Published : 25 Jan 2026, 11:58 PM
দুই দফায় গুম হওয়া লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমানের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে ‘গুমকক্ষে’ চালানো নির্যাতনের বিবরণ।
ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রোববার দ্বিতীয় দিনের সাক্ষ্য দেন এই সেনা কর্মকর্তা।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ তার জবানবন্দি রেকর্ড করে।
ট্রাইব্যুনালের বাকি দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
হাসিনুরের ভাষ্য, প্রথম দফায় গুম হন ২০১১ সালের ৯ জুলাই। তখন তিনি ময়মনসিংহ সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন। ওই সময় ৪৩ দিন গুম থাকার পর সেনা আদালত তাকে চার বছরের কারাদণ্ড দেয়। ওই সময় তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা ছিল বলে দাবি হাসিনুরের।
তিনি জানান, দ্বিতীয় দফায় তিনি গুম হন ২০১৮ সালে; মুক্তি পান ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি।
সাক্ষ্যে হাসিনুর রহমান বলেন, দ্বিতীয় দফায় গুমের দিন, ২০১৮ সালের ৮ অগাস্ট সন্ধ্যায় মিরপুর ডিওএইচএসে তার বাসায় তার বন্ধু লেফটেন্যান্ট কর্নেল যায়িদ আবদুল্লাহ যান। অনেক জোরাজোরি করে যায়িদ তাকে বাইরে ঘুরতে নিয়ে যান। দুই ঘণ্টা ঘোরাঘুরি শেষে একই এলাকায় মেজর মহসিনের বাসায় যান। সেখান থেকে রাত ১০টায় বের হন।
“আমার পেছনে ছিলেন যায়িদ। পকেট গেটের দিকে আসতেই ৮ থেকে ১০ জন লোকের উপস্থিতি লক্ষ্য করি। রাতে এত লোকের উপস্থিতি অস্বাভাবিক ছিল। এক পর্যায়ে তারা আমার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তখন পেছনে ফিরতেই দেখি আমার বন্ধু যায়িদ নেই।”
তিনি বলেন, সামনেই তার শ্যালিকার বাসা ছিল। তখন ওই বাসার কেয়ারটেকার সেকান্দারকে ডেকে আনেন তিনি। আর তার লাইসেন্স করা অস্ত্র দেখিয়ে ওই লোকদের হাত উঁচু করতে বলেন। তাদের একসঙ্গে জড়ো হতে বলে সামনে থাকা একটি মাইক্রোবাসের দিকে নেওয়ার চেষ্ট করেন। ওই সময় আরও চারটি মাইক্রোবাস ঢোকে। এ সময় একা সামলাতে না পেরে দ্বিতীয় কেয়ারটেকার মুক্তারকে ডাকা হয়।
“এক পর্যায়ে তাকে মাইক্রোর ছবি তুলতে বলি। ছবি তুলতে গেলে মুক্তারকে শকবাটনে আঘাত করে মাইক্রোবাসের ভেতরে নিয়ে যায় তারা। ওই সময় পেছনে থাকা গাড়ির লোকজন এসে আমার কোমরে আঘাত করে। একইসঙ্গে পাঁচ-সাতজন ঝাপটে ধরে। তখন তাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি চলতে থাকে। কিছুক্ষণ পর পেছন থেকে আরেকটি মাইক্রোবাস এসে আমাকে জোর করে তুলে ফেলে।”
হাসিনুর বলেন, মাইক্রোবাসে তুলে তাকে হাতকড়া লাগিয়ে চোখে ‘জমটুপি’ পরানো হয়। এরপর কালো কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে গাড়ি চালানো শুরু করে। ২০-২৫ মিনিট পর গাড়িটি থামে। এরপর গেট খোলার শব্দ শোনা যায়। তখন তাকে ইচ্ছেমতো মারধর করে অন্য পক্ষের কাছে হস্তান্তর করে তারা। এতে তিনি নিস্তেজ হয়ে গেলে তাকে ধরাধরি করে একটি কক্ষে নিয়ে যায়। এরপর হাতকড়াসহ চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়। ওই সময় সেখানে চার-পাঁচজন লোক দেখেন তিনি। তারা তাকে রেখে দরজা বন্ধ করে চলে যায়।
তাকে যে কক্ষে রাখা হয়েছিল তা ভীষণ অস্বাস্থ্যকর ছিল বলে হাসিনুরের বিবরণে উঠে আসে।
তিনি বলেন, কক্ষটি ৮ থেকে ১০ ফুটের ছিল। মেঝে ছিল স্যাঁতসেঁতে। উচ্চ ক্ষমতার বাতি জ্বালানো থাকত সারাক্ষণ। কক্ষটি দেখতে নোংরা, ভয়াবহ ও বীভৎস ছিল। রক্ত দিয়ে দেয়ালে লেখা ছিল মোবাইল নম্বর। একটি চৌকি থাকলেও বিছানার চাদর ছিল রক্তমাখা।
“এছাড়া প্রচণ্ড গরমে আমি অস্থির হয়ে যাই। আধাঘণ্টা পর হাতকড়া পরিয়ে আগের মতো চোখ বেঁধে চড়-থাপ্পড় আর কিল-ঘুষি মারতে মারতে আরেকটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। কক্ষটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ছিল। সেখানে চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে আমাকে একজন জিজ্ঞাসা শুরু করেন। কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছিল তিনি ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা। প্রথমত তিনি আমার ফেইসবুক আইডি জানতে চান। মনে নেই বললে তিনি ক্ষেপে যান।
“ওই সময় আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, কেন আমি সেনাপ্রধান আজিজের বিরুদ্ধে লেখালেখি করি। এজন্য আমাকে মেরে ফেলাসহ লাশ গুমের হুমকি দেন ওই কর্মকর্তা। এক পর্যায়ে আমি কোথায় আছি জানতে চাওয়া হয়। জবাবে বলি, ডিজিএফআইয়ের সদর দপ্তরে আছি। তখন বলা হয়, কীভাবে বুঝতে পেরেছেন। এ সময় পাশ থেকে একজন বলছিলেন, ‘আপনি আয়নাঘরে আছেন’। একটু পর আমাকে ইলেকট্রিক শকসহ মারধর শুরু করা হয়। সম্ভবত জিজ্ঞাসা করা লোক তখন ছিলেন না। এরপর আবার মারধর করতে করতে আগের কক্ষে নিয়ে আসা হয়। পরদিন একইভাবে নির্যাতন ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।”
হাসিনুর বলেন, দ্বিতীয় দিনের জিজ্ঞাসাবাদে ২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে কেন কথা বলেন তা জিজ্ঞেস করা হয়। আওয়ামী লীগ ও ভারত সম্পর্কে কেন নেতিবাচক লেখালেখি করেন।
“আমি জিজ্ঞেস করি কী কারণে আমাকে তুলে আনা হয়েছিল? তিনি বলেন, কী কারণে আনা হয়েছে জানি না। তবে সরকারের নির্দেশে আনা হয়েছে। আপনি আমাদের সহযোগিতা করবেন। অধস্তনদের নির্দেশ মানবেন।
“এক পর্যায়ে আমাকে বলা হয়, আপনার গ্রেপ্তারের জন্য কাকে কাকে সন্দেহ করেন। জবাবে আমি বললাম, আমার বন্ধু যায়িদ, ব্রিগেডিয়ার আজহারসহ ডিজিএফআই ও র্যাব জড়িত। ব্রিগেডিয়ার আজহার তখন ডিজিএফআইতে কর্মরত ছিলেন।”
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর শাইখ মাহদীসহ অন্যরা।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন তিনজন।
তারা হলেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। সকালে ঢাকার সেনানিবাসের বিশেষ কারাগার থেকে তাদের ট্রাইব্যুনালে আনে পুলিশ।
পলাতক ১০ আসামির পাঁচজনই বিভিন্ন মেয়াদে ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এর মধ্যে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ আকবর হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সাইফুল আবেদিন, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. সাইফুল আলম, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল হামিদুল হক।
বাকি আসামিরা হলেন শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মখছুরুল হক।