Published : 04 Jan 2026, 09:22 PM
এনইআইআর প্রশ্নে সরকার ‘পিছু হটবে না’ বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব।
এ পদ্ধতির বিরোধিতা করে আসা মোবাইল ব্যবসায়ীদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বিটিআরসি ভবন পরিদর্শনে গিয়ে রোববার তিনি সরকারের এই অবস্থান তুলে ধরেন।
এনইআইআর নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রাহকদের মনে যে প্রশ্ন ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা অচিরেই কেটে যাবে বলে আশ্বস্ত করেন তৈয়্যব। আন্দোলনরত ব্যবসায়ীরা ‘অপরাধের লাইসেন্স’ চান কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন।
গত ১ জানুয়ারি থেকে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্ট্রার বা এনইআইআর পদ্ধতি কার্যকর করেছে সরকার। সেদিনই মোবাইল হ্যান্ডসেটের ‘গ্রে মার্কেটের’ ব্যবসায়ীরা বিটিআরসি কার্যালয় হামলা চালায়। ওই ঘটনায় ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যবসায়ীদের মুক্তি, এনইআইআর স্থগিতকরণ, পুরনো ফোন আমদানির সুযোগ দেওয়াসহ কয়েকটি দাবিতে রোববার সকালেও কারওয়ানবাজারের সোনারগাঁ ক্রসিং অবরোধ করেন বসুন্ধরা শপি কমপ্লেক্স, মোতালেব প্লাজাসহ কয়েকটি মার্কেটের মোবাইল ব্যবসায়ীরা।
সেখানে পুলিশের সঙ্গে তাদের দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে। সংঘর্ষ ছড়ায় পান্থপথ, হাতিরপুল এলাকাতেও।
পুলিশ লাঠিপেটা করে, কাঁদুনে গ্যান ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়। কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে প্রিজন ভ্যানে তুলে নিতেও দেখা যায়।
মোবাইল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যখন থেমে থেমে পুলিশের সংঘর্ষ চলছিল, সে সময় বিটিআরসি ভবনে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন ফয়েজ তৈয়্যব।
আন্দোলনরত ব্যবসায়ীদের ‘সব দাবিই’ মেনে নেওয়া হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এরপরেও যদি এই দুর্বৃত্তয়নের চক্রটা অব্যাহত থাকে, আমাদের ভবন ভাঙচুর হয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে জোরপূর্বক দোকান বন্ধ রাখে এবং আমাদের চৌরাস্তাগুলোকে ব্লকেড দিয়ে রাখে, তাহলে বুঝতে হবে যে অপরাধের লাইসেন্স চায় তারা।
“আমরা নিশ্চিতভাবে অপরাধ এবং জালিয়তি এবং প্রতারণার চক্রটাকে সচল রাখতে তাদের এই কর্মকাণ্ডগুলোকে এভাবে চালিয়ে দিতে পারি না। বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে এবং এজন্য যা যা করা দরকার আমরা সবকিছুই করব।”
তৈয়্যব বলেন, “এনইআইআর বাস্তবায়নের মাধ্যমে নাগরিকদের সিম এবং অনিবন্ধিত ডিভাইস কেন্দ্রিক অপরাধ, আর্থিক প্রতারণা এবং জালিয়াতি থেকে মুক্তির পথ তৈরি হল।
“এই যে বিদেশ থেকে পুরনো ফোন কয়েক ডলারে কিনে এনে কেসিং, স্ক্রিন পরিবর্তন করে চীন বা ইন্ডিয়া থেকে বক্স অর্ডার দিয়ে এনে নতুন হিসেবে বিক্রির যে জালিয়তি, এই জালিয়তি থেকে আমাদের মানুষকে মুক্ত করতে চাই।”
বৃহস্পতিবার বিটিআরসি ভবনে হামলাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে বর্ণনা করে তৈয়্যব বলেন, “অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে এ হামলাটা সেদিনই ঘটল, যেদিন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একক খাত হিসেবে বৈধ মোবাইল আমদানিতে সর্বোচ্চ শুল্ক কমানো হয়েছে। প্রায় ষাট শতাংশ আমদানি শুল্ক কমানোকে স্বাগত না জানিয়ে রাষ্ট্রীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের হামলা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।”
বিশেষ সহকারী বলেন, “পহেলা জানুয়ারির আগে যে সকল ফোন বাংলাদেশে এসেছে, সেগুলো সচল হোক বা অবিক্রিত থাকুক, সবগুলো ফোনই আমরা বৈধ করে নেব। সাতটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে তাদের অবিক্রিত ফোনের আইএমইআই এর তালিকা দিয়েছে।
“কিছু প্রতিষ্ঠান দেয়নি, তাদেরকে হয়ত ভুল বোঝানো হচ্ছে, অথবা তাদের বাধা দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে সরে এসে সবাই এনইআইআর বাস্তবায়নে শরিক হবে বলে আমরা আশা করছি।”
এনইআইআর পদ্ধতির বিরোধিতা করে গত কয়েকদিন ধরে বিক্ষোভ করছিলেন মোবাইল হ্যান্ডসেটের ব্যবসায়ীরা, যারা নানা ‘অবৈধ রুটে কর ফাঁকি’ দিয়ে নিম্নমানের, ক্লোনড, ব্যবহৃত ও পুরনো ফোন দেশের বাজারে ঢোকাচ্ছেন বলে সরকারের অভিযোগ।
কর ফাঁকি বন্ধের পাশাপাশি নিম্নমানের ফোন দেশে ঢোকা বন্ধ করতে সরকার হ্যান্ডসেট নিবন্ধনে এনইআইআর পদ্ধতি কার্যকরের উদ্যোগ নেয়।
এনইআইআর কার্যকরের ফলে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত প্রত্যেকটি ফোন নিবন্ধনের আওতায় আসবে। ফোন নিবন্ধিত কী না তা পরীক্ষা করা যাবে সরকারের https://neir.btrc.gov.bd ওয়েবসাইট থেকে। তার আগে মোবাইল ফোনে *#০৬# চেপে আইএমইআই নম্বরটি বের করে নিতে হবে।
১ জানুয়ারির আগে নেটওয়ার্কে চালু হওয়া বৈধ বা অবৈধ কোনো ফোনই বন্ধ হবে না বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এনইআইআর ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর ফোন কেনার সময় সেটি বৈধ কি, না তা যাচাই করে নিতে সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে।
গ্রাহক শঙ্কা ও বিটিআরসির জবাব
এনইআইআর চালুর পর গ্রাহকদের বিভিন্ন শঙ্কা ও প্রশ্নের জবাব দিয়েছে বিটিআরসি। রোববার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ বিষয়ে জানানো হয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “১ জানুয়ারি থেকে এনইআইআর চালুর পর সামাজিক মাধ্যম এবং গণমাধ্যমে গ্রাহকদের বেশকিছু সমস্যার বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছে বিটিআরসি।
১. একজন গ্রাহক তাদের অনুকূলে অনেক অবৈধ বা অসংগঠিত আইএমইআই নম্বর দেখতে পাচ্ছেন।
বিটিআরসির জবাব: ক্লোন, কপি, ব্যবহৃত (ইউজড) বা রিফারবিসড মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবহারের ফলে এরকম সমস্যা হচ্ছে। এই ধরনের আইএমইআই যেন ভবিষ্যতে নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হতে না পারে তা এনইআইআর সিস্টেম চালু করার অন্যতম উদ্দেশ্য।
২. একই জাতীয় পরিচয়পত্রে অধিক সংখ্যক সচল সিম বা হ্যান্ডসেটের সংখ্যা দেখা যাচ্ছে।
জবাব: এনইআইআর সিস্টেমে একজন গ্রাহকের এ যাবত কালের সকল হিস্টরিক ডেটা সংরক্ষিত আছে, তাই এ ধরনের সংখ্যা দেখা হচ্ছে। বিটিআরসি এবং মোবাইল অপারেটররা যৌথভাবে এই নিয়ে কাজ করছে, যেন একজন গ্রাহক শুধুমাত্র বর্তমানে সচল হ্যান্ডসেটের তথ্য দেখতে পারেন। আশা করা যাচ্ছে, ক্রমান্বয়ে এ ধরনের সমস্যা কমে আসবে।
৩. এনইআইআর চালুর পর সিটিজেন পোর্টালে রেজিস্ট্রেশনের সময় মোবাইল অপারেটর থেকে ওটিপি আসতে কিছু ক্ষেত্রে বিলম্ব হচ্ছে।
জবাব: স্বল্প সময়ে অনেক রেজিস্ট্রেশন রিকোয়েস্ট আসার ফলে কিছু গ্রাহক এই বিলম্বের সম্মুখীন হচ্ছেন। এটা মোবাইল অপারেটরদের ইআইআর ব্যবস্থাপনার অংশ। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে বিটিআরসি থেকে সংশ্লিষ্ট সকল মোবাইল অপারেটরকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
৪. অনেক গ্রাহক তাদের তথ্যের নিরাপত্তা, অর্থাৎ তথ্য চুরির বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
জবাব: এক্ষেত্রে বিটিআরসির পক্ষ থেকে সকলকে আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে, সকল গ্রাহকের সকল তথ্য নিরাপদ রয়েছে। একজন গ্রাহক কেবল তার নিজস্ব তথ্য দেখতে পাবেন, অন্য কেউ দেখতে পাবেন না।
গ্রাহকের যে কোনো সমস্যা বা জিজ্ঞাসা সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ার অথবা বিটিআরসির হটলাইন নাম্বার ১০০ তে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি নিয়ে বিটিআরসির ভাষ্য
এনইআইআর নিয়ে আন্দোলনে যাওয়া ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে যেসব দাবি-দাওয়া তোলা হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে রোববার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তা জানিয়েছে বিটিআরসি।
সেখানে বলা হয়েছে, “এনইআইআর চালুর পর মোবাইল হ্যান্ডসেটের রিটেইল ব্যবসায়ীদের মাঝে অসন্তোষ পরিলক্ষিত হচ্ছে। যদিও ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার আন্দোলনরত মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি অফ বাংলাদেশ (এমবিসিবি) এর প্রতিনিধিদের সাথে বিটিআরসির কার্যালয়ে সভা হয়েছে।”
ওইসব সভায় ব্যবসায়ীরা কয়েকটি দাবি জানান। এসব দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিটিআরসি কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে তাও ব্যাখ্যা করা হয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।
দাবি-১: মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেট আমদানির শুল্কহার কমানো।
গৃহীত পদক্ষেপ: এরই মধ্যে মোবাইল হ্যান্ডসেটের আমদানি শুল্ক ‘উল্লেখযোগ্য হারে’ কমিয়েছে সরকার। আগে মোবাইলের আমদানিশুল্ক ছিল ৬১ শতাংশ, এখন তা কমিয়ে ৪৩ শতাংশ করা হয়েছে।
দাবি-২: মোবাইল ফোন আমদানির প্রক্রিয়ার সহজীকরণ।
গৃহীত পদক্ষেপ: এ বিষয়ে ইতোমধ্যে বিটিআরসি থেকে জানানো হয়েছে যে, মোবাইল ফোন আমদানির জন্য বর্তমানে যে প্রক্রিয়া রয়েছে এবং কাগজপত্র দাখিল করতে হয় তা শিথিল করা হবে। স্বল্প সময়ের মধ্যে ভেন্ডর এনলিস্টমেন্ট সনদ দেওয়া হবে। মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানির জন্য মোবাইল ফোনের অরিজিনাল উৎপাদনকারীর সার্টিফিকেটের বাধ্যবাধকতার পরিবর্তে যে কোনো অথরাইজড ডিলারের কাগজপত্র দাখিল সাপেক্ষে হ্যান্ডসেট আমদানি করা যাবে।
দাবি-৩: অবিক্রিত বা মজুদ হ্যান্ডসেটগুলো নেটওয়ার্কে আত্তীকরণ করা।
গৃহীত পদক্ষেপ: এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের জানানো হয়েছে যে, নামমাত্র শুল্ক দিয়ে কোনো কাগজ ছাড়াই অবিক্রিত বা মজুত হ্যান্ডসেটের আইএমইআই নেটওয়ার্কে সংযুক্ত করা হবে। এমনকি যেসব হ্যান্ডসেটের আমদানির কার্যক্রম চলমান রয়েছে, সেগুলোও নেটওয়ার্কে আত্তীকরণ করা হবে।
দাবি- ৪: পুরনো মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানির অনুমোদন।
বিটিআরসির জবাব: পুরনো হ্যান্ডসেট আমদানি অনুমোদনের বিষয়টি বিটিআরসির আওতাভুক্ত নয়। এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রয়োজন । বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পুরনো পণ্য আমদানির তালিকাতে মোবাইল হ্যান্ডসেটের নাম নেই। মোবাইল হ্যান্ডসেটের মানের ওপর সেবার গুণগত মান নির্ভরশীল, তাই হ্যান্ডসেট ব্যবহারের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত মানের সেবা প্রাপ্তির জন্য হ্যান্ডসেটের গুণাগুণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরনো হ্যান্ডসেটগুলো কী পর্যায়ে রয়েছে বা কোনো কোয়ালিটিতে আমদানি হচ্ছে তা যাচাই করা সম্ভব হয় না। তাই পুরনো যে কোনো হ্যান্ডসেট কিনে গ্রাহকের প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।