Published : 29 Jan 2026, 10:46 PM
জুলাই আন্দোলন চলাকালে এবং পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে ‘নয়া বন্দোবস্তের’ যে আলাপ তুলেছিল অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরা, তা কতদূর এগোলো?
আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত নেতা মাহফুজ আলম বলছেন, নয়া বন্দোবস্তের বিষয়টি বাকি তরুণদের কাছে ‘স্পষ্ট’ না করতে পারায় পুরোপুরি এটি বাস্তবায়ন করা যায়নি।
একইসঙ্গে এটা নিয়ে ‘মজা’ করা হয়েছে মন্তব্য করেন সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ বলেন, অনেক জায়গায় সংস্কারের চেষ্টা করা গেছে, অনেক জায়গায় পারা যায়নি।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট আয়োজিত এক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে।
তার আগে আগে রাজনীতিতে নতুন বন্দোবস্তের লক্ষ্য তুলে ধরেন গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে মাহফুজ আলমসহ তিন নেতা অন্তর্বর্তী সরকারে যোগ দেন।
সরকারের প্রায় দেড় বছরে নয়া বন্দোবস্তের কী হল? জবাবে মাহফুজ বলেন, “আমরা আসলে, যখন তেসরা আগস্টে (এক দফা ঘোষণার দিন) নিউ পলিটিক্যাল সেটেলমেন্টের কথা বলা হয়েছে, সো, ওই সময় তো আমরা চাচ্ছিলাম যে ব্যবস্থাটা, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থাটা, এটা বদলের বিষয়ে। এবং এটা শুধু হাসিনার পতনেই যাতে সীমাবদ্ধ না থাকে।”
শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির পতন নয়, তরুণদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী পুরো ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো সে সময়ের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তুলে ধরে তিনি বলেন, এর সঙ্গে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রশ্ন ছিল বা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন হওয়ায় বৈষম্যবিরোধী বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয় ছিল, যা স্পষ্ট করা যায়নি।
প্রথমে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে এবং পরে তথ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মাহফুজ আলম বলেন, “আমাদের যে অডিয়েন্স আছে, মানে এই অভ্যুত্থানের পক্ষে যারা অডিয়েন্স আছে, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের কাছে এটা স্পষ্ট করা যায়নি। দ্যাট ইজ ওয়ান। এটা হচ্ছে আজকের অবস্থার মূল কারণ।
“এবং এটা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা-সমালোচনাও, সমালোচনা হইছে অনেক যে নয়া বন্দোবস্ত, নতুন বন্দোবস্ত, এটা এখন একটা, সর্ট অব কি বলা যায়, মানে মানুষ এটাকে নিয়ে মজা করতেছে।”
তবে নয়া বন্দোবস্ত সে সময় সত্যিকারের স্বপ্ন ছিল তুলে ধরে তিনি বলেন, “এটাও হয়তো, অনেকগুলো কাজে এটার প্রতিফলন আছে।”
বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন ও তাদের সুপারিশকে নয়া বন্দোবস্তের ‘প্রতিফলন’ হিসেবে দেখছেন তিনি।
মাহফুজ বলেন, “এই যে কমিশনগুলো গঠন করা থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত আসা, এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াটা পুরোটাই আমি মনে করি যে এই অভ্যুত্থানের সাথে, অভ্যুত্থানের যে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, এটার সাথে যুক্ত।”
বাংলাদেশে অনেক আগে থেকে সংস্কার শুরু হয়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, আন্দোলনের যে বৈধতা এবং তার পথ ধরে বড় ধরনের, যেমন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় করা হয়েছে, তা কোনো রাজনৈতিক সরকার করতে পারবে না।
এরকম অনেকগুলো জায়গায় তারা চেষ্টা করতে পেরেছেন, আবার অনেকগুলো জায়গায় পারেননি, যেমন নারী বিষয়ক সংস্কারের বিষয়টি।
মাহফুজ আলম বলেন, “যেমন আরো কয়েকটা সংস্কারের বিষয়ে, যেমন স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের বিষয়টা আছে, স্থানীয় সরকার সংস্কারের বিষয়ে আছে।
“অনেকগুলো জায়গাতে আমরা হাত দিতে পারিনি। কিন্তু কিছু কিছু জায়গাতে আমরা কাজ করতে পারছি। যেমন মিডিয়াতে আমি নিজে দায়িত্বে ছিলাম, আমি ওইভাবে পারিনি কারণ মিডিয়া পুরাটা, সিস্টেমটাই এটা পুরাটা রি-শাফল করা দরকার।”
গেল ১০ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মাহফুজ আলম।
তার বক্তব্যে অথর্নীতি ও রাজনৈতিক বিভাজনের বিষয়টিও এসেছে।
সরকার কী করতে পারছে, তা বোঝাতে গিয়ে মাহফুজ আলম বলেন, “এর বাইরেও অর্থনৈতিক যে সংস্কার, এটা তো হচ্ছে। আমরা অর্থনীতিটা গত সরকার থেকে, এই সরকারের অংশ যখন আমি হচ্ছিলাম, সেই হিসেবে বলি, সরকার যেটা করছে সেটা হচ্ছে যে অর্থনীতিটাকে দাঁড় করায়ে রাখছে। জাস্ট ঠেক দিয়ে রাখছে।
“এটা যেকোনো দিন ফল করতে পারে। আমার বলা সাজে না, এখানে রেহমান সোবহান স্যার আছেন বা আরো অনেকেই আছেন, যারা এটা বুঝবেন। এটা আসলে ঠেক দিয়ে রাখা হইছে।”
কিছু ক্ষেত্রে আগের চেয়ে স্বচ্ছতা এসেছে, আগের চেয়ে বেশি কার্যকরিতা এসেছে, সে কারণে অথর্নীতি একটু দাঁড়িয়ে আছে বলে দাবি করেন তিনি।
অর্থনৈতিক সংস্কারের আরও যে জিনিসগুলো আছে, যেমন: ভূমি প্রশ্ন, সম্পদ বণ্টনের প্রশ্ন বা পাচার করা অর্থ ফেরত আনার বিষয়- এসব তুলে ধরে সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, “টাকা নিয়ে চলে গেছে, কিন্তু টাকা কি, টাকা ফেরত আনার প্রক্রিয়াটা, এটা অনেক জটিল প্রক্রিয়া। এটা আসলেই এভাবে আইনিভাবে সম্ভব কিনা, এটা নিয়ে অনেক তর্ক আছে।”
তিনি আওয়ামী লীগেরও ‘রিকন্সিয়েলিশন’ চান বলে তুলে ধরেন।
সেক্ষেত্রে যারা অপরাধ করেনি সে অর্থে তাদের ভারত থেকে ‘উস্কানি’ না দিয়ে, ক্ষমা চেয়ে এবং পরবর্তীতে আর আগের মতো অবস্থা তৈরি করবে না, এমন নিশ্চয়তা দিয়ে রাজনীতিতে আসার আহ্বান জানান মাহফুজ।
সম্মেলনের এ পর্বে আলোচক ছিলেন অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান ও ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক নাওমি হোসাইন।