশনার, ইসি সচিব, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সচিব ও বিভাগের প্রতিনিধি, আইজিপি, বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, পুলিশ কমিশমনার, রিটার্নিং অফিসার ও জেলাপ্রশাসক, এসপি, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচন ভবনে সকালে এ মত বিনিময় সভা শুরু হয়, বেলা ২টার পরে সমাপনী বক্তব্য দেন সিইসি।
সকালে স্বাগত বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, মাঠ কর্মকর্তারা ভালো কাজ না করলে ইসির ‘ঘুম হারাম’ হবে।
কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা মত বিনিময় করে ‘আশ্বস্ত’ হওয়ার কথা জানিয়ে সমাপনী ভাষণে তিনি ‘বুকের জোর’ বেড়ে যাওয়ার কথা বললেন।
নাসির উদ্দিন বলেন, “আপনারা আমাকে আশ্বস্ত করেছেন। আমি আশ্বস্ত হয়ে ফিরে যাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ, যে উদ্দেশ্যে আজকে এখানে একত হয়েছি, সে উদ্দেশ্য আমরা ডেলিভার করতে পারব।”
৬৪ জন জেলা প্রশাসক, ৬৪ জন এসপি। আটজন বিভাগীয় কমিশনার, আট জন ডিআইজি, ৬৪ জন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, ১০ জন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মিলিয়ে মোট ২২৬ জন এদিন সভায় অংশ নেন।
দুই ভিভিআইপি
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে ইতোমধ্যে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে ইসি বৈঠক করেছে। মঙ্গলবার মাঠ প্রশাসন ও পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও আলোচনা হল।
মত বিনিময়ের সমাপনী ভাষণে সিইসি বলেন, “দুজন ব্যক্তি আমাদের কাছে ভিভিআইপি; যদি কোনো আইন থাকত, আমি ভিভিআইপি ঘোষণা করতাম এই মুহূর্তে। একজন রিটার্নিং অফিসার, আরেকজন প্রিজাইডিং অফিসার।”
ইসির সব সার্কুলার, পরিচালনা বিধিসহ সব আইন-বিধি, নির্দেশনা রিটার্নিং অফিসারকে ভালোভাবে পড়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রিজাইডিং অফিসারদের ‘গাইড করার’ নির্দেশনা দেন তিনি।
আচরণবিধি প্রতিপালন, জরিমানা ও প্রতিটি ‘অ্যাকশন’ এর বিষয়ে সচনেতা বাড়াতে গণমাধ্যমের সঙ্গে ভালো সমন্বয় করে ব্যাপক প্রচার চালানোর ওপর জোর দেন সিইসি।
সোশাল মিডিয়ায় সবাই যে এখন সক্রিয়, সে বিষয়টি তুলে ধরে যে কোনো ধরনের অপতথ্য, মিথ্যা তথ্য ও গুজব রোধের পাশাপাশি ভালো উদ্যোগের প্রচারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সবার সহযোগিতা চান তিনি।
সিইসি বলেন, “ঢাকা পোস্টারে ছেয়ে গেছে, এটা দেখা যাচ্ছে। আপনারা যে সরাচ্ছেন, রিমুভ করছেন-সেটার কোনো খবর নেই। প্রতিটি অ্যাকশন, প্লিজ গিভ পাবলিসিটি। আপনার অফিসে এত লোক আছে, সবাই তো সারারাত বসে ফেইসবুক ঘাটাঘাটি করে। ফ্যামিলি মেম্বারকে বলে দিন– ‘এটা দিয়ে দাও’।
“আপনি ছেলেকে বলেন, আপনার মেয়েকে বলেন। আপনার বাসায় যারা আছে কাজের মেয়ে পর্যন্ত ফেইসবুক চালায় আজকাল। সুতরাং আপনারা যে কাজটা করছেন, এটা পাবলিশ করতে হবে।”
অভিযোগ পেলে তার সুরাহা করতে রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারকে তৎপরত হওয়ার তাগিদ দেন নাসির উদ্দিন।
ভোটের মৌসুমে কারো কোনো অভিযোগ থাকলে তা রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার কিংবা নির্বাচনি তদন্ত কমিটির কাছে জানানোর নিয়ম। কিন্তু তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ আসা শুরু করেছে বলে জানান সিইসি।
তিনি বলেন, “প্রতিনিয়ত কমপ্লেইন আমাদের এখানে চলে আসছে। মানুষ জানে না যে কমপ্লেইনটা রিটার্নিং অফিসারের কাছে করতে হয়। ইলেকশন কমিশন বিকাম কমপ্লেইন লজিং সেন্টার।… কেউ যদি ভায়োলেশন করে, কোনো ক্যান্ডিডেট যদি সমস্যা করে, কোথায় কমপ্লেইন করবে– কার কাছে করবে? তাকে জানাতে হবে? মানুষকে জানতে হবে।”
সেজন্য রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের অফিসের সামনে নাম ও ফোন নম্বর ‘দৃষ্টিগোচর হয়’ এমন রাখার ব্যবস্থা করতে বলেন সিইসি।
তিনি বলেন, “কারো অভিযোগ থাকলে, আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ থাকলে, কোনো প্রতিদ্বন্দী প্রার্থী যদি হ্যারাস করে, দয়া করে এই নম্বরে অমুকের কাছে কমপ্লেইন করবেন–এটা আপনার অফিসের সামনে ঝুলিয়ে দিতে হবে।”
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও নির্বিঘ্ন পরিবেশে জোর
সম্প্রতি ময়মনসিংহে একজনকে পুড়িয়ে মারা ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের নির্দেশনা দেন সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন।
প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “কমিউনাল হারমনি মাস্ট বি মেনটেইন। এটা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের মধ্যে রাখতে হবে। আর বয়স্ক, ফিজিক্যালি ডিজঅ্যাবল যারা আছেন, তারা যেন কেন্দ্রে এসে ভোট দিতে পারেস এই ব্যবস্থাটা করতে হবে ।”
ভোটের সময় সংখ্যালঘুরা যাতে নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে সিইসি বলেন, “দুর্গাপূজা ও ইলেকশনে তাদের ভয়ের কথা বলেছে। মাইনরিটি কমিউনিটির নেতারা বলেছেন, দুর্গাপূজা এলে তাদের ওপরে আক্রমণ হয়, মূর্তি ভাঙ্গা হয়; তবে এবারের মত সুন্দর করে পূজা উদযাপন আমরা জীবনে করতে পারি নাই। আমি বলেছি, ইলেকশনও ইনশাল্লাহ এরকম হবে।”
প্রশাসন ও পুলিশকে ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন সিইসি।
তিনি বলেন, “মাইনরিটি কমিউনিটির যারা ভোট দিতে আসতে চান, তারা যাতে সেইফলি আসতে পারে; শান্তিপূর্ণভাবে আসতে পারে, ভোটটা দিতে পারে; দিয়ে বাড়ি পর্যন্ত যেতে পারে এবং শান্তিতে ঘুমাতে পারে, সে ব্যবস্থা আপনাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে। এটা ভেরি ইম্পর্টেন্ট।”
যা বললেন চার নির্বাচন কমিশনার
আওয়ামী লীগ আমলের ধারা থেকে বের হওয়ার আহ্বান জানিয়ে নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমদ সভায় বলেন, “গোটা জাতি ভারাক্রান্ত। আমরা এই অস্বাভাবিক নির্বাচন থেকে বের হতে চাই। আমরা এখন একটা স্বাভাবিক নির্বাচন চাই। এই স্বাভাবিক নির্বাচনটা করতে হলে ডিসি-এসপিদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।“
একটি স্বাভাবিক নির্বাচন করতে কী লাগবে, সেটা আইনেই বলা আছে মন্তব্য করে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, “আর কিছু লাগবে না। এই নির্বাচনটা যদি আমরা ভালো করে করতে না পারি, তাহলে আমাদের অস্তিত্ব থাকবে না।”
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, “২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি যেই নির্বাচনটি হবে, সেটি করতে যদি আমরা ব্যর্থ হই, তাহলে বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়ে যাবে। আমাদের তফসিল ঘোষণার পর থেকে একটি ঘটনা বাদে বাকি যতগুলো নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে, প্রতিটি কার্যক্রম আইনসঙ্গতভাবে এবং খুব সাহসের সঙ্গে হয়েছে।”
তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত আশাবাদী যে, ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সুতরাং সমন্বয়হীনতার কোনো সুযোগ নেই।
“সামান্যতম ত্রুটি বিচ্যুতি যদি নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টিগোচর হয়, সেটি কিন্তু আমরা স্বাভাবিক এবং সহজভাবে নেব না। সুতরাং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রতি আমার আকুল আবেদন, আপনারা মাঠে নেমে পড়ুন। বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্নে এই নির্বাচন ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হতেই হবে।”
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ আইন-বিধি ও দায়িত্ব নিয়ে সার্বিক বিষয় তুলে ধরেন কর্মকর্তাদের সামনে।
তিনি বলেন, “স্বাধীনভাবে অবশ্যই কাজ করতে পারবেন। আপনারা সবাই এখন নির্বাচন কমিশন। যার যার কাজ আইনে বলে দেওয়া হয়েছে। আমরা যদি আইনের প্রতি সীমাবদ্ধ থাকি, তাহলে আমাদের কোঅর্ডিনেশন হয়ে যাবে।”
আগামী নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছ করার জন্য সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি নির্বাচনি অপরাধ বা সহিংসতার ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।
তিনি বলেন, “তাৎক্ষণিকভাবে যদি আপনি সাত দিনের একটা ডিটেনশন দিতে পারেন, এটার যে ইমপ্যাক্ট হবে, ইলেকশন হয়ে যাওয়ার পরে সাত বছরের জেল হলেও ওই ইমপ্যাক্ট হবে না। ইমপ্যাক্টটা তাৎক্ষণিক হতে হবে। সেনাবাহিনী পূর্ণমাত্রায় মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।”
এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, বর্তমানে সেনাবাহিনীর এক-তৃতীয়াংশ মোতায়েন আছে, দ্রুত সেই সংখ্যা এক লাখে উন্নীত করা হবে।
“বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটি সক্রিয় থাকবে। কোনো বাহিনী অন্য বাহিনীর কমান্ড নেবে না, বরং সমন্বয় সেলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ হবে যাতে কোথাও বিশৃঙ্খলা না দেখা দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি জনগণের কাছে দৃশ্যমান হতে হবে।”
অন্যদের মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) জাহেদা পারভীন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন।