Published : 15 Jun 2026, 08:38 PM
দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করার বিষয়ে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা।
তাদের অভিযোগ, দুদককে দীর্ঘদিন ধরে ‘নখদন্তহীন’ অবস্থায় রাখা হয়েছে; অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া সংস্কারের উদ্যোগও আইনে পরিণত করা হয়নি।
সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে দুর্নীতি দমন কমিশনের মঞ্জুরি দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় এসব কথা বলেন বিরোধী দলের সদস্যরা।
প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দুদকের জন্য ২০ কোটি ৭৯ লাখ টাকার মঞ্জুরি দাবি উত্থাপন করেন। পরে ছাঁটাই প্রস্তাব নাকচ হলে কণ্ঠভোটে দাবিটি গৃহীত হয়।
ছাঁটাই প্রস্তাবের পক্ষে বক্তব্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, দুর্নীতির আলোচনায় রাজনীতিবিদ ও আমলাদের নাম বারবার আসে।
তিনি বলেন, “কোনো রাজনীতিবিদ যখন পেশা হিসেবে লেখেন রাজনীতি, তখন আমি সংগত কারণেই খুব অবাক হই। রাজনীতি করলে পয়সা উৎপাদন হয়, এটা সম্ভবত বাংলাদেশের মত দেশেই সম্ভব।”
রুমিন বলেন, বিগত সরকারের সময়ে ‘ছাগলকাণ্ড’, ‘বালিশ দুর্নীতি’, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে দুর্নীতি, ‘ব্যাংক লুট’, ভুয়া কোম্পানির নামে ঋণ আত্মসাৎ, ওভার ইনভয়েসিং, আন্ডার ইনভয়েসিং, হুন্ডি ও ভুয়া রপ্তানি বিলের মাধ্যমে অর্থ পাচারের ঘটনা দেখা গেছে।
তিনি বলেন, “আমাদের আশা ছিল, ৫ অগাস্টের পরে যখন নতুন বাংলাদেশের কথা হচ্ছে, তখন দুদককে নখদন্তহীন বাঘ থেকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারব।”
অধ্যাদেশ আইনে পরিণত না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন
রুমিন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধন অধ্যাদেশ করা হলেও বর্তমান সরকার তা আইনে পরিণত করেনি।
“এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর একশর ওপর অধ্যাদেশ আইনে পরিণত হয়েছে, কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধন অধ্যাদেশ আইন করা হয়নি।”
তার অভিযোগ, দুদককে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সরকার আন্তরিক নয়।
“সরকারের নিয়তটা কী, তা এই দুর্নীতি দমন কমিশনকে নখদন্তহীন করে রাখার যে সংস্কৃতি, সেখান থেকে বের না হওয়ার উদাহরণ দিয়েই স্পষ্ট হয়ে যায়।”
রুমিন বলেন, “ঠিক যেভাবে একটার পর একটা ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকার দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করেনি, একইভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারও দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে মোটেও আন্তরিক নয়।”
তিনি বলেন, দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের প্রভাব কমানোর কথাও সংস্কার প্রস্তাবে ছিল।
“দুর্নীতি দমন কমিশনের তিনজন সদস্য কারা হবেন, সেটাও সরকার ঠিক করে দেবে। দুদককে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন করতে হলে নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।”
‘বড় রুই-কাতলা বেরিয়ে যায়’
পটুয়াখালী-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, দুদকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা নিয়ে মানুষের মধ্যে হতাশা আছে।
তিনি বলেন, কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া দরকার।
“ছোট ছোট মাছ মাকড়সার জালে আটকা পড়ে, আর বড় বড় রুই-কাতলাগুলো সেই জাল ভেদ করে বেরিয়ে যায়।”
শফিকুল ইসলাম বলেন, ডিজিটাল ফরেনসিক, সাইবার অপরাধ, অর্থ পাচার এবং উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি তদন্তে দুদকের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
রাজনৈতিক ব্যক্তি, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী যে কেউ দুর্নীতিতে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে সমানভাবে আইন প্রয়োগের দাবি জানান তিনি।
শফিকুল ইসলাম বলেন, দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে সাক্ষী ও তথ্যদাতাদের সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলেও অনেক ক্ষেত্রে তথ্যদাতারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
“দুর্নীতি দমন কমিশনকে একটা নখদন্তহীন বাঘ হিসেবে তুলনা করা হয়। উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধেও সমানভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।”
‘সহযোগিতা পাইনি’
ছাঁটাই প্রস্তাবের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার দুদককে শক্তিশালী করতে চায়।
দুর্নীতির আলোচনায় সব দায় রাজনীতিবিদদের ওপর চাপানোর প্রবণতারও সমালোচনা করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন বলেন, “দুর্নীতি, দুর্নীতি, দুর্নীতি—সব জায়গায় হয়। ঘুরে ফিরে সব দোষ রাজনীতিবিদের হয়। কিন্তু যতগুলো ফাইল স্বাক্ষর হয়, শেষে রাজনীতিবিদকে স্বাক্ষর করতে হয়। এজন্য সব দোষ তার।”
তিনি বলেন, “রূপপুরে বালিশ দুর্নীতি হয়েছে, পর্দার দুর্নীতি হয়েছে, মেগা প্রজেক্টে মেগা দুর্নীতি হয়েছে, ব্যাংক লুটপাট হয়েছে। সেজন্যই তো শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রয়োজন।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আগের আইনেও সার্চ কমিটির বিধান আছে। সেই আইনের আওতায় কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
“হয়ত আপনারা মনে করে নিয়েছেন সরকার আন্তরিক না। সরকার আন্তরিক ছিল। চিঠি দিয়েছে। সার্চ কমিটি গঠন করা হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করা হবে। কিন্তু আমরা সহযোগিতাটা পাইনি।”
তিনি জানান, প্রধান বিচারপতির প্রতিনিধি না পাওয়ায় সার্চ কমিটি গঠনের কাজ আটকে ছিল।
“কালকে মাননীয় প্রধান বিচারপতি অনেক দিন পরে তার প্রতিনিধি নিয়োগ করেছেন। বহুদিন গড়িয়ে গেছে। এখন সার্চ কমিটি গঠিত হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনও গঠিত হবে।”
নতুন আইন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নতুন আইন না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে আগের আইনের আওতায় কমিশন গঠন করা হবে।
“দুর্নীতি দমন কমিশন আইনটা পার্লামেন্টে নিয়ে এলে আরও শক্তিশালী দুদক গঠন হবে। আলোচনার ভিত্তিতে, সমঝোতার ভিত্তিতে একটি নতুন আইন হবে।”
তিনি বলেন, দুর্নীতির বিষয়গুলো মোকাবিলা করা হবে এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রেও সরকার কাজ করবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা অর্থনীতির শ্বেতপত্রের তথ্য তুলে ধরে সালাহউদ্দিন বলেন, “২৯ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা, ক্ষেত্রমতে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে।
“শুধু ব্যাংকিং খাতে যে লুটপাট হয়েছে, সেটা দিয়ে ২৪টা পদ্মা সেতু করা যেত।”
আলোচনা শেষে রুমিন ফারহানা ও মো. শফিকুল ইসলামের ছাঁটাই প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়।
পরে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের উত্থাপিত দুদকের ২০ কোটি ৭৯ লাখ টাকার মঞ্জুরি দাবি কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়।