Published : 24 Jun 2025, 12:37 AM
হিন্দি ভাষী ভারতীয়দের গোপন বন্দিশালায় গিয়ে ‘গুম’ হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের পুরনো অভিযোগের মধ্যে আমেরিকানরাও একই কাজ করেছেন বলে উঠে এসেছে ‘গুম’ বিষয়ক প্রতিবেদনে।
‘গুম’ হয়ে বিভিন্ন বাহিনীর হাতে বন্দি থাকা ভুক্তভোগীরা জিজ্ঞাসাবাদের সময়কার ঘটনার বর্ণনায় ইংরেজিভাষী বিদেশিদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন গুম সংক্রান্ত কমিশনকে, যাকে ‘ফরেন গেস্ট’ হিসেবে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
এক ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য তুলে ধরে গুম সংক্রান্ত কমিশনের সবশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনের ষষ্ঠ অধ্যায়ে বলা হয়, তিনি যখন ডিবি হেফাজতে ছিলেন তখন দুজন আমেরিকান তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সেখানে একটি 'ইনফর্মড কনসেন্ট' সংক্রান্ত নথি নিয়ে ভুক্তভোগীর সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদকারীদের মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল বলেও ওই সময়কার বর্ণনা দেন তিনি।
কমিশনের প্রতিবেদনের এই ষষ্ঠ অধ্যায়ের প্রকাশযোগ্য অংশ সোমবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস অফিস থেকে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, “ভারতের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্কের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে 'সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই' এর নামে পশ্চিমা সহযোগিতা থেকেও লাভবান হয়েছে। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা আমাদের নিশ্চিত করেছেন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই অংশীদারত্ব বাংলাদেশের নিরাপত্তা খাতে সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করেছে, যদিও এই সময়ে নিপীড়নের মাত্রা বেড়েছে।”

এতে বলা হয়, “যতদূর জানা যায়, এই বিদেশি ব্যক্তিরা সরাসরি নির্যাতনে অংশ নেননি। তবুও তাদের উপস্থিতি গোপন আটক ব্যবস্থাকে বৈধতা দিয়েছে। তারা যেন প্রতিরক্ষার ভূমিকায় নয়, বরং প্রতীকী এক ভূমিকা পালন করছিলেন; রাষ্ট্রীয় বয়ানকে শক্তিশালী করা এবং প্রক্রিয়াগত সম্মতির একটি ভান তৈরি করাই যেন ছিল উদ্দেশ্য।”
ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ‘গুম ও আয়নাঘরের’ বিষয়টি আবার সামনে আসে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে এসে এসব ঘটনা তদন্তে গত ২৭ অগাস্ট অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের গুম তদন্ত কমিশন গঠন করে।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে দুই দফায় দুটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন তুলে দেয় কমিশন। এসব প্রতিবদনে ‘গুমের’ শিকার ব্যক্তি এবং প্রত্যক্ষদর্শী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বরাতে সচিত্র বর্ণনাও দেওয়া হয়েছে।
কমিশন এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৮৫০টি অভিযোগ পেয়ে ১ হাজার ৩৫০টি অভিযোগ যাচাই বাছাই শেষে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
সোমবার প্রতিবেদনের ষষ্ঠ অধ্যায়ের প্রকাশযোগ্য অংশে বলা হয়, “২০১১ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, বিদেশি সরকারগুলো বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র্যাবকে বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকর সন্ত্রাসবিরোধী বাহিনী হিসেবে বিবেচনা করে। পুলিশের এ ইউনিটের সঙ্গে সহায়তা বাড়াতে জোরালো আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

”কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলে এই ধরনের সমর্থন প্রতিধ্বনিত হয়েছিল, যা পরের বছরগুলোতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গোপন আটক এবং গুমের ক্রমবর্ধমান প্রমাণ থাকার পরও র্যাবকে (তারা) উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও বস্তুগত সহায়তা দিয়েছিল।”
গুম কমিশনের এ অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ইসলামি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের ’অপরিহার্য প্রতিরক্ষা প্রাচীর’ হিসেবে তুলে ধরে কার্যত একটি কর্তৃত্ববাদী ‘বিনিময় চুক্তি’ করে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী অগ্রাধিকারের সঙ্গে দৃশ্যমানভাবে সঙ্গতি রেখে তারা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নীরব প্রশ্রয় কিংবা সক্রিয় সহায়তা লাভ করে।
“পরে যদিও কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়, তা আসে বহু বছরের সহযোগিতা এবং নীরব সমর্থনের পর। ওই দশকের বড় একটি অংশ জুড়ে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী এজেন্ডা এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করেছিল, যেখানে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের জন্য প্রশিক্ষণ, নজরদারি সহযোগিতা ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় চলতে থাকে নির্বিঘ্নে।
”আওয়ামী লীগকে 'জঙ্গিবাদ প্রতিরোধী নোঙর' হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যা এই ধরনের সহায়তাকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তোলে। এবং এই উপস্থাপনাই দেশীয় নিপীড়নকে একপ্রকার 'স্থিতিশীলতার মূল্য' হিসেবে তুলে ধরে।”

’আমেরিকানরা গোপন বন্দিশালায়’
এক ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি যখন ডিবি হেফাজতে ছিলেন তখন দুজন আমেরিকান তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সেখানে একটি 'ইনফর্মড কনসেন্ট' সংক্রান্ত নথি নিয়ে ভুক্তভোগীর সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদকারীদের মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল।
ওই ভুক্তভোগীর বয়ানে প্রতিবেদনে বলা হয়, “ছয় মাস পর তারা আমাদের আবার ডিবিতে নিয়ে এল। এবার আমেরিকা থেকে দু'জন লোক এসেছিল... তারা শুধু আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য আসেনি, তারা আরও অনেক লোককে এনেছিল। তারা আমাকে ওই দুজন আমেরিকান লোকের সামনে বসাল। আর তারা আমাকে একটা ফর্ম দিল এবং বলল, ‘আমরা চাই আপনি এটাতে সই করুন।’ আমি বললাম, ‘আমি কি আগে এটা পড়তে পারি?’ তারা বলল, ‘আপনার কি দোভাষীর দরকার?’ আমি বললাম, ‘আমি সরাসরি আপনার সাথে কথা বলতে পারি।’
“তারা আমাকে এই ফর্মটা দিল, আর তাতে আমার নাম এবং অন্যান্য বিস্তারিত তথ্য ছিল। লেখা ছিল আমার আইনজীবীর সাহায্য পাওয়ার অধিকার আছে এবং সে জিজ্ঞাসাবাদের সময় উপস্থিত থাকতে পারবে। আমি বললাম, ‘আমার বোন একজন আইনজীবী। আমি চাই আপনারা কিছু জিজ্ঞেস করার আগে সে এখানে থাকুক।’
”তারা বলল, ‘আমাদের তো বাংলাদেশে কোনো এখতিয়ার নেই, তাই এটা শুধু একটা কাগজ যার কোনো ব্যবহার নেই।’ ... আমি বললাম, ‘দেখুন, আপনারা হয় এটা বলুন যে এটা একটা অর্থহীন কাগজ, অথবা আমার বোনকে এখানে আনুন, না হলে আমি এটাতে সই করব না।’ তারা বলল, ‘ঠিক আছে, এই কাগজটা দেখুন। এটা শুধু একটা আনুষ্ঠানিকতা। আপনি সই করে দিন।’
”আমি বললাম, ‘আপনারা স্বীকার করছেন এটা এক প্রকার অর্থহীন, তাই না?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ, আমরা স্বীকার করছি।’ তারা আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কী করেন? আপনার ইংরেজি এত ভালো কিভাবে? আপনি কী পড়েছেন?’ আমি বললাম, ‘আমি আন্তর্জাতিক স্কুলে পড়েছি।’ ...সব শেষে তারা আমাকে ছেড়ে দিল। আর এরপর তারা আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।”
প্রতিবেদনের এ অংশে ওই ভুক্তভোগীর আরও বর্ণনা ছিল। তবে তা প্রকাশযোগ্য মনে করেনি কমিশন বলে সংবাদমাধ্যমের কাছে ওই অংশে আর কিছু বলা হয়নি।

আরও ‘ফরেন গেস্টের’ জিজ্ঞাসাবাদ
প্রতিবেদনে বলা হয়, আরেকজন বন্দি সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ ডিজিএফআইয়ের হেফাজতে আটক থাকার সময় তাকে একজন ইংরেজিভাষী বিদেশি জিজ্ঞাসাবাদ করতে এসেছিলেন বলে কমিশনকে জানিয়েছেন। ওই বন্দির ডিজিএফআই হেফাজতে আটক থাকার বিষয়টি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করেছে কমিশন।
”তিনি কমিশনকে বলেন, তিনি স্মরণ করেন যে তাকে একজন বিদেশি জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। তার ধারণা, জিজ্ঞাসাবাদকারী ইংরেজিভাষী ছিলেন, যা তিনি জিজ্ঞাসাবাদের সময় কিছু ইঙ্গিত থেকে বুঝতে পেরেছিলেন।”
ওই ভুক্তভোগীর বয়ানে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তা জাস্ট বললো যে ফরেন গেস্ট আছে, ইংলিশে কথা বলো। তখন আমার ধারণা হল ভারত থেকে আসছে। তো আমি পরীক্ষা করার জন্য হিন্দিতে বলি। এটা আমি পরীক্ষা করার জন্য বলছি আরকি। তো বলছে, ‘না, ইংলিশেই বলতে হবে।’
”অনেকক্ষণ, দুই-তিন ঘণ্টা, ঘুরে ফিরে একই কথাবার্তা। তারপরে আমাক বেশ ভয় লাগিয়ে দেয়। মানে সেদিন আমাক সর্বশেষ বলতেছে, ‘তুমি যা দিলা এটা তো হবে না।’ তা আমি বললাম যে, ‘আমি তো জানি না।’ তখন বলতেছে, ‘তুমি যদি না-ই কিছু বলতে পার, তাহলে তো তোমাকে বাঁচিয়ে রাইখা লাভ নাই আমাদের। মানে ইউ হ্যাভ টু লে গোল্ডেন এগ।’ একদম এই কথাই বলছে।
”... পরের দিন আমি কি সোনার ডিম দিব, এটা শোনার জন্য পরের দিন আবার নেবে (জিজ্ঞাসাবাদের জন্য)। পরের দিন আমি শুধু একটা কথাই লিখছি যে ‘আমি খুবই দুঃখিত যে আমার কাছে গোপন কোনো তথ্য নেই।’ এই একটা লাইনই শুধু লিখছি। মানে মেজাজও খারাপ হয়ে গেছে যে মানে কী করতেছে এসব অযথা। তবে পরের দিন আর জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। নিয়ে গেছিল জাস্ট, নিয়ে আসছে, আর জিজ্ঞাসাবাদ করে নাই।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে যেহেতু আগের শাসকগোষ্ঠী আর ক্ষমতায় নেই, তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এসব নিরাপত্তা কাঠামো ও তার অন্তর্নিহিত চুক্তিগুলোর প্রকাশ্যভাবে পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি। জঙ্গিবাদবিরোধী বয়ান কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি প্রশ্রয় এবং সহায়তাকে চালু রেখেছিল, তা অনুধাবন করা ছাড়া এই নিপীড়নপ্রবণ প্রতিষ্ঠানগত বাস্তবতাকে বোঝা যাবে না। এবং দীর্ঘ দিনের প্রশ্নহীনতারও অবসান ঘটবে না।
'গুমের' শিকারদের নির্যাতনের যত নিষ্ঠুর কায়দা
গুমে জড়িতরা এখনো ক্ষমতার কেন্দ্রে, ভিকটিমদের দিচ্ছে হুমকি: গুম সংক্রান্ত কমিশন
সেনাবাহিনী গুমে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জড়িত নয়, তবে তারা জানত: গুম সংক্রান্ত কমিশন
শাসন দীর্ঘায়িত করতে 'জঙ্গিবাদবিরোধী' অভিযানের নামে 'গুম' করা হয়েছে
গুমে প্রধান ভূমিকা ছিল র্যাবের ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের: প্রেস সচিব
সমাজের 'ভদ্রলোকেরা' গুমে জড়িত: প্রধান উপদেষ্টা
'গুমের শিকার' ৩৩০ জনের ফেরার আশা ক্ষীণ: কমিশন প্রধান
'আয়নাঘরে' গেলেন ইউনূস, দেখলেন নির্যাতনের যন্ত্র