১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

লঘু সাজা হল রাজসাক্ষী মামুনের, মুক্তি মিলবে কবে?

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের মামলার তিনজন আসামির মধ্যে একমাত্র গ্রেপ্তার সাবেক এই আইজিপিকে রায়ের জন্য সকালে আদালতে হাজির করা হয়। রায় শেষে ফিরিয়ে নেওয়া হয় কারাগারে।

লঘু সাজা হল রাজসাক্ষী মামুনের, মুক্তি মিলবে কবে?
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।

বিডিনিউজ২৪

মামুন খান

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 19 Nov 2025, 11:40 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:09 PM

জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমানোর চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন; তবে অন্য দুই অভিযুক্তের মত সর্বোচ্চ সাজা হল না তার, পেলেন লঘুদণ্ড। রাজসাক্ষী হওয়ার সাজা কম হল সাবেক পুলিশ প্রধানের।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে ১৫ মাস আগের ঘটনায় পাঁচ বছর সাজা পেলেন তিনি। গ্রেপ্তার থাকায় আপিল করার সুযোগও থাকল তার। আলোচিত এ রায়ে সেই লঘুদণ্ড শেষে কবে মুক্তি পাবেন পুলিশের সাবেক এই মহাপরিদর্শক (আইজিপি)  সেই আলোচনাও সামনে এসেছে।

এরইমধ্যে কারাগারে আটক থাকার ১৪ মাস (৩ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার) না কি এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর সময় থেকে (চলতি বছর মার্চ) নয় মাস সাজা থেকে বাদ যাবে সেই কথাও উঠেছে। 

এ বিষয়ে আইনজীবীরা তার বিরুদ্ধে থাকা বিভিন্ন মামলার তথ্য দিয়ে বলছেন ভিন্ন কথা। 

তারা বলছেন, শুধু মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের দায়ে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সাজার মেয়াদ শেষ হলেই তার বন্দিদশা কাটবে না। কারামুক্তির অনেক কিছু নির্ভর করবে অন্য মামলার গতিপ্রকৃতির ওপর; অপেক্ষার প্রহর বাড়বে না কমবে তা জানা যাবে তখনই।

তিনজন আসামির মধ্যে একমাত্র গ্রেপ্তার সাবেক আইজিপিকে রায়ের জন্য সোমবার সকালে আদালতে হাজির করা হয়। রায় শেষে তাকে আবার ফিরিয়ে নেওয়া হয় কারাগারে।

চব্বিশের আন্দোলন থামিয়ে দিতে ১৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দান, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের’ মোট ৫ অভিযোগ আনা হয়েছিল ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া এ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে।

বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সোমবার এ মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রাণদণ্ড দিয়েছে।

হাসিনা সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালেরও একই সাজা হয়েছে। আর অভ্যুত্থানের সময় পুলিশ বাহিনীর নেতৃত্বে থাকা চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দায় স্বীকার করে রাজসাক্ষী হওয়ায় তাকে দেওয়া হয়েছে ৫ বছরের সাজার লঘুদণ্ড, যাকে ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে গ্রেপ্তারের তথ্য দেয় পুলিশ।

সাবেক আইজিপিকে গ্রেপ্তারের পরদিন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। এরপর থেকে একের পর এক জুলাই আন্দোলনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। ফাইল ছবি

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। ফাইল ছবি

আইনজীবীদের দেওয়া তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত ১১৩টি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে মামুনবে। রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে ১৮৫ দিনের বেশি।

তার বিরুদ্ধে এসব আইন পদক্ষেপ চলার মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। এতে জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় প্রথম মামলাটি (মিসকেস বা বিবিধ মামলা) হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রথম বিচারকাজ শুরু হয়। সেদিনই এ মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

প্রথম দিকে এ মামলায় শেখ হাসিনাই একমাত্র আসামি ছিলেন। পরে চলতি বছরের মার্চে এ মামলায তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল এবং ওই সময়ের পুলিশপ্রধান মামুনকে আসামি করার আবেদন করে প্রসিকিউশন। ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন। ১ জুন এই তিন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। ওই দিনই ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নেয়। 

এরপর ১০ জুলাই তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

এক পর্যায়ে এ মামলায় দোষ স্বীকার করে ঘটনার সত্যতা উদ্‌ঘাটনে (অ্যাপ্রুভার) রাজসাক্ষী হতে সাবেক আইজিপি মামুনের আবেদন মঞ্জুর করে ট্রাইব্যুনাল। পরে এতে রাজসাক্ষী হয়ে সাক্ষ্য দেন তিনি। তবুও তার পাঁচ বছরের সাজা হয়েছে।

সেই সাজা কবে শেষ হবে কিংবা কবে তিনি মুক্তি পেতে পারেন- এমন প্রশ্নে সাবেক আইজিপি মামুনের আইনজীবী আব্বাস উদ্দিন বলেন, যে মামলায় সাজা হয়েছে ওই মামলায় তিনি নয় মাসের কিছুটা বেশি সময় ধরে গ্রেপ্তার আছেন। সাজার মেয়াদ শেষ হয়নি। এছাড়া তার বিরুদ্ধে শত শত মামলা রয়েছে, যার মধ্যে ১১৩টি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন থানায় হওয়া মামলায় আসামির তালিকায় তার নাম থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। 

“১০/১২টি মামলায় আমরা আদালতে জামিন চেয়েছিলাম। তবে আদালত তা শুনতে চাননি।

আদালতে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।

আদালতে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।

“তবে এই সরকার একটা আইন করেছে, কেউ যদি ঘটনার সাথে জড়িত না থাকে সেক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে অন্তর্বতীকালীন প্রতিবেদন দাখিল করা হচ্ছে। সে অবস্থায় আসামি মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে যাচ্ছেন। মামুন সাহেবের ক্ষেত্রে যদি তা না হয় তাহলে তাকে এসব মামলায় জামিন নিয়ে কারামুক্ত হতে হবে।”

তখন তার মুক্তি ‘সময়সাপেক্ষ ব্যাপার’ হতে পারে আশঙ্কা করে তিনি বলেন, “তার পাঁচ বছরের সাজা তো রয়েছেই। সরকারের দিকেই তাকে তাকিয়ে থাকতে হবে।"

আন্তর্জাতিক অপরাধা ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ রাজসাক্ষী মামুনের সাজার সময়কালে তুলে ধরে বলেন, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আপিল করা হবে কি না সিদ্ধান্ত হয়নি। এছাড়া তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় অনেক মামলাও রয়েছে।

“সরকার যদি তার মামলাগুলো তুলে নেয় তাহলে হয়তো তিনি সহসা মুক্তি পাবেন। আর না নিলে মুক্তি মিলছে না। সাজা খেটে, মামলাগুলোয় জামিন নিয়েই তাকে কারামুক্ত হতে হবে।“

হাসিনার বিচার শুরু, রাজসাক্ষী হচ্ছেন সাবেক আইজিপি মামুন

জুলাই হত্যা: 'মানবতাবিরোধী অপরাধে' শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড

হাসিনা-কামাল-মামুন: কোন অপরাধে কার কী সাজা

আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া মামুনের জবান

ট্রাইব্যুনালে কড়া নিরাপত্তা, হাজতখানায় মামুন

যেভাবে রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি মামুন, তার সাক্ষ্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

সাবেক আইজিপি মামুনকে ক্ষমার বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের আদেশ প্রকাশ