Published : 01 May 2026, 07:04 PM
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে ‘শ্রমিকের খাতায়’ নাম লিখিয়ে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করার প্রত্যয় জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, “আসুন আমরা প্রত্যেকে একেকজন শ্রমিক হিসেবে, দেশ গড়ার শ্রমিক হিসেবে আমরা নিজেদেরকে প্রস্তুত করব। আমরা প্রত্যেকে একেকজন দেশ গড়ার শ্রমিক হিসেবে আমাদের জীবনের বাকি দিনগুলোকে আমরা অতিবাহিত করব।”
মে দিবস উপলক্ষে শুক্রবার বিকালে রাজধানীর নয়া পল্টনে বিএনপির শ্রমিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমাবেশে বক্তৃতা করছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
উপস্থিত শ্রমিক প্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনারা যেমন বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করেন, আপনাদের খাতায় আমি আমার নামটি লেখাতে চাই একজন শ্রমিক হিসেবে। কারণ আপনি যেরকম ইমারত শ্রমিক হিসেবে এই ইমারতটি গড়ে তুলছেন, আপনি একজন পাট শ্রমিক হিসেবে পাটকলের উৎপাদন যেমন বৃদ্ধি করছেন, আপনি একজন পোশাক শিল্প শ্রমিক হিসেবে পোশাক শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি করছেন।
“ঠিক একইভাবে আপনার খাতায় নাম লিখিয়ে আমিও দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিত করতে চাই নিজেকে। সেই জন্য আমি মনে করি, এবং একই সাথে আমি মন্ত্রিপরিষদের সকল সদস্যের নাম শ্রমিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে চাই।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আপনারা যেমন একেকটি জিনিস গড়ে তুলছেন, আমরা আপনাদের পাশে থেকে দেশ গড়ার কাজে হাত দিতে চাই, দেশকে গড়তে চাই। দেশের মানুষ পরিশ্রম করে যেভাবে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, তাদের সাথে থেকে তাদের পাশে থেকে আমরা দেশকে গড়ে তুলতে চাই।
“এ জন্যই প্রিয় ভাই-বোনেরা, আমাদের নির্বাচনের সময় স্লোগান ছিল— 'করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ'। এটিই হচ্ছে আমাদের স্লোগান, এটিই হচ্ছে আমাদের বর্তমান স্লোগান, এটিই হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ স্লোগান।”

‘শ্রমিকদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছিল’
মে দিবস উপলক্ষে বিএনপির শ্রমিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের উদ্যোগে এই শ্রমিক সমাবেশ হয়। ঢাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডের শ্রমিক দলের নেতা-কর্মী-সমর্থক ছাড়াও গাজীপুর, নারায়নগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ প্রভৃতি জেলার শিল্প-কলকারখানার শ্রমিকরা সমাবেশে অংশ নেন।
লাল টুপি মাথায় হাজারো নেতা-কর্মী ব্যানার নিয়ে এই সমাবেশে উপস্থিত হন। কাকরাইল থেকে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত হাজার হাজার নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে সমাবেশে জনসমুদ্রে রূপ নেয়।
বক্তব্যের শুরুতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এবং ৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গত দেড় দশকে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলন নিহত শ্রমিকদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নয়া পল্টনে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন সমাবেশে তৎকালীন সরকারের ‘নির্মমতার’ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সেই স্বৈরাচারের বিগত প্রায় এক যুগের বেশি সময় আমরা কি দেখেছি? আমরা দেখেছি শুধু যে শ্রমিককে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তা নয়, শুধু যে ছাত্রদেরকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তা নয়, শুধু যে শিক্ষকদেরকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তা নয়, শুধু যে নারীদেরকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তা নয়। এই দেশের প্রত্যেকটি খেটে খাওয়া মানুষকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
“এই দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার থেকে দেশের মানুষকে বঞ্চিত করা হয়েছে। বঞ্চিত করা হয়েছিল তাদেরকে তাদের অর্থনৈতিক অধিকার থেকে।”
আওয়ামী লীগ আমলের ‘লুটপাটের’ চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা দেখেছি কীভাবে দেশের শিল্পকল কারখানাগুলোকে ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং এক পর্যায়ে গিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল এবং কীভাবে এই দেশে আমদানিনির্ভর করে হয়েছিল। এই দেশের পুরো অর্থনীতিকে কীভাবে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর করে গড়ে তোলা হয়েছিল।
“আমরা দেখেছি কীভাবে স্বৈরাচারের সময় এই দেশ থেকে এই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। আমরা দেখেছি এই দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে স্বৈরাচারের এক যুগ সময়ে কীভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। যে কয়টি সেক্টরের কথা আপনাদের সামনে আমি তুলে ধরলাম, এই প্রত্যেকটি সেক্টরে হাজারো লক্ষ কোটি শ্রমিক কাজ করে এবং এভাবেই দেশের প্রত্যেকটি সেক্টরকে ধ্বংস করার মাধ্যমে বাংলাদেশের সকল শ্রেণির মানুষকে আঘাত করা হয়েছিল, বাংলাদেশের শ্রমিকদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছিল।”

‘বন্ধ কলকারখানা খুলে দেয়া হবে’
সেই অবস্থা থেকে উত্তরণে বন্ধ কলকারখানা খুলে দেওয়ার উদ্যোগের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “বর্তমান সরকার, বিএনপি সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার এবং সেইজন্য এই সরকার গঠিত হওয়ার সাথে সাথেই আমি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে সাথে নিয়ে বসেছি এবং নির্দেশনা দিয়েছি। আপনারা জানলে খুশি হবেন,… আমি নির্দেশনা দিয়েছি যে, কীভাবে আমরা কত দ্রুত বন্ধ কলকারখানার কোনটি কোনটি চালু করতে পারব, যাতে আবার সেই সকল শ্রমিক যারা কর্মসংস্থান হারিয়ে বেকার হয়ে গিয়েছিল সেই সকল শ্রমিকের কর্মের ব্যবস্থা আমরা করতে পারি। সেই মিটিংটি এই সপ্তাহে আবার নির্ধারিত হয়েছে।
“ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশের অনেকগুলো কল কারখানা, যেগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছে বিগত বছরগুলোতে পর্যায়ক্রমিকভাবে, আমরা সেই কল কারখানাগুলোকে আবার চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। শুধু এই বন্ধ কলকারখানা চালু হলেই সকল শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে না আমরা জানি। এই শ্রমিকদের পাশাপাশি আরো বহু লক্ষ হাজারো লক্ষ বেকার এখন এই দেশে রয়ে গিয়েছে।”
তিনি বলেন, “তাদের জন্য দেশে আমাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদেরকে বিদেশে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে এবং সেইজন্যই আমরা বিদেশি বিনিয়োগকারীসহ দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সাথে এরই ভেতরে আলোপ আলোচনা শুরু করেছি। আমরা তাদেরকে উৎসাহ প্রদান করছি।
“আমরা তাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি। যাতে করে সে বিনিয়োগকারীরা সে দেশিই হোক অথবা বিদেশই হোক, এই দেশে কল কারখানা তৈরি করে।”
তারেক রহমান বলেন, “আমরা জানি এই দেশে কলকারখানা তৈরি হলে এই দেশের শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। আমরা জানি, শ্রমিকরা যদি ভালো থাকে তাহলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে। আমরা জানি কৃষকরা যদি ভালো থাকে তাহলেই বাংলাদেশ ভালো থাকবে।
“অর্থাৎ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ যখন ভালো থাকবে তখনই এই দেশ, বাংলাদেশ ভালো থাকবে। এবং সেজন্যই প্রিয় ভাই-বোনেরা, আপনারা দেখেছেন আমরা জানি, আমরা বিষয়টি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল আছি।”
‘উচ্ছেদ হওয়া হকারদের পূনর্বাসন করা হচ্ছে’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যানজটসহ সাধারণ মানুষের চলাফেরার অসুবিধার জন্য হকারদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদেরও যে খেয়ে পরে বাঁচতে হবে, সেটা তার সরকার বোঝে।
“সেজন্যই আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সাথে সাথে নির্দেশনা দিয়েছি যে, হকার উচ্ছেদ করলে শুধু হবে না, এই মানুষগুলো যাতে খেয়ে পরে বাঁচতে পারে, কর্মসংস্থান হয়, ব্যবসা করতে পারে, তারও ব্যবস্থা করতে হবে। এবং আপনারা দেখেছেন এরই মধ্যে তার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
“আমরা জানি সকলকে হয়ত একসাথে আমরা ব্যবস্থা করে দিতে পারব না, পর্যায়ক্রমিকভাবে আমরা ব্যবস্থা করব। ইনশাআল্লাহ আপনাদের নির্বাচিত সরকার অবশ্যই মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে।”
সেই লক্ষ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় হকার বসার জায়গা নির্ধারণের কথাও সরকারপ্রধান বলেন।
শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক মনজরুল ইসলাম মনজুর সঞ্চালনায় সমাবেশে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমান উল্লাহ আমান, আবদুস সালাম, শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়কারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, বিএনপি মহানগর দক্ষিনের আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু, উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম, শফিকুল আলম মিল্টন, যুব দলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, বিএনপির হুমায়ুন কবির খান, ফিরোজ উজ জামান মামুন মোল্লা, শ্রমিক দলের সালাহ উদ্দিন সরকার, মেহেদি আলী খান, মোস্তাফিজুল করীম মজুমদার, আবুল খায়ের খাজা, সুমন ভূঁইয়া বক্তব্য দেন।