Published : 06 Dec 2025, 05:42 PM
নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনকে নিয়ে যখন বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া শুরু হয়, তখন অন্তর্বর্তী সরকার যে ভূমিকা রেখেছে তা নিয়ে খেদ প্রকাশ করেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেছেন, “যখন নারী কমিশনের রিপোর্টটাকে নিয়ে ভালগার ক্যাম্পেইন শুরু হল অকথ্য ভাষায় এবং কমিশনের সদস্যরা নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে আছেন; তখন অন্তত সাতজন উপদেষ্টার কাছে আমি শুধু হোয়াটসঅ্যাপ না, সরাসরিভাবে আবেদন করেছি।
“বলেছি, অন্তত সরকার—আপনারা একটা আপনাদের অবস্থানটা বলেন এটার স্বপক্ষে, কিছু বলে নাই। যেটা বলেছেন, সেটা হচ্ছে যে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে—এই কমিশনের রিপোর্ট তো সরকারের রিপোর্ট না।”
শনিবার রাজধানীর সামরিক জাদুঘরে বাংলাদেশ জ্বালানি সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “কোন কমিশনের রিপোর্ট সরকারের রিপোর্ট? তাহলে কেন নারী কমিশনের রিপোর্টটাকে সরকারের কমিশন না বলে এটাকে অপদস্ত করা হবে? পরে তো সেই শক্তি আরো বেশি প্রোথিত হয়েছে।
“সরকারের সেই সাহসটুকু ছিল না যে—তারা এই প্রতিবেদনকে ওউন করবে। তারা ভালগার ক্যাম্পেইনের বিরুদ্ধে অবস্থান জানান দেবে; সেই সাহসটা ছিল না।”
বরং সরকার আক্রমণকারী শক্তিগুলোর কাছে অনেকটা আত্মসমর্পণ করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা অন্তবর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারে বিভিন্ন খাতে ১১টি সংস্কার কমিশন করেছে। এর মধ্যে গত ১৯ এপ্রিল নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়, সেখানে ৪৩৩টি সুপারিশ করা হয়েছে। এরপরই নারী কমিশন ও সুপারিশ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।
এর আগে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান তার বক্তব্যে কেবল সরকারের সমালোচনা না করে ভূমিকা রাখতে বেসরকারি খাত ও সুশীল সমাজের প্রতি আহ্বান জানান। প্রয়োজনে তাকে বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তকে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বলেন।
এ বক্তব্য দিয়ে চলে যান উপদেষ্টা রিজওয়ানা।

পরে ইফতেখারুজ্জামান বক্তব্য দিতে এসে বলেন, এই সরকারের উপদেষ্টাদের হোয়াটসঅ্যাপ নয়, বরং সরাসরি আবেদনেও কাজ হয় না।
“শুধুমাত্র নারী...আমি একটা দৃষ্টান্ত দিলাম, আরো অনেক দৃষ্টান্ত দিতে পারি। আদিবাসীদেরকে নিয়ে একই ঘটনা হয়েছে। আদিবাসী শব্দটা বলার কারণে ভালগার ক্যাম্পেইন হচ্ছে। আদিবাসী সমস্যা- শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের সেনাবাহিনী মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে, এটি আমার অন্যায়- এই কথাটা বলা? কেন?”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে আমি মনে করি গত দেড় বছরে নারী অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় অবনতি হয়েছে। যতটুকু অগ্রগতি হতে পারত, সেই তুলনায় কিন্তু আমরা অনেক পিছিয়ে গেছি। সেটার জন্য অবশ্যই বিশাল রাজনৈতিক শক্তি আছে, রাজনীতির পাশাপাশি অন্য শক্তিগুলো আছে।
“শুধু নারী-পুরুষের অধিকার সমঅধিকার না, যেকোনো মার্কার অব আইডেন্টিটি, ধর্ম, সংস্কৃতি, তাত্ত্বিক পরিচয়, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী—এ ধরনের যে মার্কারস অব আইডেন্টিটি, বৈচিত্র্যের আইডেন্টিটি যেগুলো আছে, সেগুলো ভিত্তিক যে সমতা, সেক্ষেত্রে কিন্তু বিশাল প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। এমন না যে স্বৈরাচারী সরকারের সময় ছিল না। আরো বেশি ছিল হয়তোবা, কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা ছিল—সেটা থেকে আমরা সরে আসব পরবর্তীকালে। সেই জায়গায় কিন্তু আসলে হয়নি।”
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক কর্মজোটের (বিডব্লিউজিইডি) নির্বাহী সদস্য মনোয়ার মোস্তফা। সভাপতিত্ব করেন বিডব্লিউজিইডির আহ্বায়ক কাজী মারুফুল ইসলাম।
সরকারের সমালোচনা করে কাজী মারুফুল বলেন, “এই এনার্জি ট্রানজিশনটা জাস্ট (ন্যায্য) করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না—যদি কি না পুরো ট্রানজিশনটা জাস্ট না হয়। অর্থাৎ এটার মানে এনার্জি ট্রানজিশন ইজ জাস্ট নট অনলি অ্যাবাউট দা টেকনোলজি অ্যান্ড ফাইন্যান্স। ইট ইজ ইকুয়ালি অ্যাবাউট দ্য প্রিন্সিপাল অব গভর্নেন্স অ্যান্ড জাস্টিস।
“এখন আমরা যদি গভর্নেন্স অ্যান্ড জাস্টিসের জায়গাতে কাজ করি, যেটা ক্যাপচার হয়েছিল। আমাদের এনার্জি সেক্টরের যে অর্গানাইজড ক্রাইম হয়েছে, সেটা আমরা মানলাম। কিন্তু সেটা সব জায়গাতেই হয়েছে। কিন্তু এমন একটা দেশে কীভাবে একটা জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন প্রত্যাশা করা যায়; যেখানে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, বিশ্বাসের বৈচিত্র্য, পরিচয়ের বৈচিত্র্য নিয়ে মানুষ থাকতে পারে না।
“যেখানে নারী তার অধিকারের কথা বললে তার বিরুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ তাকে আক্রমণ করার জন্য চলে আসে। আর সেখানে আমাদের এই অন্তর্বর্তী সরকার সেখানে বসে থেকে সেগুলোকে প্রশ্রয় দেয়; পরিষ্কারভাবে বলতে হয় যে সেগুলোকে প্রশ্রয় দেয়।”

কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, “তো এই যে যেখানে আইনের শাসনের ন্যূনতম জায়গাটা প্রতিষ্ঠা করতে তারা ব্যর্থ হন, যেখানে মানুষের উপর আক্রমণ হচ্ছে; পরিষ্কার আমরা ভিডিওতে দেখতে পাচ্ছি যে, হাজার হাজার মানুষ যেটাকে আক্রমণ, মানে মানুষ পরিষ্কার আক্রমণ করছে। যারা আক্রমণ করছে, তাদের বিরুদ্ধে কিছুই কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। আর যিনি আক্রান্ত হলেন, তাকে আমরা জেলখানায় রাখছি।
“এটা নারীর বেলায় সত্য, এটা বাউলের বেলায় সত্য, এটা আদিবাসীর বেলায় সত্য। একটা যেকোনো রকমের ভিন্ন মতের বেলায় সত্য। যারা আজকে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে আছেন, তারা একটা পরিষ্কারভাবে পক্ষ নিয়েছেন। এটা কোনোভাবেই বলা যাচ্ছে না যে তারা নিরপেক্ষ আছেন, এটা পরিষ্কার।”
বিডব্লিউজিইডির আহ্বায়ক মারুফুল বলেন, “একটা পক্ষ নিয়েছেন এবং সেই পক্ষটা হচ্ছে—তারা সেই পক্ষকে নিয়েছেন, যে পক্ষ এরকম মানুষের ভিন্নতাকে, বৈচিত্রতাকে, এদেশের মুক্তিযুদ্ধের যে প্রেরণা, যে চেতনা, যে বিশ্বাস, যে আশা থেকে মানুষ একটা স্বাধীন দেশ তৈরি করেছিল; সেই মৌলিক আশার যে জায়গাগুলোতে আক্রমণ যারা করছে, তাদের পক্ষ নিয়েছেন।
“তাদের রক্ষাকর্তা, তাদের প্রশ্রয়দাতা, কী জানি হয়তো উৎসাহদাতার ভূমিকায় তারা (সরকার) চলে গেছেন। তো এই জায়গায় যদি ইনজাস্টিস থাকে, তাহলে আমার এনার্জি সেক্টরে জাস্টিস আসা তো খুব দুরূহ। হওয়া অলমোস্ট লাইক ইম্পসিবল।”