Published : 21 Mar 2026, 09:24 PM
পাঁচ বছর বয়সী সাফিনা বাবার কাঁধে চড়ে চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখছে। বাঘের খাঁচার সামনে যেতেই ‘টাইগার’ বলে চিৎকার দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ তার।
এতদিন বইয়ের পাতায় বাঘের ছবি দেখে আসা সাফিনার চিড়িয়াখানায় এসেও চিনতে কষ্ট হলো না। তার বাবা সোহেলও বলছিলেন, “হ্যাঁ মা, এটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার।”
এরপর খাঁচার সামনেই ‘টাইগার কী খায়, খাঁচায় কেন রাখা হয়েছে’ বাবার কাছে এমন প্রশ্ন চলতে থাকে সাফিনার। বাবাও একের পর এক উত্তর দিয়ে চলেন, আর সেসব শুনে যেন কণ্যার চোখেমুখে রাজ্যের বিস্ময়!

নারায়ণগঞ্জের মদনপুর থেকে একমাত্র মেয়েকে চিড়িয়াখানাম দেখাতে নিয়ে এসেছেন সোহেল। বেসরকারি এই চাকরিজীবী বাবা বললেন, অনেকদিন ধরেই মেয়ের বায়না ছিল চিড়িয়াখানায় আসার। আসবেন আসবেন করেও আসা হয়ে ওঠেনি। ঈদের দিন নামাজ শেষে খেয়েই মেয়েকে নিয়ে সকাল ১০টার দিকে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েছেন।
তিনি বলেন, “অনেক পশু-পাখির ছবিই সে এতদিন বইয়ে দেখেছে। আজ সামনে থেকে দেখে অনেক খুশি।”
ঈদুল ফিতরের দিনে চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসা সাফিনার মতো হাজারো শিশু-কিশোরের অন্যতম আকর্ষণ এই রয়েল বেঙ্গল টাইগার।
খাঁচার চারপাশ ঘিরে উৎসুক জনতার ভিড়, শিশুদের ডাকাডাকিতেও যেন ‘ভ্রুক্ষেপ নেই’ টাইগারের। যে কারণে ভেতরে মাচায় ঘুমিয়ে থাকা টাইগারকে দেখে কিছুটা হতাশ আরেক শিশু সিয়াম। একাধিকবার ‘এই টাইগার ওঠ, বাঘমামা ওঠো’ বলে ডাকাডাকিতেও কাজ হলো না।

পরক্ষণেই এই চার বছর বয়সী শিশুর বাবা মিজানুর রহমান বলছিলেন, “সে ঘুমিয়েছে, চলো সামনের খাঁচাই যাই, সেখানেও বাঘমামা আছে।”
দু-কদম এগিয়ে আরেক খাঁচায় এবার জোড়া বাঘ দেখে যেন সাধ মিটল সিয়ামের।
তাদের মতো কল্যাণপুরের বাসিন্দা মিজানুর রহমান স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ঈদ উপলক্ষে ঘুরতে এসেছেন। তিনি বলেন, “ঈদে বাড়ি যাওয়া হয়নি, তাই বাচ্চাদের নিয়ে একটু বেরিয়েছি। চিড়িয়াখানায় এসে বাচ্চারা খুশি, আমরাও খুশি।”
ঈদের দিন সকাল থেকে ঢাকার আকাশ মেঘলা। কোথাওবা গুড়িগুড়ি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঈদের নামাজে গেছেন নগরবাসী। সকাল গড়িয়ে দুপুর নামতেই ভিড় বাড়তে থাকে মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানামুখী সড়কে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই এই ভিড় রূপ নেয় জনস্রোতে।

এদিন চিড়িয়াখানায় আসা মানুষজনের মধ্যে মিরপুর ও আশেপাশের এলাকার যেমন ছিল, তেমনি ছিল দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষজনও। প্রায় সবাই এসেছেন শিশু-কিশোরদের নিয়ে, পরিবারের ছোট সদস্যদের লক্ষ্য করে আসা এই ঈদ বিনোদনে সামিল হয়েছেন বড়রাও।
তবে ভিড় থাকলেও চিড়িয়াখানায় ‘অতটা বেশি’ জনসমাগম হয়নি বলে মনে করছেন সেখানকার পরিচালক রফিকুল ইসলাম তালুকদার।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আরো বেশি মানুষের সমাগম হবে আশা করেছিলাম। আজ প্রায় ৮০ হাজার দর্শনার্থী ছিল।”
এদিন ভিড়ের মধ্যে ছিল ঢাকার উত্তরা থেকে আসা দুই ভাইবোন রাইসা ও রাইয়ান। দুই স্কুলপড়ুয়া এদিন এসেছেন বাবা-মায়ের সঙ্গে। সিংহের খাঁচার সামনে দাড়ানো পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইসা বলছিল, "আমার খুবই ভালো লাগছে, অনেক কিছু দেখলাম। আরো দেখব।”

ষষ্ঠ শ্রেণি পড়ুয়া তার ভাই রাইয়ানও বলছিল, "নতুন অনেক কিছু পশুপাখি দেখলাম, যেগুলো আগে কখনো দেখিনি। ভালো লেগেছে খুব।”
বাঘ, সিংহ, হাতি, হরিণ, বানর, জিরাফ, জেব্রার মতো পরিচিত প্রাণিদের খাঁচার সামনে ভিড় ছিল। আবার ‘কমন ইল্যান্ড’, ‘ওয়াইল্ডবিস্টের’ মতো বিভিন্ন অপরিচিত প্রাণির খাঁচাও উৎসুক শিশুদের নিয়ে বাবা-মায়দের ঘুরতে দেখা গেছে।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্তমানে বিভিন্ন প্রজাতির দেশি-বিদেশি প্রায় ৩৫০০ পশুপাখি দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শিত হচ্ছে।
দর্শনার্থীদের এদিন নির্মল আনন্দ দিয়েছে খাঁচার ভেতর দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির পাখির ওড়াওড়ি আর কলকাকলি। পেখম তোলা ময়ূর দেখে যেমন মুগ্ধ হয়েছেন সবাই, আবার সাপ ও সরিসৃপ জাতীয় বিভিন্ন প্রাণির দিকে শিশুদের ভীত ও উৎসুক চাহনিও ছিল চোখে পড়ার মতো।
হরিণের সামনে লতাপাতা ধরে খাইয়েছে কেউ কেউ। নিষেধাজ্ঞা স্বত্ত্বেও বানরের খাঁচার দিকে কেউ ছুড়ে মেরেছেন বাদাম বা কলা। খাঁচার বাইরে থেকে ভীনদেশি জেব্রা বা দেশি ঘোড়ার গায়ে হাত বুলিয়ে দেওয়ার দৃশ্যও দেখা গেছে।

দৈত্যাকার জলহস্তী এদিন দর্শনার্থীদের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে খাবার খাচ্ছিল। মিরপুরের ভাষানটেক এলাকা থেকে আসা ৮ বছর বয়সী শুভ তার অন্যান্য ভাইবোনের সঙ্গে প্রাণিটি নিয়ে আলোচনা করছিল।
শুভ জানাল, তাদের ছয়-ভাইবোনকে নিয়ে ঈদ উপলক্ষে ঘুরতে এসেছেন চাচা শামীম। তারা একসঙ্গে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন পশুপাখি দেখছেন। অনেক কিছুই জীবনে প্রথম দেখছে, যা এতদিন বইয়ে বা টিভিতে কিছু কিছু দেখেছে।
তাদের চাচা শামীম বলেন, “ঈদতো বাচ্চাদেরই আসল। তাদের নিয়ে ঈদের দিন ঘুরতে বেরুনোর কথা ছিল আগে থেকেই, বাসা থেকে কাছাকাছি আবার বাচ্চাদের পছন্দের হবে তাই এখানে এসেছি। ঘোরাফেরা শেষ করে বাইরে খেয়েদেয়ে বাসায় ফিরব।”

বানরের দুষ্টুমি দেখে লুটোপুটি অবন্তির
রেসাস বানর, কুলু বানর, হনুমান লেঙ্গুরের খাঁচাগুলো পাশাপাশি। কুলু বানরের খাঁচায় দুটি বড় বানরের সঙ্গে একটি বাচ্চাও আছে। বাচ্চাটির লাফালাফি ও নানান অঙ্গভঙ্গি দেখে খাঁচার সামনে হেসে লুটোপুটি খাচ্ছিল ৬ বছর বয়সী অবন্তি। বানরের মতো নানান অঙ্গভঙ্গী তাকেও করতে দেখা গেল।
উচ্ছ্বাসিত অবন্তি তার বাবার সঙ্গে চিড়িয়াখানা ঘুরছিল। অনেকক্ষণ দেখার পরও খাঁচার সামনে থেকে যেতে চাচ্ছিল না। পরে তার বাবা ফিরোজ বললেন, সামনে আরো বড় বানর আছে, তারপর পরের খাঁচার দিকে হাঁটতে থাকল তারা।
এরমধ্যে অবন্তি বলল, “অনেকগুলো বানর দেখেছি, হাতি দেখেছি, জেব্রা, বাঘ, সিংহ দেখেছি। আজ সারাদিন আরো দেখব।”
তার বাবা বললেন, “আমার ছোট সন্তান ও তার মাও এসেছে। তারা টায়ার্ড, তাই তাদেরকে এক জায়গায় বসিয়ে এসেছি। মেয়েতো কোনভাবেই বসবে না, তাই তাকে নিয়ে ঘুরছি।
“এখনকার ছেলেপেলেরা দেশি অনেক পশুপাখিও চেনে না। হয়তো বইয়ে বা টিভিতে দেখেছে। চিড়িয়াখানায় এসে এসব দেখে মেয়ে বেশ মজা পাচ্ছে।”
ঈদ উপলক্ষে জনসাধারণের বাড়তি সমাগমকে মাথায় রেখে নিজেদের ‘বাড়তি প্রস্তুতি’ থাকার কথা বললেন পরিচালক রফিকুল ইসলাম তালুকদার।
তিনি বলেন, “প্রস্তুতি আছে, যাতে নিরাপদে সবাই ঘুরে দেখতে পারে। সেজন্য পুলিশের পাশাপাশি নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীরাও রয়েছেন। বাইরে ট্রাফিক পুলিশের বাড়তি ব্যবস্থাপনা রয়েছে। আশা করছি ঈদের দিনগুলোতে বাড়তি চাপ থাকলেও সকলে মিলে দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপদ ও সুন্দরভাবেই শেষ করতে পারব।”