১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলা: সে দিনের ঘটনার বর্ণনা বাবা ও মার জবানবন্দিতে

রুদ্ধদ্বার কক্ষে সাক্ষ্য দেয় রামিসার বড় বোন।

রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলা: সে দিনের ঘটনার বর্ণনা বাবা ও মার জবানবন্দিতে
আদালতে আসামি সোহলে রানা

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 02 Jun 2026, 01:48 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:19 PM

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সি স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা ও মা পারভীন আক্তার।

এরপর রুদ্ধদ্বার কক্ষে সাক্ষ্য দেয় রামিসার বড় বোন।

মঙ্গলবার ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে তারা জবানবন্দি দিয়েছে।

মামলায় প্রথম সাক্ষী দেন আব্দুল হান্নান, এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।  অসুস্থ বোধ করায় আদালতের অনুমতি নিয়ে চেয়ার বসে সাক্ষ্য দেন হান্নান। 

জবানবন্দিতে আব্দুল হান্নান বলেন, ঘটনার দিন ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হন তিনি৷

“ক্যান্টনমেন্ট হয়ে বনানীর কাকলী অফিসে যাওয়ার পর আমার স্ত্রী পারভীন আক্তার আমাকে ফোন দিয়ে জানান, রামিসাকে পাওয়া যাচ্ছে না। তারপর আমি বাসায় ফিরে আসি। এসে দেখি, আমার বাসার সামনে অনেক লোক জড়ো হয়ে আছে। দৌড় দিয়ে আমার ফ্ল্যাটের সামনে যাই। গিয়ে দেখি, সেখানেও অনেক লোক জড়ো হয়ে আছেন। 

“আমাকে স্ত্রী বলতে থাকেন, পাশের ফ্ল্যাটে (সোহেল রানা ও স্বপ্নার ফ্ল্যাট) রামিসা আটকে আছে৷ সেখানে রাজু নামে একজনকে দেখি, দরজার তালা ভাঙার চেষ্টা করছে। আমার স্ত্রী অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করলেও দরজা খোলেননি। আমি তখন দৌড়ে নিচে যাই। একটা হাতুড়ি নিয়ে এসে দরজার তালা ভাঙার চেষ্টা করি। পাশাপাশি অন্য লোকজনও ভাঙার চেষ্টা করে।”

তিনি বলেন, “এক পর্যায়ে দরজার তালা ভেঙে যায়। তালা ভাঙার ছিদ্র দিয়ে একজনকে দেখতে পাই। ভেতরে ঢুকে কমন রুম ও বাথরুমের দরজা বন্ধ দেখতে পাই। টয়লেটের ভেতরে রক্ত দেখতে পাই। তখন স্বপ্নাকে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। আসামিরা যেই রুমে বসবাস করেন, সেই রুমও বন্ধ ছিল। উপস্থিত একজন স্টিলের খাট উচু করে দেখেন বালতির ভেতর রামিসার মাথা। তখন আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পরে পুলিশ এসে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে। এরপর থানায় গিয়ে এসব কথা বলে মামলা করেছি।”

জবানবন্দি শেষে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ তাকে জেরা করেন। 

আইনজীবী জানতে চান, হান্নানকে তার স্ত্রী কখন ফোন করেছিলেন। 

জবাবে হান্নান বলেন, সকাল ১০টা থেকে ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে ফোন করেছিলেন। 

তিনি তখন কোথায় ছিলেন? কীভাবে ও কথন বাসায় আসেন? 

জবাবে হান্নান বলেন, “অফিসে ছিলাম। বাসে করে ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে বাসায় আসি।” 

এরপর আইনজীবী জানতে চান হাতুড়ি নিয়ে এসে দরজা ভাঙতে কতক্ষণ সময় লেগেছিল?

বাদী বলেন, ২০-২৫ মিনিট সময় লেগেছিল। 

আপনি তো পুরো বিষয় নিজের চোখে দেখেননি? জবাবে হান্নান বলেন, “যতটুকু দেখেছি ততটুকু বলেছি।”

আসামির সঙ্গে কি কোনো পূর্বশত্রুতা ছিল? জবাবে রামিসার বাবা বলেন, “তাকে কখনো দেখেনি।” 

তখন আইনজীবী বাদীকে বলেন যে তিনি মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছেন। 

জবাবে হান্নান বলেন, আইনজীবীর এ কথা সত্য নয়। 

এরপর সাক্ষ্য দেন রামিসার মা পারভীন আক্তার।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, “ঘটনার দিন ১৯ মে আমি রান্না করছিলাম৷ রান্নার শেষ পর্যায়ে বড় মেয়েকে তার চাচা গোলাম মোস্তফার বাসায় যেতে বলি। তখন ছোট মেয়ে রামিসা আক্তার বলে, আম্মু আমিও যাব। রান্না ঘর থেকে বুঝতে পারি, দুজন রেডি হচ্ছে। তবে বড় মেয়ে তাকে রেখে বের হয়ে যায়। আমি বুঝতে পারিনি, ওকে নিয়ে যায়নি। 

“রান্নাঘর থেকে চিৎকার শুনতে পাই। পাশের ফ্ল্যাটের বাচ্চা চিৎকার দিচ্ছে, এটা ভেবেছি। কিছুক্ষণ পর দেখি দরজা খোলা। ভাবছি তারা (দুই মেয়ে) কি দরজা খোলা রেখে চলে গেল।”

পারভীন বলেন, “কিছুক্ষণ পর বড় মেয়ে রাইসা একা বাসায় ফিরে আসে। তাকে জিজ্ঞাসা করি, ‘তুমি একা কেন, রামিসা কোথায়?’ নিচে গিয়ে দেখি রামিসা সেখানে নাই। লোকজনকে জিজ্ঞাসা করছি, রামিসাকে দেখছে কি না। নিচের ছোট রুমে খুঁজে পায়নি। দোতলায় ব্যাচেলারদের রুম চেক করেও পাইনি। 

“তারপর তিন তলায় এসে রুমের দরজার ধাক্কা দিলে খোলে না। তখন দরজার সামনে নিচে দেখি আমার মেয়ের একটা জুতা পড়ে আছে৷ তখন আমি চিৎকার করি। এসময় বিভিন্ন ফ্ল্যাট থেকে লোকজন আসেন। তারা এসেও দরজা ধাক্কা দিলেও খোলেনি। পরে নিচে থেকে ১০/১২ জন লোক আসেন। এসময় আমার স্বামী ফোন পেয়ে অফিস থেকে আসেন।”

তিনি বলেন, “দরজা খুলে ভেতরে গিয়ে দেখি, বাথরুম রক্তে ভরা। আমার মেয়ের মাথা এক জায়গায়, দেহ আরেক জায়গা দেখতে পাই। ওই ফ্ল্যাটের তখন আসামি স্বপ্নাকে দেখি।”

আদালতে কাঠগড়ায় থাকা স্বপ্না খাতুনকে দেখিয়ে তিনি বলেন, “ওরে ওই সময় বলছি, বোন দরজা খুলে দে। তোরে কিছু কমু না। তারপরও দরজা খোলেনি। এরপর পুলিশ আসে।”

এছাড়া আসামি সোহেল রানাকে দেখিয়ে তিনি বলেন, “পরে শুনেছি, সোহেল রানা আমার মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যা করে গ্রিল কেটে পালিয়ে গেছে।”

তার জবানবন্দি শেষে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ তাকে জেরায় একাধিক প্রশ্ন করেন।

আসামিপক্ষের আইনজীবীর প্রশ্নের জবাবে পারভীন বলেন, সোহেল রানা তার মেয়েকে খুন করেছে এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন তাকে সহযোগিতা করেছে। এছাড়া সোহেল গ্রিল কেটে পালিয়েছে বলে আশপাশের লোকজনের কাছে শুনেছেন।

এরপর রুদ্ধদ্বার কক্ষে রামিসার বড় বোনের সাক্ষ্য নেওয়ার আবেদন করেন প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু। 

তিনি বলেন, রামিসার বোন এখনো শিশু, তার বয়স মাত্র ১৬ বছর। বোনের হত্যাকাণ্ডের পর এখনো সে হতবিহ্বল অবস্থায় আছে। এত লোকজনের সামনে সাক্ষ্য দিতে বিব্রতবোধ করতে পারে। তাই তার সাক্ষী ‘ক্যামেরা কোর্টে’ নেওয়া হোক।

ট্রাইব্যুনাল আবেদন মঞ্জুর করলে তার সাক্ষ্য রুদ্ধদ্বার কক্ষে নেওয়া হয়। এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবী তাকে জেরা করেন।

মামলায় আরও কয়েকজন সাক্ষী আদালতে উপস্থিত হয়েছেন। পর্যায়ক্রমে তারা সাক্ষ্য দেবেন।

এর আগে সোমবার রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় করা মামলায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেন দেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন।

গত ১৯ মে দুপুরে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশ বলেছে, ওইদিন সকালে পাশের ফ্লাটের বাসিন্দা ৩২ বছরের সোহেল শিশুটিকে গলা কেটে হত্যার পর মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এরপর ফ্ল্যাটের সাবলেট এই ভাড়াটে গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। তবে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ঘরেই ছিলেন।

পুলিশ বাসা থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। পরে সন্ধ্যায় সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সেদিনই রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা করেন। আসামি সোহেল রানা ইতোমধ্যে দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে বলে পুলিশের ভাষ্য।

মামলাটি তদন্ত করে গত ২৪ মে তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান দুজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।

সেদিনই ঢাকার মহানগর হাকিম আশরাফুল হক অভিযোগপত্রটি দেখে বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় মামলাটি বদলির আদেশ দেন। মামলাটি ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।