Published : 02 Jul 2026, 01:40 AM
একতরফা নির্বাচন, দলীয়করণ, অর্থ পাচার, ভিন্নমত দমন, দুর্নীতি কিংবা গুম-খুনের মতো যেসব অভিযোগে মানুষ আওয়ামী লীগ সরকারকে হটিয়েছিল, দুই বছরে সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি না মেলার হতাশা শোনা গেছে নানাজনের কণ্ঠে।
এই হতাশা জুলাই আন্দোলনের সময় রাজপথে নেমে আসা মানুষের মাঝে আছে, আছে সুশাসনের আশায় আন্দোলনে সমর্থন দেওয়া ব্যক্তিদের কণ্ঠেও। প্রাপ্তির হিসাব না মেলার কথা বলেছেন বিশ্লেষকরাও।
অপ্রাপ্তির সুর সবার কণ্ঠে থাকলেও কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ভিন্ন ভিন্ন কথা।
কারো মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের সুফল পেতে হলে রাষ্ট্রকাঠামো খোলনলচে পাল্টে ফেলার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সেটা হয়নি।
কারো কাছে মনে হয়েছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের যে চেতনা, সেই চেতনাতেই বিচ্যুতি ঘটেছে। এ আন্দোলনকে ‘টাকা তৈরির যন্ত্র’ বানিয়ে ফেলার অভিযোগ এসেছে খোদ জুলাই আন্দোলনের সামনের সারির নেতার মুখ থেকেই।
কোনো কোনো ছাত্রনেতার মতে, জুলাই চেতনা গায়েব করে দেওয়া হয়েছে ‘রাজনৈতিক ভাগ-বাটোয়ারার’ মধ্য দিয়ে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব’ ও ‘উগ্র ডানপন্থিদের উত্থানের’ কারণেও জুলাইয়ের চেতনা মলিন হয়ে যাওয়ার কথা এসেছে কারো কারো মুখ থেকে।
অন্যদিকে প্রাপ্তির হিসাব না মেলার কারণ হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর মানুষের ‘ভাষা’ বুঝতে না পাড়া, সমন্বয়কদের সমালোচিত কর্মকাণ্ড ও জুলাই চেতনাকে ‘রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার’ মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলার মতো বিষয়কে সামনে এনেছেন বিশ্লেষকরা।

যে কোটা আন্দোলনের সূত্র ধরে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, তার গোড়াপত্তন বলতে গেলে এক দশক ধরে চলে আসছিল। তবে এই আন্দোলন প্রথমবার দেশজুড়ে তীব্র হয়ে ওঠে ২০১৮ সালে। ওই বছর দাবি মেনে নিলে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসে।
এরপর একই বিষয়ে হাই কোর্টের একটি মামলা ঘিরে ২০২৪ সালের জুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে আন্দোলন দানা বাধে, যা জুলাই আসতে আসতে ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। পরে সরকার পতনের একদফায় রূপ ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন‘।
সেই আন্দোলনে ৫ অগাস্ট পতন ঘটে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের। সেদিনই দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। দেশে নিষিদ্ধ হয়ে যায় আওয়ামী লীগ ও দলটির ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনের কার্যক্রম। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় আসে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। দলটির অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের কেউ কারাগারে, কেউ আত্মগোপনে।
আওয়ামী লীগ হটানোর এই আন্দোলনে প্রায় এক হাজার আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয়। আহত হয় কয়েক হাজার মানুষ। হতাহতের ঘটনা ঘটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতেও।
জুলাই আন্দোলনের সামনের সারির নেতা ছিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ, যিনি বর্তমানে সংসদ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
জুলাই আন্দোলনের নেতাদের হাত ধরে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠকের দায়িত্বেও আছেন তিনি।
জুলাই আন্দোলনের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়ে নিজের অভিব্যক্তি শোনাতে গিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমরা কাঠামোগত যে পরিবর্তনের কথা বলেছিলাম, তা আসলে হয় নাই। জুলাইয়ের পর মানুষের স্বপ্ন ছিল বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে আইন বিভাগ, শাসন বিভাগসহ রাষ্ট্রের প্রত্যেকটা কাঠামোতে পরিবর্তন আসবে।
“কিন্তু বর্তমানে এটা না হয়ে পুরনো কাঠামো, যেটার মধ্যদিয়ে আসলে ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা’ বারবার ফিরে আসে, সেই কাঠামোই টিকে আছে।”

দেশের হাল ধরার পর সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নির্বাচন ব্যবস্থা ও জনপ্রশাসন সংস্কারের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। পরে সংস্কারের আওতা বাড়িয়ে গঠন করা হয় আরো পাঁচটি কমিশন।
এসব কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে গেল বছরের ১৭ অক্টোবর গৃহীত হয় জুলাই সনদ। তবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ থাকায় এই সনদের বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
এই অনিশ্চতার দায় অবশ্য বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ঘাড়ে দিতে চান হাসনাত আবদুল্লাহ।
তিনি বলেন, “আমরা মনে করেছিলাম, বর্তমান সরকারের মধ্যে একটা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থাকবে। কারণ তাদের ৩১ দফায় পরিবর্তনের অনেক বিষয় প্রতিফলিত হয়েছিল। তারা এখন সে পরিবর্তনের জায়গা থেকে সরে এসেছে।”
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সমন্বয়ক ছিলেন রিফাত রশিদ, যিনি পরে প্ল্যাটফর্মটির সভাপতির দায়িত্ব পান।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “সত্যিকারার্থে বৈষম্যমুক্ত যে বাংলাদেশ আমরা চেয়েছিলাম, সেটা স্পর্শ করতে পারিনি। যা চেয়েছি আর যা পেয়েছি, তার মধ্যে অপ্রাপ্তি অনেক বেশি।”
তার মতে, “স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও বাংলাদেশের অখণ্ডতার প্রশ্নে সবাই এক থাকবে, এসবই ছিল জুলাইয়ের চেতনা। সেই জিনিসটা আসলে আমরা পাইনি।
“জুলাই অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি আমাদের যে চাওয়া ছিল, তা রাজনৈতিক ভাগ-বাটোয়ারার মধ্যদিয়ে গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।”
তার মতে, “জুলাইয়ের প্রকৃত নেতৃত্বে যারা ছিলেন, তাদেরকেও বিভিন্নভাবে সরিয়ে এমন লোকদের সামনে আনা হয়েছে, যারা আসলে জুলাইয়ের প্রকৃত নেতৃত্ব না।”

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একপর্যায়ে যে নয় দফা দেওয়া হয়, তার ঘোষণা আসে আব্দুল কাদেরের কাছ থেকে, যিনি ওই সময় সমন্বয়কদের একজন ছিলেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমাদের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যে চেতনা, সেটার লক্ষ্য শুধু নেতার পরিবর্তন না, চেয়ারের পরিবর্তন না, বরং লক্ষ্য ছিল নীতির পরিবর্তন; এখানকার ব্যবস্থার পরিবর্তন।
“যে ব্যবস্থা শেখ হাসিনাকে হাসিনা বানিয়েছে, সেই ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে চেয়েছি। সেজন্যই জুলাইয়ে মানুষজন রাস্তায় নেমেছে, গুলি খেয়েছে, জীবন বিলিয়ে দিয়েছে।”
তিনি বলেন, “আমাদের যে প্রত্যাশার জায়গা ছিল, ‘ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ’, সেটা হয়নি। বরং ব্যক্তি, গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থের জায়গা থেকে বিভিন্ন ‘ক্রেডিটবাজি’, বিভিন্ন সুযোগ কাজে লাগিয়েছে; কাজে লাগিয়েছে শুধু ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলের জন্য।”
বিভাজন তৈরি হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “কেউ ডান, কেউ বাম, কেউ শাহবাগ, কেউ শাপলা। শাহবাগ-শাপলা ‘বাইনারি’ হয়ে গেছে, বাম-ডান ‘বাইনারি’ হয়ে গেছে।
“এই যে স্বার্থকেন্দ্রিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব, সেটাই মনে হচ্ছে আমাদের মহান আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ব্যাহত করেছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভিপি প্রার্থী আব্দুল কাদের মনে করেন, জুলাইয়ের পর ডানপন্থিরা দেশে ‘ইসলাম কায়েমের’ চেষ্টা চালায়।
“যখন একটা অরাজকতা চলছিল, তখন আইনি কোনো শাসন নেই, তখন তারা বিভিন্ন জায়গায় মব করে, মতের বিরুদ্ধে গেলে কিংবা ভিন্ন মতের ওপর আক্রমণ-হামলা চালিয়ে নিজেদের চিন্তার জায়গাটা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য উদগ্রীব ছিল। এই জায়গাটা আমাদের আশাহতের জায়গা।”
দেশের শাসনব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন না আসার উদাহরণ হিসেবে আব্দুল কাদের বলেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দেখেন, ৫ অগাস্টের পরেও দলীয় ভিসি নিয়োগ হয়েছে, যা ৫ অগাস্টের আগেও ছিল।
“আবার দেখেন, শিক্ষাঙ্গনে যে ‘কালচার’ ছিল ৫ অগাস্টের আগে, সেটা মোটা দাগে না থাকলেও তার কিছু রূপরেখা এখনও রয়ে গেছে।”

জুলাইয়ের চেতনার পরিপন্থি কাজ করার অভিযোগ রয়েছে খোদ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদের বিরুদ্ধে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দখলদারিত্বের অভিযোগ তুলে এই প্ল্যাটফর্ম থেকে সরে দাঁড়ানোর বহু ঘটনাও আছে।
সরে দাঁড়ানোর তালিকায় আছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমাও, যিনি ‘জুলাই আন্দোলনকে টাকা তৈরির যন্ত্র বানিয়ে ফেলার’ অভিযোগ তুলেছিলেন।
গত বছরের ২৭ জুলাই নানা অভিযোগ জানাতে ফেইসবুক লাইভে আসেন তিনি।
সেদিন তিনি বলেন, "জুলাই অনেক বড় অভিজ্ঞতা। মানুষ অবিশ্বাস্য লড়াই করেছে। আমার মাথায় আসেইনি যে এটা দিয়ে টাকা-পয়সা ইনকাম করা যায়! আমি মুখপাত্র হওয়ার পর আবিষ্কার করছি, এটা দিয়ে অনেকে অনেক কিছু করছে। টেন্ডার বাণিজ্য, তদবির বাণিজ্য করছে, ডিসি নিয়োগ করছে।
“এগুলো অহরহ করেছে। এর আগে এটা নিয়ে ধারণা ছিল না। জুলাই আন্দোলনকে কেন ‘মানি মেকিং মেশিন’ করব! আনফরচুনেটলি (দুঃখজনকভাবে) সেটা হয়েছে।"
উমামা বলেন, "চাঁদাবাজির যে অভিযোগ আসত, একেকজনের বিরুদ্ধে যে স্বজনপ্রীতি ও শেল্টার-টেল্টার দেওয়ার যে অভিযোগ আসত, এগুলো আমি খুব ভালো করেই জানতাম।
“শুধু চট্টগ্রামের কাহিনি ‘সলভ’ করতে গেলে অনেকের প্যান্ট খুলে যেত। এরকম আরও অনেক জেলার কাহিনি আছে৷ এগুলো ধরতে গিয়ে দেখেছি, এগুলো তো অনেক দূর পর্যন্ত গড়িয়ে গেছে৷"

জুলাই আন্দোলনের সুফল প্রাপ্তিতে ঘাটতি থাকার কারণ হিসেবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের বিতর্কিত এসব কর্মকাণ্ডও দায়ী বলে মনে করেন কেউ কেউ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, “যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল, যে জুলাই সমন্বয়কদের মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে দিয়েছিল, সেই জুলাইকে সমন্বয়করা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেননি।
“সমন্বয়কদের কারো কারো বা কোনো কোনো কর্মকাণ্ড সমালোচনার বাইরে থাকেনি।”
জুলাই থেকে প্রাপ্তির জায়গা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, “জুলাই অন্তত এটা শিখিয়েছে, কোনো দল ফ্যাসিবাদী আচরণ করলে তার পরিণতি সুখকর হবে না। এমনকি সরকার বা বিরোধী দলে থেকে নেতারা যদি জনগণের ভাষা পড়তে ব্যর্থ হন, তবে তিনি বা তার দল বৃহত্তর মানুষকে পাশে পাবে না।”
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে দেশ চালাচ্ছে বলে মনে করেন জাতীয়তাবাদ ছাত্রদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম আবিদ।
বিরোধী ছাত্রসংগঠনের অভিযোগ অস্বীকার করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার জুলাইকে কুক্ষিগত করতে চেয়েছিল, ফলে তাদের সময়ে নিয়ে অভিযোগ থাকতে পারে। কিন্তু বর্তমান সরকার জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে সুন্দরভাবে দেশ চালাচ্ছে।”
জুলাই আন্দোলন নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে মন্তব্য করেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি সালমান সিদ্দিকী।
তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিপরীতে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। ফলে কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-নারীসহ সমাজের বিভিন্ন অংশের দাবিদাওয়া পূরণ হয়নি। মব সন্ত্রাস, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, সাম্প্রদায়িক হামলা, শ্রমিক হত্যা, দেশবিরোধী বাণিজ্যচুক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি আমরা সে সময় দেখেছি।
“জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ব্যবহার করে অনেকে প্রচুর অর্থ, প্রভাব-প্রতিপত্তির মালিক হয়েছেন, যা জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্খার একেবারে বিপরীত।”
তিনি বলেন, “বিএনপি সরকারের চার মাসের কর্মকাণ্ডে পরিষ্কার, তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে দেশ পরিচালনা করছে না।”
জুলাই আন্দোলনকে অনেক কাছ থেকে দেখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। অভ্যুত্থানের দুই বছরের মাথায় এসে তারাও শুনিয়েছেন হতাশার কথা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী রেজওয়ান আহমেদ রিফাত বলেন, "জুলাই গণঅভুথানের অন্যতম আকাঙ্খা ছিল দেশে গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। এ ক্ষেত্রে কিছুটা সফল হলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মৌলিক সংস্কার, বিগত দিনের গুম-খুনের বিচার এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরির ক্ষেত্রে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী মাহিন মনোয়ার বলেন, "জুলাই অভ্যুত্থান আর ১০টি অভ্যুত্থানের মতই। এর মধ্যদিয়ে নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে, মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি।
“আগে একটা দল ক্ষমতায় ছিল, তাদের পর এখন আরেকটা দল ক্ষমতায় বসেছে। এটাই জুলাই অভ্যুত্থানের প্রাপ্তি।"

জুলাই আন্দোলনের আকাঙ্খা পূরণ না হওয়ার কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আইনুল ইসলামও।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের যে আকাঙ্খা, তা আসলে পূরণ হয়নি। মানুষ যেভাবে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা নিয়ে এ আন্দোলনে অংশ নিয়ে সরকারের পতন ঘটিয়েছে, তা আসলে হয়নি। এমনকি যারা অভ্যূত্থান করেছে, তারাও তা ধরে রাখতে পারেনি। পুরো জুলাই এখন একটা রাজনৈতিক টার্ম।”
“পুরো জুলাই অভ্যুত্থান একটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে ডুকে গেছে। এটাকে কেউ একটু ধারণ করে, আবার কেউ কম ধারণ করে। জনপ্রত্যাশার যে প্রতিফলন, তা আর হয়নি।”
জুলাইয়ের প্রাপ্তি সম্পর্কে তিনি বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থান একটা শিক্ষা দিয়েছে, সেটা হচ্ছে কেউ যদি ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠে তার পরিণতি কী হতে পারে, তা আশা করি রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা থাকবেন, তারা অনুধাবন করতে পারবেন।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, “জুলাই আন্দোলন শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে তরুণদের ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্য দূর করার দাবি থেকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি আপামর জনসাধারণের অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। কারণ দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় শক্তির ব্যবহার ক্ষমতাসীন দলকে অজনপ্রিয় করে তোলে।
“বাকস্বাধীনতা হরণ, ভিন্নমত দমন, স্বজনপ্রীতি, এগুলো কোনো নির্দিষ্ট দলের ব্যাপার নয়। যখন যারা ক্ষমতায় যায়, তাদের মধ্যে যেকোনো ভাবেই হোক, ধীরে ধীরে তা বিস্তার লাভ করে।
“একপর্যায়ে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, গঠনমূলক সমালোচনাকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা সরকারের তরফ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
তিনি বলেন, “এজন্যই আমরা পদ্ধতির উন্নয়নের কথা বলি। যেমন, সরকারি চাকরিতে কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়া এমন হবে, যেন নিয়োগকর্তাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা প্রভাব ফেলতে না পারে। এমনকি, বিপক্ষ দলের সমর্থক বা কর্মী হওয়ার কারণে যোগ্য ব্যক্তি যেন বঞ্চিত না হন।
“রাষ্ট্রের সামগ্রিক ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক রাখতেই হবে এবং সেখানে সরকারি দলের ভূমিকাই প্রধান। এখন যারা বিরোধী দলে আছে, তাদের উচিত হবে শুধু সমালোচনা করা নয়, বরং একই পরিস্থিতিতে তারা কী করত, সেটি তুলে ধরা।”
জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে ‘গুণগত’ পরিবর্তন না এলেও এ অভ্যুত্থানকে স্মরণে রাখতে হবে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোশাহিদা সুলতানা।
তিনি বলেন, “আমি মনে করি, জুলাই অভ্যুত্থানের পরে এখানে যেসব দল সক্রিয় হয়েছে এবং তারা যেভাবে রাজনীতি করছে, তাতে গুণগত কোনো পরিবর্তন কিছুই হয় নাই।
“কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানকে আমাদের স্মরণ করতে হবে বারবার। এ কারণে যে, যেকোনো সরকার স্বৈরাচারী হয়ে উঠলে তাকে যে মানুষ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তার পতন ঘটাতে পারে, সেটার একটা নিদর্শন হিসেবে আমাদের সেটা স্মরণ করা দরকার।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাকাউন্টটিং বিভাগের এই শিক্ষক বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের ফলে কী লাভ হয়েছে, কী সুফল মিলেছে, আমার কাছে মোটেও মনে হয় না যে, আমি জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে কোনো কথা আসলে বলতে পারব। কারণ, আমরা ইতোমধ্যে দেখছি যে, এখানে আসলে সবকিছু আগের মতো চলছে।”
পুরনো সংবাদ