Published : 29 Apr 2026, 01:24 AM
ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের প্রভাবে পানি বাড়তে থাকায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও নেত্রকোণা জেলার নদ-নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যার আভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
সুনামগঞ্জের মধ্যনগরে বাঁধ ভেঙে এক হাওরে ফসল ক্ষতির মুখে পড়ার খবরও এসেছে।

বন্যার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় মঙ্গলবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উদ্যোগে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে সমন্বয় করে বন্যা নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার কথাও বলেছে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বাজেট ও অডিট, দুর্যোগ পূর্বাভাস, সাড়াদান ও সমন্বয় অনুবিভাগ) নুরুন আখতার ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসকদের চাহিদা অনুযায়ী সিলেট ও ময়মনসিংহে বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “অন্যান্য জেলা প্রশাসকের সাথেও বলা আছে যে, যখনই যা প্রয়োজন হবে, তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। আমাদের ইউনিট রেডি রেখেছি যেন তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছাতে পারি।”
মৌলভীবাজারে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তানভীর হোসেন বলেছেন তারা সোমবারই জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা করেছেন। সেখানে সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জেলার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মকর্তা ও দপ্তরকে বার্তা দেওয়া হয়েছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যটা আমাদের কাছে আছে। পানির উচ্চতা, নাব্যের তথ্য সংগ্রহ করছি।
“বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে যে কৃষি বা বোরো ধান তারপরে আরও আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো যাতে ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যায়, মাঠ পর্যায়ে যাতে সকলে কাজ করে, সেই অনুযায়ী কাজ চলমান আছে।”
তিনি বলেন, “যেকোনো বিষয় বিশেষ করে বিদ্যুৎ বা ঝড়ে গাছ পড়ে যাওয়া এই নিউজগুলো আসতেছে আবার তারা তাৎক্ষণিক সমাধান করতেছে। তদারকি কার্যক্রম চলমান আছে এবং প্রয়োজনীয় সকলেই সতর্ক করা আছে।”
কী পরিমাণ ধান কাটা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রধানত দুই উপজেলা বড়লেখা ও জুড়ীর ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা, যার প্রায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি ধান কাটা হয়েছে।
কোন জেলায় কী পরিস্থিতি?
নেত্রকোণার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জেলা কৃষি অফিসের বরাতে বলেন, ইতোমধ্যে নেত্রকোণার হাওর অঞ্চলের ৬২ শতাংশের বেশি ধান কাটা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় ইউএনওদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা করে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাঈদা পারভীন বন্যার প্রস্তুতি ও উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত থাকার তথ্য দিয়ে বলেন, বুধবার জেলার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা করে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালানো হবে।
সোমবার পর্যন্ত হাওরের ৭৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে এবং হাওর ও হাওর এলাকার বাইরে মিলিয়ে এ হার ৫০ শতাংশের কাছাকাছি বলে জানান তিনি।
বন্যা নিয়ে সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ইউএনও ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে মাইকিং এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
“বিশেষ করে ফসলগুলো যাতে রক্ষা করা যায় এবং ৮০ শতাংশের উপরে যেসব ধান পেকে গিয়েছে, সেগুলো যাতে তারা অতি দ্রুত কর্তন করে ফেলে।”
তিনি বলেন, “ধান কাটা চলমান আছে। তবে এখন শ্রমিক সংকট আর পানির কারণে হারভেস্টার অনেক হাওরে নামানো যাচ্ছে না। এই কারণে একটু গতি কম। তবে চেষ্টা করে যাচ্ছি।”
এই জেলার হাওরাঞ্চলে গড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ ধান কাটা হওয়ার কথা বলেন তিনি। হাওরের বাইরে গড়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশের মতো ধান কাটা হয়েছে বলে তথ্য দিয়েছেন তিনি।
দুই জেলায় পানি বিপৎসীমার উপরে

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় মৌলভীবাজার জেলার মনু নদী মৌলভীবাজার পয়েন্টে প্রাকমৌসুমী বিপৎসীমার ১১০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
অপরদিকে নেত্রকোনা জেলার ভুগাই-কংস নদী জারিয়াঝাঞ্জাইল পয়েন্টে প্রাকমৌসুমী বিপৎসীমার ২৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
কেন্দ্রীয়ভাবে বন্যা পরিস্থিতি তদারকির জন্য নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মাধ্যমে বন্যা পর্যবেক্ষণ ও তথ্য-উপাত্ত পাউবোর মাঠ পর্যায়ের দপ্তরগুলো হতে সংগ্রহ করা এবং প্রচার করা হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মোবাইল নম্বরগুলো হল- ০১৩১৮২৩৪৯৬২, ০১৩২১১৩৯৫৪২, ০১৩১৮২৩৪৯৬৩, ০১৭০৯৬৫৪৭৯১ এবং ই-মেইল [email protected], [email protected]
নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনজুর রহমান রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখন পর্যন্ত দুটি পয়েন্টেই বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। রাতে যেহেতু মাপা যায় না, বেড়েছে কিনা সেটি সকালের বুলেটিনে জানানো হবে।”
তিনি বলেন, “২৩ তারিখেই বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছি। ২৪ ও ২৫ তারিখ থেকে টিভিতেও টিকার দেওয়া শুরু হয়েছে। এখন যেহেতু প্রায় বন্যা পরিস্থিতি হয়ে এসেছে, তাই এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে।”
জেলায় জেলায় ভারি বৃষ্টি, ভোগান্তি
এদিন সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ভোলায় দেশের সর্বোচ্চ ১৫২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়ার তথ্য দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
এসময়ে আরও কয়েকটি জেলায় ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর মধ্যে ফেনীতে ১৫১ মিলিমিটার, সিলেটের শ্রীমঙ্গলে ১৪৬, কুমিল্লায় ১০৩, পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় ৯৬, কিশোরগঞ্জের নিকলিতে ৯৫, সিলেটে ৯২, আমবাগানে ৯১ ও পটুয়াখালীতে ৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
এছাড়া দেশের আরও অনেক স্থানে কম-বেশি বৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রামে ৩ ঘণ্টায় ৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এতে ডুবে গেছে নগরীর বিভিন্ন স্থান। কুমিল্লা, ফেনীসহ বিভিন্ন জেলায় অস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন জেলার বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষ।
হঠাৎ এমন বৃষ্টিপাতের কারণ কী জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলনে, “বৃষ্টিটা তো মূলত কালবৈশাখীর মৌসুম, এখানে পশ্চিমা লঘুচাপ যেটা ওয়েস্ট বেঙ্গলে আছে, এটা স্ট্রং আছে। যার কারণে কালবৈশাখীর পরিমাণটা বেশি হচ্ছে। আর আগামী ৩-৪ তারিখ (মে) পর্যন্ত এর পরিমাণটা একটু বেশি থাকবে। তারপরও থাকবে, তবে পরিমাণে কমে আসবে।”
আবহাওয়া অধিদপ্তরের মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
সেই সঙ্গে ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণ হতে পারে। এই সময়ে দেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে।
এদিকে রাজধানীসহ দেশের আট বিভাগেই বিদ্যুৎ চমকানোসহ কালবৈশাখী ঝড়ের আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
একই সঙ্গে আগামী চার দিন দেশের কোথাও কোথাও অতিভারি বর্ষণ হতে পারে; যার ফলে চট্টগ্রাম বিভাগে পাহাড় ধসের আশঙ্কাও রয়েছে।
এদিন কালবৈশাখী ঝড় ও ভারি বৃষ্টিপাত নিয়ে পৃথক দুটি বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

কালবৈশাখী ঝড়ের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, এদিন বেলা ১১টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের ওপর দিয়ে বিদ্যুৎ চমকানোসহ পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যেতে পারে।
ভারি বর্ষণের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরে বজ্রমেঘ তৈরি অব্যাহত থাকায় বেলা ১১টা থেকে পরবর্তী ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে দেশের সব বিভাগের কোথাও কোথাও ভারি (২৪ ঘণ্টায় ৪৪-৮৮ মিলিমিটার) থেকে অতি ভারি (২৪ ঘণ্টায় ৮৮ মিলিমিটারের বেশি) বর্ষণ হতে পারে।
অতিভারি বর্ষণের কারণে দেশের কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে।
এদিকে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে। সেজন্য দেশের চার সমুদ্রবন্দরে তিন নম্বর সতর্কতা সংকেত জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ সতর্কবার্তায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
সেই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি এসে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
আরও পড়ুন-