০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩

বুয়েটের ফারদিনের মৃত্যুর রহস্য ঘোঁচেনি ৪ বছরেও, আরও সময় চায় সিআইডি

“বুশরা, যাকে আসামি করেছিলাম সেও তো ভুগছে। তার একটা জীবন আছে, সংসার আছে। সে যদি দোষী না হয় মুক্তি পাক, দোষী হলে শাস্তি পাবে। কিছু একটা তো করেন,” বলেন ফারদিনের বাবা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 07 Nov 2026, 12:21 AM

Updated : 07 Nov 2026, 12:21 AM

নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র ফারদিন নূর পরশের লাশ উদ্ধারের পর চার বছর কেটে গেলেও তদন্তের সুরাহা হয়নি।

গোয়েন্দা পুলিশ ফারদিনের ‘আত্মহত্যার’ কথা বললেও সেই প্রতিবেদনে নারাজি আবেদন দিয়েছিলেন তার বাবা। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছিল।

তবে আড়াই বছরের বেশি সময়েও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি সিআইডি। বাদী বলছেন, প্রতিবেদন জমার তারিখ পাল্টেছে ৪০ বার।

সবশেষ গত ১৪ অক্টোবর মামলার প্রতিবেদন জমার দিন ছিল। সেদিনও সিআইডি প্রতিবেদন না দেওয়ায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আল বিরুনী মীর আগামী ১৭ নভেম্বর নতুন তারিখ রাখেন বলে প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন।

চার বছরেও বিচার শেষ না হওয়ায় ফারদিনের বাবা কাজী নূর উদ্দিন রানা বলছেন, “এ মামলাটা দেখলেই বাংলাদেশে বিচারহীনতার বাস্তবতা বোঝা যায়।”

ফারদিনের সঙ্গে কী ঘটেছিল তা বের করে আনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “৪০টা ডেট পার হয়েছে। এখনও মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। সরকারের প্রতি আহ্বান, বিচারহীনতা থেকে বের হয়ে মামলার ঘটনার সত্যটা বের করে নিয়ে আসুন।”

‘এখনও নতুন কিছু করতে পারিনি’

ফারদিন বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ২৪ বছরের এ তরুণের লাশ ২০২২ সালের ৭ নভেম্বর রাতে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধার করে নৌ পুলিশ।

তার আগে তিন দিন ধরে ছেলের নিখোঁজের কথা তুলে ধরে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন বাবা কাজী নূর উদ্দিন। লাশ উদ্ধারের দুদিন পর ৯ নভেম্বর রাতে রামপুরা থানায় হত্যা মামলা করেন। গ্রেপ্তার হন ফারদিনের বান্ধবী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আমাতুল্লাহ বুশরা, যিনি এখন জামিনে মুক্ত আছেন।

২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বুশরার অব্যাহতি চেয়ে প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত সংস্থা ডিবি। সেই প্রতিবেদনের বিষয়ে ওই বছরের ১৬ এপ্রিল ফারদিনের বাবার নারাজির আবেদন মঞ্জুর করে সিআইডি মামলা অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয় আদালত। তবে এখনও প্রতিবেদন জমা দেয়নি সিআইডি। আরও সময় চায় সংস্থাটি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো পূর্বের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার তানজিলা সিদ্দিকা বলেন, “এখনও নতুন কিছু করতে পারিনি। ভিকটিম আত্মহত্যা করেছে, না তাকে হত্যা করা হয়েছে- এ নিয়েই তো মামলা সিআইডিতে এসেছে। মামলাটির আরও তদন্ত করতে হবে।”

‘কিছু একটা তো করেন’

লাশ উদ্ধার ও মামলার চার বছরও পরেও তদন্ত শেষ না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন ফারদিনের বাবা কাজী নূর উদ্দিন।

ছেলেকে স্মরণ করে তিনি বলেন, “ভালো বিতার্কিক ছিল। ঘটনার মাস দেড়ের পর বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে স্পেন যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাকে অপহরণ করা হল। অপহরণ করে তিন দিন অত্যাচার করল, চতুর্থ দিন হত্যা করে লাশ ফেলে দিল। চারটা বছর হয়ে গেল।”

Image

বুয়েটে মঙ্গলবার জানাজার আগে ছেলের লাশের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন ফারদিন নূর পরশের বাবা নূর উদ্দিন রানা। বুয়েটছাত্র ফারদিনকে হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

পুলিশের তদন্ত নিয়ে তিনি বলেন, “ডিবি পুলিশ তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছে- ‘পারিবারিক অশান্তি, আর্থিক অনটন, মাদকে সম্পৃক্ত থাকায় ফারদিন আত্মহত্যা করেছে’। তাহলে সেটা বের করে আনুন তাকে হত্যা করা হয়নি, আত্মহত্যা করা হয়েছে। মামলা এভাবে ঝুলিয়ে রাখা বিচারহীনতা।

“আর বুশরা, যাকে আসামি করেছিলাম সেও তো ভুগছে। তার একটা জীবন আছে, সংসার আছে। সে যদি দোষী না হয় মুক্তি পাক, দোষী হলে শাস্তি পাবে। কিছু একটা তো করেন।”

বুয়েটের আরেক ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার সঙ্গে জড়িতরা ফারদিনকে ‘হত্যা করেছে’ বলে অভিযোগ নূর উদ্দিনের।

“আবরার হত্যার পর বুয়েট ক্যাম্পাসে রাজনীতি নিষিদ্ধের আন্দোলনে ফারদিন নেতৃত্ব দিয়েছিল। ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে ঢুকতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তারাই ফারদিনকে সরিয়ে দিয়েছে। সরকারের কাছে দাবি জানাই, মামলাটার বিচার করেন,” বলেন তিনি।

ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ফারদিনের বাবার অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তা তানজিলা সিদ্দিকার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, “শুধু বললেই তো হবে না। ক্লু পেতে হবে তো।”

বুশরার আইনজীবী মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, “মামলাটা তো অনেক দিন হয়ে গিয়েছে। গত বছর আদালত তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করেছিলেন মামলা অগ্রগতি বিষয়ে জানতে। মামলায় তেমন অগ্রগতি নেই।”

ফারদিনের বান্ধবী বুশরাকে নিয়ে এ আইনজীবী বলেন, “মেয়েটা অনার্স শেষ করে মাস্টার্স করছে। বিয়ে হয়েছে। মামলার প্রভাবটা সংসারের ওপর পড়ছে। পরিবার অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে আছে।

“প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ড নিন্দনীয়। সে আত্মহত্যা না হত্যা করেছে, তদন্ত করে বের করে আনুক। ধোঁয়াশা বা অন্ধকারাচ্ছন্নের মধ্যে রাখা ঠিক হবে? বুশরার বিরুদ্ধে অভিযোগ না পেলে অব্যাহতি পাবে। আর জড়িত থাকলে বিচার ফেস করবে। একটা কিছু তো হোক।”

‘হত্যার শিকার হয়েছিলেন ফারদিন’, বলেছিলেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক

বাবা-মার বড় ছেলে ফারদিন থাকতেন ঢাকার ডেমরার কোনাপাড়ায় পরিবারের সঙ্গে।

২০২২ সালের ৪ নভেম্বর দুপুরে কোনাপাড়ার বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন; বলে গিয়েছিলেন, পরদিন তার পরীক্ষা রয়েছে বলে রাতে বুয়েটের হলেই থাকবেন। পরীক্ষা দিয়ে বাসায় ফিরবেন।

কিন্তু পরদিন পরীক্ষায় তার অনুপস্থিত থাকার খবর জেনে খোঁজাখুঁজি করেও ছেলেকে না পেয়ে থানায় জিডি করেন ফারদিনের বাবা কাজী নূরউদ্দিন রানা। তিন দিন পর ৭ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে লাশ পাওয়া যায়।

ফারদিনের লাশ পাওয়া যায় গোদনাইলে বর্ণালী টেক্সটাইল মিলের ঘাট এলাকায়। উদ্ধারের সময় তার হাতে ঘড়ি পরা ছিল; জামা-প্যান্ট ছিল প্রায় অক্ষত। তার মানিব্যাগও সঙ্গে ছিল বলে পুলিশ জানায়।

তবে নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর চিকিৎসক শেখ ফরহাদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, নিখোঁজ হওয়ার দিনই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন ফারদিন। তার মাথা ও বুকে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে৷ মৃত্যুর আগে শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন ওই ছাত্র৷

‘আত্মহত্যা করেছিলেন ফারদিন’, বলেছিল ডিবি

ফারদিনের মৃত্যু নিয়ে তুমুল আলোচনার মধ্যে ফারদিনের বাবা রামপুরা থানায় হত্যা মামলা করলে তার তদন্তভার দেওয়া হয় ডিবিকে। এরপর ফারদিনের বান্ধবী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আমাতুল্লাহ বুশরাকে ডিবি গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

যেদিন ফারদিন নিখোঁজ হয়েছিলেন, সেদিন বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর বুশরার সঙ্গে ছিলেন তিনি। রাতে বুশরাকে রামপুরায় পৌঁছে দেওয়ার পর তাকে আর পরিচিতজনরা দেখেনি।

মামলার তদন্তে নেমে ডিবি ফারদিনের মোবাইল ফোন ট্র্যাক করে ওই সময়ের পর ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরের উল্টো দিকে কেরাণীগঞ্জে, সদরঘাটে, গুলিস্তানে এবং সর্বশেষ যাত্রাবাড়ীতে তার অবস্থান শনাক্ত করে।

ওই বছরের ১৭ নভেম্বর তখনকার ডিবি কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ বলেছিলেন, একটি সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে ফারদিনকে রাত ২টায় যাত্রাবাড়ী থেকে রূপগঞ্জের তারাবগামী একটি লেগুনায় উঠতে দেখা গিয়েছিল।

এরপর ১৪ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “বুশরাকে নামিয়ে দিয়ে রাত ৯টার পরে কেরাণীগঞ্জের একটি ব্রিজের কাছে গিয়েছিল, এরপর সেখান থেকে জনসন রোডে যায়, এরপর গুলিস্তান হয়ে যাত্রাবাড়ীতে যায়। রাত ২টা ৭ মিনিটে লেগুনাতে উঠে। পরে ২টা ৩৪ মিনিটে সুলতানা কামাল ব্রিজে যায়।

“যে সমস্ত জায়গায় ঘোরাঘুরি করছে, এগুলো পর্যালোচনা করে আমরা দেখেছি সে একাই ছিল, তার সঙ্গে কেউ ছিল না। এছাড়া সে যার যার সাথে কথা বলেছে, তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি।”

Image

ডেমরার সুলতানা কামাল সেতু

ডেমরার সুলতানা কামাল সেতুর উপর থেকে ফারদিন রাতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন বলার পক্ষে প্রমাণ মেলার কথা বলেন ডিবি কর্মকর্তা হারুন।

তিনি বলেছিলেন, “২টা ৩৪ এর দিকে আমরা দেখেছি, সেখান থেকে একটা শব্দ পানিতে পড়েছে এবং ওই সময়ই আমরা যে মোবাইল পর্যালোচনা করেছি, তাতে ওই সময়ে তার সেখানেই থাকার কথা।”

ওই রাতে সেই শব্দ কীভাবে শনাক্ত করেছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলেননি ডিবির তখনকার ওই কর্মকর্তা।

বলেছিলেন, “আমরা তার মানসিক অবস্থা, তার বিভিন্ন জায়গায় চলাচল এবং ব্রিজের কাছে গিয়ে আমরা যে সেলটা দেখলাম, সেখানে ব্রিজের মাঝামাঝি জায়গায় সে ছিল সর্বশেষ এবং সেখান থেকে আমরা আবছাভাবে যে পানির মধ্যে একটা শব্দ হয়েছে, সেটা আমরা ব্রিজ থেকেও পেয়েছি।

“এই সবকিছু মিলিয়ে আমার কাছে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছে, এইটা একটা সুইসাইডাল ঘটনা।”

পুরনো খবর:

ফারদিন খুন হননি, আত্মহত্যা: ডিবি-র‌্যাব
বুয়েট ছাত্র ফারদিনকে হত্যা করা হয়েছে: ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক
বুয়েটছাত্র ফারদিনের লাশ উদ্ধারের পর অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলছে না
ফারদিন হত্যা: বুশরা রিমান্ডে
ফারদিন খুন: বুশরা নিরাপরাধ, বলছেন চাচা
ফারদিন হত্যা: চনপাড়ার মাদক কারবারিদের খোঁজে পুলিশ