Published : 20 Jun 2026, 03:39 PM
স্পেন কিংবা বেলজিয়ামের হয়েও খেলার সুযোগ ছিল ইসমায়েল সাইবারির। কিন্তু তিনি বেছে নেন মরক্কোকে। চলতি বিশ্বকাপের আগে যিনি কখনও স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেননি, বিশ্ব মঞ্চে তাকে দেখা যাচ্ছে সেই ভূমিকায়। সুযোগটি কাজে লাগিয়ে, নতুন দায়িত্বে দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছেন সাইবারি। তার কাঁধে ভর করেই এবারের বিশ্বকাপে বহুদূর যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে মরক্কো।
উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত দুটি ম্যাচ খেলেছে মরক্কো। ব্রাজিলের বিপক্ষে ১-১ ড্র করেছে তারা। আর শনিবার বাংলাদেশ সময় ভোরে স্কটল্যান্ডকে হারিয়েছে ১-০ গোলে। দুই ম্যাচে দলের দুটি গোলই করেছেন ২৫ বছর বয়সী সাইবারি।
‘সি’ গ্রুপের পয়েন্ট টেবিলে এখন ৪ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে মরক্কো। সমান পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে ব্রাজিল।
গ্রুপ পর্বে মরক্কোর শেষ ম্যাচ আবার হাইতির বিপক্ষে। এই গ্রুপের ‘সবচেয়ে দুর্বল’ দলের বিপক্ষে তাদের জয় পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সবকিছু ঠিকঠাক মতো এগোলে, মরক্কোর পরের ধাপে খেলা একরকম নিশ্চিত।
এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত মরক্কোর এই সফলতার কারিগর সাইবারি। ব্রাজিলের বিপক্ষে শুরুতেই দারুণ ফিনিশিংয়ে দলকে এগিয়ে নেন তিনি। আর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জালের দেখা পান স্রেফ ৭১ সেকেন্ডে। বিশ্বকাপে নিজের প্রথম দুই ম্যাচে গোল করা আফ্রিকার দ্বিতীয় খেলোয়াড় তিনি। এই কীর্তি আছে মিশরের মোহামেদ সালাহর।
২০২৩ সালে মরক্কোর হয়ে সিনিয়র ফুটবলে অভিষিক্ত সাইবারির এই উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান কোচ মোহামেদ ওয়াহবির। চার বছর আগের কাতার বিশ্বকাপে আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে মরক্কোকে সেমি-ফাইনালে তোলা কোচ ওয়ালিদ রেগরাগি প্লে-মেকার ও উইঙ্গারের ভূমিকায় খেলাতেন সাইবারিকে। ওয়াহবি এসে এই ফুটবলারকে ভিন্নভাবে কাজে লাগান।
গতির পাশাপাশি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকে যাওয়ার যে সামর্থ্য রয়েছে সাইবারির, তা চোখে পড়ে ওয়াহবির। বিশ্বকাপে তাই তাকে মূল স্ট্রাইকারের ভূমিকায় খেলাচ্ছেন তিনি। কোচের আস্থার প্রতিদানও দিয়ে যাচ্ছেন সাইবারি।
বিশ্বকাপের আগে নেদারল্যান্ডসের ক্লাব পিএসভি আইন্দহোভেনের হয়ে দারুণ সময় কাটে সাইবারির। গত মৌসুমে ডাচ লিগের বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন তিনি। তবে জাতীয় দলে সেভাবে নিজেকে মেলে ধরতে পারছিলেন না। প্রথম ২৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোল করতে পেরেছিলেন মাত্র ৭টি। দারুণ ছন্দে থাকা এই খেলোয়াড় শেষ ৪ ম্যাচেই জালের দেখা পেয়ে গেলেন ৪ বার!
পিএসভির হয়ে ডাচ লিগে অভিষেক মৌসুমটা অবশ্য একদমই ভালো কাটেনি সাইবারির। ২০২২-২৩ মৌসুমে চোটের কারণে খেলতে পেরেছিলেন কেবল ১৭টি ম্যাচ। সেই অভিজ্ঞতা তাকে গোলপোস্টের সামনে আরও শান্ত ও সংযত হতে সাহায্য করেছে।
২০২৩ সালে পিএসভির ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাইবারি বলেছিলেন, “শুরুর দিকে আমি ভাবতাম, ‘আমার (গোল করার) সুযোগ হাতছাড়া করাই যাবে না।’ আর এখন আমি ভাবি, ‘আমি গোল করব’।”
সময়ের সঙ্গে ফুটবলীয় দক্ষতা বাড়ার পাশাপাশি মানসিকভাবেও নিজের উন্নতি করেছেন সাইবারি। তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে পরিসংখ্যানেও। গত মৌসুমে ২৭ ম্যাচে ১৫টি গোল করে পিএসভিকে টানা তৃতীয়বারের মতো ডাচ লিগের শিরোপা জেতাতে সাহায্য করেন তিনি।
সাইবারির ক্যারিয়ারের বড় অংশই কেটেছে নতুন নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে। স্পেনের তেরাসায় জন্ম তার। ছয় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে পাড়ি জমান বেলজিয়ামে। সেখানে স্থানীয় ক্লাবগুলোর হয়ে খেলার পর ২০১৩ সালে যোগ দেন আন্ডারলেখটের একাডেমিতে।
সেই অধ্যায় অবশ্য বেশি দীর্ঘ হয়নি তার। মাত্র দুই বছর কাটানোর পর; নতুন মৌসুম শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে ফর্মের ঘাটতির কারণে ক্লাব তাকে ছেড়ে দেয়। তবে এই ধাক্কাটি তার ক্যারিয়ার গঠনে বেশ সাহায্য করেছিল।
পরবর্তীতে একসময় তিনি বলেছিলেন, “এটি আমাকে আরও কঠোর পরিশ্রম করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।”
জন্মসূত্রে স্পেন, নাগরিকত্ব থাকায় বেলজিয়ামের হয়ে খেলার সুযোগ ছিল সাইবারির। কিন্তু পারিবারিক সূত্র থাকা মরক্কোর হয়ে খেলার পথই বেছে নেন তিনি। ‘আটলাস লায়ন্স’ নামে পরিচিত এই দলটি ছাড়া অন্য কোনো দেশের হয়ে খেলার কথা কখনোই ভাবেননি সাইবারি। তার মতে, কোনো জাতীয় দলের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত মনে থেকে নেওয়ার উচিত।
“যখন আপনি কোনো জাতীয় দল বেছে নেবেন, সেটা মন থেকে আসা উচিত। কোনো কৌশলগত হিসাব-নিকাশ থেকে নেওয়া উচিত নয় যে, কোথায় খেললে বেশি সুযোগ পাওয়া যাবে।”
“আপনি পুরো একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাই আপনাকে হৃদয় দিয়ে খেলতে হবে।”
বেলজিয়ামের সাবেক কোচ রবের্তো মার্তিনেস, যার কোচিংয়ে এখন বিশ্বকাপে খেলছে পর্তুগাল, তিনি সাইবারিকে বেলজিয়ামের হয়ে খেলানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মরক্কোর প্রতি নিজেদের দায়বদ্ধতা নিয়ে কখনো দ্বিধায় ছিলেন না সাইবারি।
২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর ঐতিহাসিক সেই যাত্রার সঙ্গী ছিলেন না সাইবারি। এবার তেমন কিছুর পুনরাবৃত্তির স্বপ্ন দেখছেন তিনি। দলের ভেতরের দৃঢ় বন্ধনই তাকে সেই স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
“আমাদের সবার লক্ষ্য এক, স্বপ্নও এক। এমনকি মাঠের বাইরেও আমরা একসাথে হাসি, গল্প করি এবং একসঙ্গে কাজ করি। আমরা ঠিক একটি পরিবারের মতো।”