Published : 19 Jun 2026, 10:13 PM
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নামে একটি বিদ্যালয়ের নামকরণের প্রস্তাব করা নিয়ে আলোচনার মধ্যে তিনি দাবি করেছেন, প্রস্তাব করার আগেই তিনি আধা-সরকারি চাহিদাপত্র (ডিও লেটার) দিয়েছে, যাতে তার নামে বিদ্যালয়ের নাম রাখা না হয়।
শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন নামকরণ হতে পারে ‘শিবগঞ্জ মীর শাহে আলম পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’, এ প্রস্তাবটি দিয়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ (বেসরকারি মাধ্যমিক শাখা-১) গত ৯ জুন রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বগুড়া জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো চিঠিতে নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও মতামত দিতে নির্দেশ দেয়।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নির্বাচনি এলাকায় বগুড়া-২ আসনে চারটি নতুন ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে আলোচনা ও বিতর্কের মধ্যেই বিদ্যালয়ের নামকরণের প্রস্তাবের বিষয়টি সামনে আসে।
এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে গত ১ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে একটি আধা-সরকারিপত্র পাঠিয়েছেন বলে দাবি করেছেন মীর শাহে আলম।
শুক্রবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি নিজেদের উদ্যোগে ও স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে তার নামে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রস্তাব পাঠাচ্ছেন, যা তার কাছে ‘অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত’।
“শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, পরিচিতি ও স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখাই অধিকতর সমীচীন।”
আধা-সরকারি চাহিদাপত্রে তিনি বলেছেন, শিবগঞ্জ–মোকামতলা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে জমি দান, নিজ অর্থে জমি ক্রয়, প্রতিষ্ঠাকালীন ব্যয় বহন ও সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তারে কাজ করে আসছেন।
তার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ১৯৯৭ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত বা উন্নয়ন করা হয়েছে দাবি করেন প্রতিমন্ত্রী।
এসব প্রতিষ্ঠানের ফিরিস্তিও দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে—মীরবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৯৯৭), বেতগাড়ি মীরবাড়ী সরকারি এতিমখানা (২০০৪), বেতগাড়ি মীর শাহে আলম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (২০০১), বেতগাড়ি মীর শাহে আলম কারিগরি স্কুল অ্যান্ড বিএম মহাবিদ্যালয় (২০০৪), তিয়াইল মীর লাবনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (২০১২), বেতগাড়ি মীর শাহে আলম মৎস্য ও কৃষি প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট (২০১৩), বেতগাড়ি মীর মাহাতাব-শাহে আলম মহিলা দাখিল মাদ্রাসা (২০২৩), মোকামতলা মীর শাহে আলম-ছাত্তার তালুকদার মহাবিদ্যালয় (২০২৩), কিচক মীর শাহে আলম কলেজ (২০২৩) ও বেতগাড়ি মীর শাহে আলম ভেটেরিনারি ইনস্টিটিউট (২০২৫)।
পত্রের শেষাংশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে তার বা তার পরিবারের সদস্যদের নামে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রস্তাব যেন গ্রহণ বা অনুমোদন না করা হয়। একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পূর্বের নাম ও পরিচিতি সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
পত্রের অনুলিপি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, রাজশাহী; বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর পাঠানোর কথাও লেখা রয়েছে সেখানে।
প্রতিমন্ত্রীর আধা-সরকারিপত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শুক্রবার দিন, আমি তো এখন বাইরে। অফিসে না গেলে তো বলতে পারবো না। তবে আপনি যেহেতু ফোন করছেন, স্যার না চাইলে বাতিল করে দিব, অসুবিধা কি আছে।
“তবে কেউ যদি নামকরণের প্রস্তাব দেয়, এটা তো প্রস্তাব আসতেই পারে। আর না চাইলে বাতিল করে দিব। আমি কালকে অফিসে যাব ইনশাআল্লাহ। জিনিসটা দেখে আপনাকে ‘কারেক্ট নিউজটা’ বলতে পারবো। আর মন্ত্রী মহোদয়ের নামে যদি কোনো প্রস্তাব আগে এসে থাকে, আর উনি পরে না করে থাকেন, ঠিক আছে, বাতিল করে দিব। ওটা সমস্যা না।”
বগুড়া-২ আসনের অন্তর্ভুক্ত শিবগঞ্জ উপজেলা ভেঙে মোকামতলা নামে নতুন একটি উপজেলা গঠন করা হয়। একই সঙ্গে নতুন চারটি ইউনিয়ন গঠন করা হয়। ইউনিয়ন চারটির নাম মীরবাড়ী, সীমান্ত, দিগন্ত ও স্বর্ণগ্রাম।
সরকারি গেজেটে এসব নাম প্রকাশের পরপরই এলাকাজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। কারণ স্থানীয়দের একটি বড় অংশের দাবি, মীরবাড়ী নামটি প্রতিমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সীমান্ত ও দিগন্ত নাম দুটি তার দুই সন্তানের নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
বিষয়টি দ্রুত রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নেয়। সংসদেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে; তবে ওই আলোচনায় এটা আসেনি যে প্রতিমন্ত্রীর এক ভাতিজির নাম ‘স্বর্ণালী’, আর নতুন চারটি ইউনিয়নের আরেকটির নাম ‘স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন’।
জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে বিরোধী দলের এক সংসদ সদস্য প্রশ্ন তোলেন এ নিয়ে। তিনি বলেন, যখন আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির নামে ইউনিয়নের নামকরণ করা যায় না, তখন কীভাবে এমন নাম অনুমোদন পেল?
এর জবাবে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সংসদে বলেন, “ইউনিয়নগুলোর নাম তার সন্তানদের নামে রাখা হয়নি।”
তিনি দাবি করেন, স্থানীয় বাস্তবতা এবং প্রশাসনিক যাচাইয়ের ভিত্তিতেই নাম নির্ধারণ করা হয়েছে। সীমান্ত ইউনিয়নের ক্ষেত্রে তিনি যুক্তি দেন যে এলাকাটি সীমান্তবর্তী হওয়ায় এমন নামকরণ হয়েছে।
একইভাবে দিগন্ত নামটিও ভৌগোলিক বাস্তবতার আলোকে নির্ধারণ করা হয়েছে বলে তিনি ব্যাখ্যা দেন।