Published : 27 Dec 2025, 08:58 AM
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের ধলেশ্বরী টোলপ্লাজায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলে বাসের ধাক্কায় ছয়জনের প্রাণহানির ঘটনায় অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ, যা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন মামলার বাদী।
এক বছর আগের ওই ঘটনায় বাসচালক ও মালিকসহ চারজনকে আসামি করে গত ২৮ অক্টোবর অভিযোগপত্র দেন তদন্ত কর্মকর্তা মুন্সীগঞ্জের হাসাড়া হাইওয়ে থানার এসআই মো. আব্দুর রহমান।
তবে মামলার বাদী নুরুল আমিন গত ১৮ ডিসেম্বর অভিযোগপত্র নিয়ে নারাজি আবেদন দিয়েছেন। আগামী ২১ জানুয়ারি এ বিষয়ে শুনানির তারিখ রেখেছেন ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাজ্জাদুর রহমান।
টোলপ্লাজায় প্রাণহানির ওই ঘটনাটি ঘটে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর।
সেদিন বেলা সোয়া ১১টার দিকে ধলেশ্বরী টোলপ্লাজায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রাইভেটকার ও একটি মোটরসাইকেলকে সজোরে ধাক্কা দেয় বেপারী পরিবহনের একটি বাস। এতে একই পরিবারের চারজনসহ দুটি বাহনের ছয়জনের প্রাণ যায়। আহত হন চারজন।
সেদিনের ঘটনায় নিহত হন মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের নন্দনকোনা গ্রামের ইকবাল হোসেনের স্ত্রী আমেনা আক্তার (৪৫), তার বড় মেয়ে ইসরাত জাহান (২৬), ছোট মেয়ে রিহা মনি (১১), ইসরাত জাহানের ছেলে আইয়াজ হোসেন (২) এবং মোটরসাইকেল চালক সুমন মিয়ার স্ত্রী নিপা আক্তার রেশমা (২৬) ও তাদের ৭ বছরের ছেলে মো. আবদুল্লাহ।
এ ঘটনার পরদিন আমেনা আক্তারের ভাই নুরুল আমিন দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানায় সড়ক পরিবহন আইনে মামলা করেন।
এ ঘটনায় দেওয়া অভিযোগপত্রে বাসটির চালক নুর উদ্দিন (২৯), বাস মালিক মোস্তফা রাঢ়ী (৬৫) ও তার ছেলে পারভেজ রাঢ়ী (২৭) এবং বেপারী পরিবহনের ব্যানার ব্যবহারকারী ডাবলু বেপারীকে (৪৭) আসামি করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুর রহমান বলেন, “মামলাটি তদন্ত শেষে বাসের প্রকৃত মালিক-চালকসহ চারজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দিয়েছি। দুর্ঘটনায় কার কী দায় ছিল তুলে ধরেছি। তাদের ভুলের কারণেই এত বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। মানুষগুলো মারা গেছে।”
তবে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট হন মামলার বাদী নুরুল আমিন।
তিনি বলেন, “মামলাটি তদন্ত করে পুলিশ ‘একতরফাভাবে’ আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে। আমাদের সাক্ষ্য-প্রমাণ কিছু নেয়নি। নারাজি দাখিল করা হয়েছে।
“ইচ্ছাকৃতভাবে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। আমরা চাই মামলায় ৩০২ ধারা যুক্ত করা হোক। মামলাটা পুনরায় তদন্ত করা হোক। আমরা সুষ্ঠু বিচার চাই।”
বাদীপক্ষের আইনজীবী রিপন হোসেন বলেন, “আমরা মামলাটা হত্যা মামলায় রূপান্তরে প্রার্থনা করেছিলাম। কিন্তু মোটিভ পায়নি মর্মে পুলিশ অভিযোগপত্র দিয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর ‘ইনটেনশন’ (অভিপ্রায়) ছিল। এ কারণে আমরা অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি দাখিল করেছি।”
ঘটনাটি ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ ঘটানো হয়েছে বলে বাদী দাবি করলেও তদন্তে পুলিশ সেটিকে কেবল দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখছে। মামলাটিতে পেনাল কোড ৩০২/৩৪ ধারায় তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার পক্ষে প্রাথমিকভাবে কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ না পাওয়ার কথা বলা হয়েছে অভিযোগপত্রে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, “বাদীপক্ষ মামলাটি ৩০২/৩৪ ধারায় (হত্যা মামলার) তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আদালতে আবেদন করেন। তবে তদন্তকালে দেখা যায়, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে দ্রুত ও বেপরোয়া গতিতে ওই বাসটি চালানোর ফলে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। সিসিটিভি ভিডিও পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রকাশ্যে দিনের আলোতে দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে তদন্তকালে বাসচালক ও মালিকপক্ষের সঙ্গে ভুক্তভোগী পক্ষের কোনোরকম পূর্ব শত্রুতা বা আগে থেকে ঝামেলা থাকার বিষয়ে কোনোরকম সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
“স্পষ্টত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাসটি দ্রুত ও বেপরোয়া গতিতে চালিয়ে মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ছয়জনের মৃত্যু ঘটায় ও পাঁচজনকে গুরুতর আহত করে। মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের ক্ষতি সাধন করায় চালকের বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ সনের ৯৮/১০৫ ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রতীয়মান হয়। মামলাটি পেনাল কোড ৩০২/৩৪ ধারায় তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার পক্ষে প্রাথমিকভাবে কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।”
আসামিদের কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ
বাসচালক নুর উদ্দিনের বিরুদ্ধে মেয়াদোত্তীর্ণ হালকা লাইসেন্স এবং জাল ও ভুয়া লাইসেন্স নিয়ে দ্রুত ও বেপরোয়া গতিতে বাস চালিয়ে দুর্ঘটনা সংঘটিত করে ছয়জনের মৃত্যু ঘটানো, পাঁচজনকে গুরুতর আহত ও প্রাইভেটকার আর মোটরসাইকেল ক্ষতির অভিযোগ করা হয়েছে।
বাস মালিক মোস্তফা রাঢ়ী ও তার ছেলে পারভেজ রাঢ়ীর বিরুদ্ধে মেয়াদোত্তীর্ণ ফিটনেস ও হালকা লাইসেন্সধারী চালককে দিয়ে ভারী গাড়ি চালানোর সহায়তার অভিযোগ করা হয়েছে।
আর বাস চালানোর ক্ষেত্রে ‘বেপারী পরিবহন’ ব্যানার ব্যবহারকারী ডাবলু বেপারীর (৪৭) বিরুদ্ধে বেপারী পরিবহন কর্তৃপক্ষ হিসেবে গাড়ি চালকের বিষয়ে যাচাই-বাছাই না করে এবং মহাসড়কে চলা মানুষের জানমালের নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে হালকা লাইসেন্সধারী চালককে দিয়ে ভারি গাড়ি চালানোতে সহায়তার মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ করা হয়েছে।
আসামি ডাবলু বেপারীকে নির্দোষ দাবি করে তার আইনজীবী নিহার হোসেন ফারুক বলেন, “প্রকৃত মালিককে না পেয়ে পুলিশ ডাবলু বেপারীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে। অনেকদিন জেল খেটে জামিন পেয়েছেন।
“তিনি কোনোভাবে দোষী না। গাড়ির প্রকৃত মালিক জোর করে চালককে দিয়ে গাড়ি নিয়ে বের হতে বলেছে। প্রকৃত মালিক এর জন্য দায়ী।”
মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করতে বাদীপক্ষের দাবির ব্যাপারে এ আইনজীবী বলেন, “কোনো গাড়ির চালকই চান না কেউ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাক। যান্ত্রিক ত্রুটি থাকার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।
“এখানে ইচ্ছাকৃতভাবে মারার কোনো ইনটেনশনই (অভিপ্রায়) ছিল না।”
আরও পড়ুন-
ধলেশ্বরী টোলপ্লাজায় দুর্ঘটনা: নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হাই