Published : 11 May 2026, 03:45 PM
বিভিন্ন ‘বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে’ সম্পৃক্ততা নিয়ে সমালোচনা করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী।
শনিবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, “আমি জানি আমাদের এখানে গোয়েন্দা বিভাগের লোক আছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও এ কথাটা আমাকে বলতেই হবে। বাংলাদেশ আজকে যেখানে দাঁড়িয়েছে, এটার জন্য ৭০ ভাগ দায়ী হল বাংলাদেশের আর্মি এবং ব্যুরোক্রেসি।
“বাংলাদেশের আর্মি এখন আমাদের একটা গোদের উপর বিষফোঁড়া হয় না, গোদের ওপর বিষফোঁড়া। আপনার তাদের বাজেট কত যায় আমরা জানি না। যখন বাজেট দেওয়া হয় পার্লামেন্টে, তাদের বাজেট কিন্তু সিক্রেট। সেই বাজেট আমরা জানি না।”
শনিবার বিকালে রাজধানীর পান্থপথে সেল সেন্টার অডিটোরিয়ামে ‘দুর্নীতি বিরোধী জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কথা বলছিলেন দিলারা চৌধুরী।
পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে’ এ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা নীতির সমালোচনা করে অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, “আপনার শত্রু কে? আপনি যে প্রতিরক্ষা করছেন—প্লেন কিনছেন, ট্যাংক কিনছেন, অমুক কিনছেন—তো আমার শত্রুটা কে? এটাকে তো আইডেন্টিফাই করতে হয় সবার আগে।
“আপনি কার সঙ্গে যুদ্ধ করবেন—যে জন্য আপনি এই সমস্ত কিনছেন? কে আমাদের শত্রু? কোনো রকম ক্লিয়ার কাট এরকম কোনো ডিফেন্স পলিসি নাই।”
‘বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে’ সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততার সমালোচনা করে তিনি বলেন, “একটি কাজেই বাংলাদেশের আর্মি খুব অভ্যস্ত। এখন বর্তমানে তো বাংলাদেশের আর্মি সবচাইতে বড় পার্টনার— পিপিপি যেটাকে বলে, ‘পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ’; এটার সবচাইতে বড় পার্টনার হলো আর্মি। আপনি কোনো বড় কন্ট্রাক্ট দেখাতে পারবেন না—যেখানে আর্মির ইনভলভমেন্ট নাই।
“যুদ্ধ কিন্তু করে না কোনো জায়গায়। এই যে মিয়ানমার থেকে আপনার নাফ নদী ক্রস করে মিয়ানমারের প্লেন যখন-তখন আমাদের আকাশে উড়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে আবার ইয়েও ফেলে যায়, আপনার ওটাকে কী কী জানি বলে... হ্যাঁ, ড্রোন ফেলে চলে যায়। কিচ্ছু বলে না। ক্ষমতাই নাই কিছু করার।
“কিন্তু প্রত্যেকটা বিজনেসে তারা আছে। তারা ফার্নিচার বানায়, তারা মিষ্টি বানায়, তাদের গ্যাস স্টেশন আছে, তাদের হসপিটাল আছে, তাদের ইউনিভার্সিটি আছে, তাদের কী নাই? অনলাইন বিজনেস আছে।”
সেনাবাহিনী মিষ্টির ব্যবসার সঙ্গেও সম্পৃক্ত হয়েছে দাবি করে অধ্যাপক দিলারা বলেন, “আবার এক ভাই থাকে ডিওএইচএস-এ, আর্মির লোক না; ভাড়া থাকে মিরপুরে। তো ওর বাসায় খেতে গেছি একদিন, মিষ্টি খেতে দিয়েছে আমাকে। আমি বললাম, ‘মিষ্টি তো খুব ভালো, কোত্থেকে কিনছিস?’
“বলল, ‘ওই যে আমাদের আর্মি ক্যাম্প আছে ওইখানে, জওয়ানরা মিষ্টি বানায়; মিষ্টি বানিয়ে বিক্রি করে’। পৃথিবীতে কোনোদিন শুনি নাই আমি যে, আর্মি আপনার মিষ্টি বানিয়ে বাজারে বিক্রি করে!”
সামরিক সক্ষমতা অর্জন করার কারণে ইরান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে ‘বুক ফুলিয়ে’ দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী।
তার ভাষায়, “আপনার ইরান যে আজকে আমেরিকার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বুক ফুলিয়ে, কারণ তাদের কাছে ড্রোন-মিসাইল আছে। এবং পঁচিশ বছরের প্রিপারেশন তারা নিয়েছে। তারা জানত যে, একদিন ইসরায়েল আর আমেরিকা আমাদেরকে আক্রমণ করবে।
“সেই জন্য তারা পঁচিশ বছর ধরে প্রিপারেশন নিয়েছে এবং পৃথিবীর সবচাইতে শক্তিশালী রাষ্ট্রকে বুক ফুলিয়ে বলতেছে, ‘আসো, আসলে পরে তোমাদের একজনও ফেরত যেতে পারবে না’। এইটা হলো দেশপ্রেম। এই দেশপ্রেম না থাকলে কোনোদিন কোনো জাতি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না।”
অধ্যাপক দিলারার মন্তব্যের বিষয়ে সেনাবাহিনীর প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
‘বিএনপিকে জিতিয়ে দেওয়া হয়েছে’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছরের মাথায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি যে নির্বাচন হয়েছে, সেই ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ‘ম্যানেজড ইলেকশন’ বলছেন রাজনীতির বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী।
তার কথায়, “আমরা আশা করেছিলাম যে, এটা অন্তত ফ্রি, ফেয়ার এবং ক্রেডিবল ইলেকশন হবে; তাও হল না। এই ইলেকশনটা কিন্তু ম্যানেজড ইলেকশন। এখানে বিএনপিকে জিতিয়ে দেওয়া হয়েছে।
“তো জিতিয়ে দিয়েছে ভালো কথা, কিন্তু আমার কাছে কষ্ট লাগে যারা এই কাণ্ডগুলি করেছে তারা আমার পরিচিত। যেমন রিজওয়ানা, রিজওয়ানার সঙ্গে অনেকদিন কাজ করেছি। আমি রিজওয়ানাকে জিজ্ঞাসা করলাম যে তুমি যে ইন্টারভিউতে এই কথাটা বললে…আপা, উগ্রবাদীরা আসত’।
“আমি বললাম, ‘উগ্রবাদীরা তো সরকার গঠন করতে পারত না’। ধরো জামায়াত ধরে নিলাম উগ্রবাদী, ৩০টা সিট বেশি পেত। কিন্তু সেটা একটা ঝুলন্ত সংসদ হতো। তুমি যে এদেরকে টু-থার্ড মেজোরিটি দিলে, এরা তো যা খুশি তাই করবে।”

সরকার ও রাজনীতি বিশেষজ্ঞ দিলারা চৌধুরী বলেন, “টু-থার্ড মেজোরিটি একটা কার্স (অভিশাপ) ফর আ পার্লামেন্ট; দ্যাট পার্লামেন্ট বিকামস ডিসফাংশনাল। অলরেডি এটা ডিসফাংশনাল। কারণ আমি যা খুশি তাই করব।
“অপজিশন কী করবে? ওয়াক আউট করবে, করো গিয়ে। অপজিশন একটা বিলে কী করবে? নোট অব ডিসেন্ট দেবে, দিক গিয়া; আসে যায় কী? আমি পাস করে নেব।”
তিনি বলেন, “টু-থার্ড মেজোরিটি ইজ এ কার্স ফর অ্যানি পার্লামেন্ট এবং এই পার্লামেন্টটা ডিসফাংশনাল হতে বাধ্য। আমি মনে করি, এই পার্লামেন্টটা অলরেডি ইজ ইন দ্য রং ফুটিং এবং এটা ডিসফাংশনাল হতে বাধ্য। কারণ এটা স্বেচ্ছাচারী হয়ে যাবে। এই স্বেচ্ছাচারী মানে হলো আপনার একটা সংসদীয় স্বৈরাচার।
“এবং সংসদীয় স্বৈরাচার থেকেই কিন্তু শেখ হাসিনার জন্ম হয়েছে, মনে রাইখেন। সে প্রথমে স্বৈরাচার ছিল, তারপরে সবাই মিলে–সে যা করত, তাই মেনে নিল। তেলবাজি—এই সমস্ত করতে করতে সে ফ্যাসিস্ট হয়ে গেল।”
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ‘একা একা ফ্যাসিস্ট হয়নি’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “শেখ হাসিনাকে সবাই মিলে ফ্যাসিস্ট করেছে। ওর একার দোষ না, সবাই মিলে করেছে–আর্মি, ব্যুরোক্রেসি, টিচার সবাই মিলে তাকে... জার্নালিস্ট, সবাই মিলে তাকে ‘আপনি যা বলছেন ঠিক, ‘আপনি যা বলছেন ঠিক’ …এভাবে আমাদের রাষ্ট্র একটা ভঙ্গুর অবস্থায় এসে পৌঁছেছে।”
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, “চব্বিশের এই অভ্যুত্থানের ফলে আমরা আশা করেছিলাম যে, এখানে একটা গণভোটের ভিত্তিতে একটা নতুন সংবিধান আসবে। জুলাই সনদ—সেটাকেও এখন ডাইলুট (দুর্বল) করে দিচ্ছে।
“তার রেজাল্টটা কী হবে? আপনারা একটা দুর্বল সরকার…কারণ যে সরকারে জনগণের সমর্থন নাই, খালি ইলেকশনের দ্বারাই তো হয় না। আপনি যখন প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেন, তখন কিন্তু মানুষ আপনার কাছ থেকে আপনার প্রতি তার যে সমর্থন, সেটা উইথড্র করে নেয়। তখন আপনাকে আর সাপোর্ট করে না। মনে মনে অন্তত সাপোর্টটা সরিয়ে নেয়।”
দিলারা চৌধুরীর মন্তব্যের বিষয়ে কথা বলতে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া মেলেনি।
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আসাদের সহোদর এ এম নুরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন দুর্নীতি বিরোধী জাতীয় সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও মুখপাত্র সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সাজু।