Published : 30 Jun 2026, 05:15 PM
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেট নিয়ে বিরোধী দল ও অন্য সংসদ সদস্যদের বিরোধিতার জবাব দিতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন, এ প্রস্তাব পাস হলে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো বন্ধ করে দিতে হবে এবং লাল-সবুজের পতাকা নামিয়ে ফেলতে হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পাসের প্রক্রিয়ায় মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত ১৬ নম্বর মঞ্জুরি দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাবের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায়, “ছাঁটাই প্রস্তাব অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত ১৬ নম্বর ‘দাবি হ্রাস করে ১ টাকায় নামিয়ে’ আনা হলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের দূতাবাসগুলো বন্ধ করে দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক লাল-সবুজের পতাকা নামিয়ে ফেলতে হবে।”
এতে প্রবাসীদের সেবা বন্ধ হয়ে যাবে এবং জাতিসংঘে চাঁদা দেওয়া সম্ভব হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
খলিলুর বলেন, চাঁদা দিতে না পারলে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ স্থগিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সংসদ অধিবেশনে ‘দাবির পরিমাণ হ্রাস করিয়া ১ টাকা করা হউক’ এমন এক ছাঁটাই প্রস্তাব, যার মাধ্যমে কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সামগ্রিক নীতি ও কার্যক্রমের প্রতি অনাস্থা বা দ্বিমত প্রকাশ করা হয়। সরকারের নির্দিষ্ট খাতের বাজেটের সঙ্গে দ্বিমত হওয়ার বিষয়টি এর মাধ্যমে জনগণের সামনে তুলে ধরে থাকে বিরোধী দল।
এর আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য ১ হাজার ৮৪৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা মঞ্জুরির প্রস্তাব করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে চলা বৈঠকে জানানো হয়, এই দাবির ওপর ২৬ জন সংসদ সদস্য ছাঁটাই প্রস্তাব দিয়েছেন। তাদের মধ্যে সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলাম, রংপুর-১ আসনের রায়হান সিরাজী, চট্টগ্রাম-১৬ আসনের মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম এবং চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের মাসুদ পারভেজ বক্তব্য দেন।
জি এম নজরুল ইসলাম বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়। দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং বিদেশে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরতে এ মন্ত্রণালয়ের কার্যকর ভূমিকা থাকা দরকার।
রায়হান সিরাজী ছাঁটাই প্রস্তাবের জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। আগামী একনেক বৈঠকে এ প্রকল্প তুলে ধরে বরাদ্দ অনুমোদন করা হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষ খুশি হবে।
জহিরুল ইসলাম মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রেমিটেন্স যোদ্ধা মধ্যপ্রাচ্যে। কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে তারা নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন।
আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মী পরিবর্তন, কফিল পরিবর্তন, ভিসা ও জরিমানার সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এসব বিষয়ে আরও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান।
মাসুদ পারভেজ বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কার্যকর অগ্রগতি না হওয়া, সীমান্ত দিয়ে মাদক ও অবৈধ অনুপ্রবেশ, বিদেশে শ্রমিকদের বিপদ এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’
ছাঁটাই প্রস্তাবের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিবর্তনশীল ও জটিল বিশ্ব ব্যবস্থায় একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা অনেকাংশে দূরদর্শী ও সক্রিয় কূটনীতির ওপর নির্ভর করে।
তিনি বলেন, “আমাদের কূটনীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে সবার আগে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ফার্স্ট।”
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে এই নীতির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
খলিলুর বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জনগণের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েই এ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত ১ হাজার ৮৪৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা কোনো সাধারণ ব্যয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্ত করার কৌশলগত বিনিয়োগ বলে মন্তব্য করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত বাজেট দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম।
খলিলুর রহমানের হিসাবে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেট প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের প্রায় দ্বিগুণ।
তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেট ছিল ১ হাজার ৭৬৪ কোটি ৩৮ লাখ ৯২ হাজার টাকা। এর মধ্যে পরিচালন বাজেট ছিল ১ হাজার ৫৪২ কোটি ৪০ লাখ ৫১ হাজার টাকা এবং উন্নয়ন বাজেট ছিল ২২১ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেট প্রাক্কলন করা হয়েছে ১ হাজার ৮৪৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে পরিচালন বাজেট ১ হাজার ৬১০ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন বাজেট ২৩৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
গত বছরের তুলনায় এ বরাদ্দ ৪ দশমিক ৫৩৬ শতাংশ বেশি বলে জানান তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেটের বড় অংশ বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোর কার্যক্রম চালাতে ব্যয় হয়। টাকার বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ওঠানামার কারণে প্রকৃত ব্যয় বৃদ্ধির হার আরও কম হতে পারে।
তিনি জানান, মালয়েশিয়ার জোহর বাহরু, যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান রাজ্যের ডেট্রয়েট, আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস এবং আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে নতুন মিশন খোলা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে এই চারটি মিশনের কার্যক্রম শুরু করতে ৩০ কোটি ৩৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
রোহিঙ্গা গণহত্যা সংক্রান্ত মামলায় ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ইসলামিক সম্মেলন সংস্থার পক্ষে গাম্বিয়ার করা মামলা পরিচালনার জন্য ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মন্ত্রণালয়ের চারটি ইউনিট ও বিদ্যমান ৮৩টি মিশনের পরিচালন ব্যয় মেটাতে ২১ কোটি ১৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
উন্নয়ন বাজেটে পাঁচটি প্রকল্পের জন্য ২৩৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বার্লিন, জেদ্দা, ক্যানবেরা ও কায়রোতে বাংলাদেশ চ্যান্সারি কমপ্লেক্স বা ভবন নির্মাণ প্রকল্প রয়েছে।
পরে ডেপুটি স্পিকার ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো ভোটে দেন। কণ্ঠভোটে সেগুলো নাকচ হয়।
এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খাতে ১ হাজার ৮৪৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা মঞ্জুরির প্রস্তাব কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়।