Published : 27 Jul 2025, 01:14 AM
জলবায়ু সহনশীল বীজ, ডিজিটাল পরামর্শ, জলবায়ু ঝুঁকি বীমা এবং কৃষিতে অর্থায়নের সুযোগের ক্ষেত্রে সমন্বিত ও প্রেক্ষাপট উপযোগী কৌশলগুলো উঠে এল জলবায়ু অভিযোজন বিষয়ক এক সম্মেলনে।
শনিবার ঢাকায় শেষ হওয়া দুদিনের এ সম্মেলনে আলোচনা সভার পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীল কৃষিভিত্তিক উদ্ভাবন নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজনও ছিল।
স্থানীয় জনগণের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে জলবায়ু অভিযোজন কৌশলকে বড় পরিসরে কাজে লাগাতে ‘ফ্রুগাল ইনোভেশন ফোরাম’ শীর্ষক এ আয়োজন করে ব্র্যাক।
‘কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবিকায় জলবায়ু অভিযোজন’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সাভারের ব্র্যাক সেন্টার ফল ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজমেন্টে (সিডিএম) শুক্র ও শনিবার এ সম্মেলন হয়।
এতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় গ্লোবাল সাউথ বা বিশ্বের এই প্রান্তের বাস্তবতার নিরিখে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্ভাবিত সমাধানগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এছাড়া বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও উদ্যোক্তারা পুনরুৎপাদনশীল কৃষি, প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান, জলবায়ু সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও বাজারজাতকরণের কৌশল উদ্ভাবনের বাস্তবসম্মত সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

২০১৩ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে ফ্রুগাল ইনোভেশন ফোরাম (ফিফ) গ্লোবাল সাউথ ভিত্তিক উদ্ভাবন ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে কাজ করছে। এটির আগের সম্মেলনগুলোতে ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি থেকে কোভিড পরবর্তী পুনরুদ্ধার নিয়ে আলোচনা হয়।
এবারের আয়োজনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ২০০ জনেরও বেশি বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা, গবেষক ও উন্নয়নকর্মী অংশ নেন।
বিভিন্ন অধিবেশনের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাঠ পর্যায় থেকেই জলবায়ু সহনশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার বার্তা দেওয়া হয়।
আলোচনা হয় জলবায়ু ঝুঁকি বীমা, জলবায়ু সহনশীল বীজ, ডিজিটাল পরামর্শ এবং কৃষিতে অর্থায়নের সুযোগের ক্ষেত্রে সমন্বিত ও প্রেক্ষাপট উপযোগী কৌশল নিয়ে।
সম্মেলনে সাজিদা ফাউন্ডেশন, উইগ্রো ওয়ার্ল্ড ভিশন, ব্র্যাকের জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচি, পভার্টি এলিভেশন ক্লাস্টার ও সোশ্যাল ইনোবেশন ল্যাব, ফ্রুগাল ইনোভশন ফেলোস, ইনসোরকাউ, আইফার্মার এবং গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের মত কোম্পানিগুলো জলবায়ু সহনশীল কৃষিভিত্তিক উদ্ভাবন নিয়ে প্রদর্শনী করেছে।
প্রদর্শনীতে কীভাবে প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনগুলো প্রান্তিক কৃষকদের অনিশ্চিত আবহাওয়া মোকাবেলা, ফসলের উৎপাদন হ্রাস এবং ফসল উৎপাদন পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করছে তা তুলে ধরা হয়।
সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জোট ‘ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম’ এর মহাসচিব ও মালদ্বীপের সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ নাশিদ বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা করছে না, এই কাঠামো জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যও সহায়ক নয়।

“উন্নয়নশীল দেশগুলো পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করতে পারছে না, কারণ ঋণগ্রহণ এখনও তাদের জন্য অনেক বেশি ব্যয়বহুল। অভিযোজনের প্রয়োজনীয়তার তুলনায় অর্থায়ন অত্যন্ত সীমিত।”
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্ বলেন, বর্তমানে প্রতিবছর জলবায়ুজনিত অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। যার প্রভাব এই প্রান্তের মানুষের উপর পড়ছে, যে ক্ষতি সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
“জলবায়ু অভিযোজন নিয়ে আলোচনাগুলো যেন শুধু আমাদের টিকে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে জীবিকা, মানুষের মর্যাদা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকেও অন্তর্ভুক্ত করে।”
টানা তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং তীব্র বন্যা ও খরার ফলে আগামী ২৫ বছরের মধ্যে খাদ্যব্যবস্থায় ব্যাপক বিপর্যয়ের আশংকা করছেন তিনি।
আসিফ সালেহ্ বলেন, “শুধু বাংলাদেশেই নয় বরং বিশ্বের এই প্রন্তজুড়েই এটি ঘটতে পারে। এসব বিবেচনায় রেখেই এবারের ফোরামের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবিকায় জলবায়ু অভিযোজন’–যার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা নতুন গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ পাবেন।”
ব্র্যাক গ্লোবাল এর নির্বাহী পরিচালক জেরোম ওবেরিয়ে বলেন, প্রতিনিয়ত টিকে থাকার লড়াই করছে এমন মানুষদের জন্য প্রয়োজনে ফ্রুগাল ইনোভেশন এর জন্ম।
“জ্ঞান আহরণের অধিকারকে খাদ্য, পানি বা স্বাস্থ্যসেবার মতো অত্যাবশ্যকীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও তথ্যের অভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর আরো পেছনে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।”

জেনোফ্যাক্স লাইফ সায়েন্সেসের প্রধান এবং বিজ্ঞানী আবেদ চৌধুরী বলেন, “আমরা একটি ভারসাম্যহীন বিশ্বে বাস করছি যেখানে দূষণ সীমাহীন। ব্র্যাকের এই উদ্যোগ একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের প্রতিফলন।”
ব্র্যাকের চেয়ারপারসন হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান থেকে ভিন্ন কিছু না ভেবে, এসব জ্ঞানকে অনুধাবন ও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
“কারণ এতে নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে নির্ভরযোগ্য সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যায়। স্বল্প ব্যয়ের উদ্ভাবন শুধু একটি কারিগরি প্রচেষ্টা নয়; এটি এই বিশ্বকে রক্ষার এবং ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা সুরক্ষায় আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।”
সম্মেলনে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, উন্নত দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নি:সরণের ফলে বাংলাদেশ ক্ষতির শিকার হচ্ছে, অথচ তারা সহায়তা করতে চায় ঋণের আকারে।
“অভিযোজনেরও সীমা আছে, প্রশ্ন হলো, আমরা কতটা অভিযোজন করতে পারি, ধ্বংসের আগে?”

এছাড়া সম্মেলনে ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন পরিচালক কেএএম মোর্শেদ কথা বলেন।
শুক্রবার ব্র্যাক ও ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের ক্লাইমেট হাবের ঊর্ধ্বতন পরিচালক ক্রিস্টিনা চ্যানের সঞ্চালনায় ‘ট্রান্সফরমেশনাল অ্যাডাপটেশন ইন এগ্রিকালচার’, ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনাল কেনিয়ার জলবায়ু কর্মসূচির সিনিয়র ম্যানেজার ডিজেফু গ্যাটাচোর সঞ্চালনায় ‘নেভিগেটিং আনসার্টেনটি থ্রু ক্লাইমেট ইনফরমেশন সার্ভিসেস’, ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের ক্লাইমেট হাব এর প্রধান অ্যাশলি টুম্বসের সঞ্চালনায় ‘ইউজ কেইসেস ফর গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’, ব্র্যাকের সিনিয়র ম্যানেজার কুলদীপ বন্ধু আরিয়ালের সঞ্চালনায় ‘ফার্মিং ফর দ্য ফিউচার: প্র্যাকটিক্যাল ইনোভেশনস ফর স্মলহোল্ডার ফার্মারস’ এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনোয়ারুল আবেদীনের সঞ্চালনায় ‘নেচার বেইজড সল্যুশনস’ শীর্ষক অধিবেশন হয়।
শনিবার ব্র্যাকের পিপল, কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশনসের ঊর্ধ্বতন পরিচালক মৌটুসী কবীরের সঞ্চালনায় ‘ক্রিয়েটিং এন এনাবলিং এনভায়রনমেন্ট: ইউনাইটিং দ্য প্রাইভেট অ্যান্ড পাবলিক সেক্টর’, ব্র্যাকের ক্লাইমেট হাবের ঊর্ধ্বতন পরিচালক ক্রিস্টিনা চ্যানের সঞ্চালনায় ‘ফ্রুগাল ইনোভেশন ফর ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট এগ্রিকালচার’, ব্র্যাকের ওয়াটার, স্যানিটেশন অ্যান্ড হাইজিন, ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট, আল্ট্রা পুওর গ্র্যাজুয়েশন কর্মসূচির পরিচালক হোসেন ইশরাত আদিবের সঞ্চালনায় ‘কমিউনিটি ইন দ্য ড্রাইভিং সিট’, ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের ক্লাইমেট হাবের প্রধান অ্যাশলি টুম্বসের সঞ্চালনায় ‘হোয়াট নিডস টু বি ইন দ্য সলিউশন বাস্কেট ফর ফার্মারস টু অ্যাডাপ্ট’ ও ‘ইনোভেশন ইন এগ্রিকালচারাল ইনপুটস’ এবং ব্র্যাকের সিনিয়র ম্যানেজার কুলদীপ বন্ধু আরিয়ালের সঞ্চালনায় ‘ফাইন্যান্সিয়াল প্রডাক্টস অ্যান্ড ক্লাইমেট রিস্ক ইন্স্যুরেন্স’ শীর্ষক অধিবেশন হয়।