Published : 26 Mar 2026, 08:34 PM
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সাড়ে পাঁচশর বেশি আলোকচিত্র এক মলাটে এনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রকাশ করল মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংকলন ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’-এর তৃতীয় খণ্ড।
চারজন মুক্তিযোদ্ধার উপস্থিতিতে বৃহস্পতিবার স্বাধীনতা দিবসে এক অনুষ্ঠানে এ সংকলনের মোড়ক উন্মোচন হল।
‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ: অন্তহীন যুদ্ধ-গৌরব বেদনা আর শিকড়ের ইতিহাস’ নামের এ সংকলনের দুটি খণ্ড এর আগে প্রকাশিত হয়েছিল।
এর মধ্যে প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় গতবছর বিজয় দিবসের রাতে। আর দ্বিতীয় খণ্ড আলোর মুখ দেখে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি; ১৯৭২ সালের ওই দিনে মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন মিরপুর মুক্ত হয়েছিল।
তৃতীয় খণ্ডটি ভাগ করা হয়েছে ২৪টি অধ্যায়ে। প্রতিটি অধ্যায়ে দুর্লভ সব আলোকচিত্র সন্নিবেশিত করার পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় আলোকচিত্রের স্থান, সময়কাল, আলোকচিত্রীর নাম এবং পটভূমি বর্ণনা করা হয়েছে।
সংকলনের প্রতিটি অধ্যায়ে একটি করে সংক্ষিপ্ত ভূমিকা রাখা হয়েছে, যাতে পাঠক ওই অধ্যায়ে যুক্ত করা আলোকচিত্রগুলো সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে চুয়ান্নর নির্বাচন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন ও ঘূর্ণিঝড়, একাত্তরের উত্তাল মার্চ ও সাতই মার্চের ভাষণ, অপারেশন সার্চলাইট, বেতারে মুক্তির ডাক, মুজিবনগর সরকার, মুক্তিবাহিনী গঠন, শরণার্থীশিবির, ঢাকায় গেরিলা অভিযান, রক্তাক্ত রণাঙ্গন, মুক্তিযুদ্ধে স্বতন্ত্র ও আঞ্চলিক বাহিনী, মুক্তিযুদ্ধে নারী, আদিবাসীদের অবদান, বিভিন্ন দেশ ও মানুষের পরোক্ষ ভূমিকা, রাজাকার-আলবদর তথা দালালচক্রের ইতিহাস, যুদ্ধাকালীন সংবাদপত্রের ভূমিকা, জেনোসাইড, আত্মসমর্পণ ও বিজয়ের মুহূর্ত, মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন ও যুদ্ধজয়ের গল্প নামে ভাগ করা হয়েছে অধ্যায়গুলো।

দেশি-বিদেশি আলোকচিত্রীদের তোলা ছবি নিয়ে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো অধ্যায়ভিত্তিক তুলে ধরা হয়েছে এই খণ্ডে। মুহাম্মদ তকীয়ূল্লাহ, মোহাম্মদ ইয়াকুব, রশীদ তালুকদার, আবদুল হামিদ রায়হান, নাইব উদ্দিন আহমেদ, আমানুল হক, শফিকুল ইসলাম স্বপনের মত আলোকচিত্রীদের সঙ্গে অমিয় তরফদার, মেরিলিন সিলভারস্টোন, রেমন্ড ডেপারডন, মার্ক গডফ্রে, রঘু রাই, কিশোর পারেখ ও রবীন সেনগুপ্তর মত বিদেশি আলোকচিত্রীদের ছবিও রয়েছে।
বইটির সম্পাদনা পর্ষদ বলছে, এ বইয়ে ব্যবহৃত সবগুলো আলোকচিত্রের উৎস, সময়কাল এবং প্রেক্ষাপট যাচাই করার চেষ্টা করেছেন তারা। তবে দুর্লভ হওয়ায় সাধ্যমত চেষ্টার পরেও বেশ কিছু আলোকচিত্রের উৎস বা সময়কাল খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি।
সংকলনের ভূমিকায় প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, “যারা যুদ্ধ দেখেনি, তাদের কাছে ১৯৭১ অনেক সময় শুধু পাঠ্যবইয়ের কয়েকটি অনুচ্ছেদ কিংবা নির্দিষ্ট দিবসের আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু ছবি সেই দূরত্ব ভেঙে দিতে পারে। একটি আলোকচিত্র সময়কে স্থির করে রাখে; বর্তমানের পাঠককে টেনে নিয়ে যায় অতীতের নির্দিষ্ট মুহূর্তে।
“আমরা চাই, নতুন প্রজন্ম ছবির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করুক—কেন এই যুদ্ধ হয়েছিল, কীভাবে একটি জাতি এত ত্যাগ স্বীকার করেছিল এবং সেই ত্যাগের মূল্য আমরা আজ কতটা দিতে পারছি।”
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রকাশনা অনুষ্ঠানের ছোট্ট আয়োজনটি শুরু হয় ‘ও আমার দেশে মাটি’ গানটি দিয়ে। কাজী সারাহ সাদীয়া নূরের সঞ্চালনায় শুরুতে এই সংকলনটি নিয়ে একটি অডিও-ভিজুয়াল প্রদর্শনী হয়। তিন খণ্ডে ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ প্রকাশনার পটভূমি ও গ্রন্থগুলোর নানা দিক তাতে তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজ আলম বেগ, মুক্তিযোদ্ধা লুতফা হাসীন রোজী, মুক্তিযোদ্ধা কামরুল আমান ও মুক্তিযোদ্ধা কাজী আশরাফ হুমায়ুন বাঙ্গাল। তাদের যুদ্ধ দিনের কথা নিয়ে দেখানো হয় সংক্ষিপ্ত ভিডিও।
তাদের হাতে নতুন প্রকাশিত বইটি তুলে দেন প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী। ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানের সঙ্গে ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ গ্রন্থমামলার তৃতীয় খণ্ডের মোড়ক উন্মোচন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বইটি প্রকাশনার সঙ্গে সম্পৃক্তরা।
মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজ আলম বেগ অনুষ্ঠানে বলেন, “আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, যে কোনো অবস্থানে যুদ্ধ করতে আমরা রাজি আছি, সর্ব সময়ে। আমরা অনেক কিছু হারাইছি, কিন্তু অনেক কিছু এখনও হারাই নাই।
“আমাদেরকে আবার দাঁড়াতে হবে, দেশকে আবার সুসংগঠিত করতে হবে, বাংলাদেশকে বাংলাদেশের মতোই আবার তৈরি করতে হবে। জয় বাংলা। আমি জয় বাংলায় বিশ্বাসী, জয় বাংলাকে আমি ভালোবাসি।”
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে এই সংকলন প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়ায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি ধন্যবাদ জানান।
‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানের আবহেই অনুষ্ঠান শেষ হয়।

সংকলনটির তিনটি খণ্ডের সম্পাদনা পর্ষদে ছিলেন—রাজীব নূর, সালেক খোকন ও সিরাজুল ইসলাম আবেদ।
সম্পাদনা সহযোগী ছিলেন নবনীতা সাহা, অপু মেহেদী, পাভেল রহমান ও মাছুম কামাল।
সংকলক হিসেবে কাজ করেছেন আজিজুল পারভেজ, শাহেদ কায়েস, রুমা মোদক, আহমাদ শামীম, মারুফ বিল্লাহ তন্ময়, মাছুম কামাল, পাভেল রহমান, অপু মেহেদী, নবনীতা সাহা, সিরাজুল ইসলাম আবেদ, সালেক খোকন ও রাজীব নূর।
ইংরেজিতে অনুবাদের কাজ করেছেন তুরাজ আহমদ, সৌমিক হাসীন, জাকিয়া রুবাবা হক এবং আরশী ফাতিহা কাজী। আলোকচিত্র কিউরেশনের কাজ করেছেন সাহাদাত পারভেজ।

কী আছে এই সংকলনে
বইটির সম্পাদনা পর্ষদ বলছে, ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ: অন্তহীন যুদ্ধ-গৌরব বেদনা আর শিকড়ের ইতিহাস’ সংকলনটি মূলত তিনটি খণ্ডে বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধের ইতিহাস জানতে চেয়েছে।
এই যুদ্ধ কি কেবল নয় মাসের কাঠামোতে সীমাবদ্ধ যুদ্ধের গল্প? সেই যুদ্ধ কি কেবল সামরিক কাঠামোতে আবদ্ধ সেক্টরভিত্তিক নিয়মতান্ত্রিক লড়াই ছিল?
‘গণহত্যা’ শব্দটি কি পাকিস্তানি হত্যাযজ্ঞের ব্যাপ্তি আর ভয়াবহতা বোঝাতে যথেষ্ট? কিংবা ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দের পুরুষবাচক চিত্রকল্পে বাংলার নারীর অসীম ত্যাগ আর সংগ্রামের যথার্থ প্রতিফলন ঘটে?
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সেই বহুমাত্রিকতায় আলো ফেলেছে ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’-এর তিনটি খণ্ড।
প্রথম দুটি খণ্ড মূলত ভাষার লড়াই থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে পৌঁছানোর যাত্রায় বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রামের পর্বভিত্তিক নির্বাচিত লেখাগুলো গ্রন্থিত করে একটি ভিন্ন পাঠের প্রচেষ্টা, আর তৃতীয় ও শেষ খণ্ডটি আলোকচিত্রের মধ্য দিয়ে সেই প্রেক্ষাপটকে দেখানোর প্রয়াস।
দাম কত, কোথায় পাওয়া যাবে
সংকলনের প্রথম খণ্ডের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা, দ্বিতীয় খণ্ড ১ হাজার ৮০০ টাকা, আর তৃতীয় খণ্ডের দাম ৩ হাজার ৫০০ টাকা।
তিনটি খণ্ডই বাতিঘর, কথাপ্রকাশ ও পাঠক সমাবেশের বিক্রয় কেন্দ্র থেকে সংগ্রহ করা যাবে। চাইলে ওই প্রকাশনীগুলোর ওয়েবসাইট থেকে অর্ডার করে সংগ্রহ করা যাবে।
এছাড়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান কার্যালয়ে এসে বা বিকাশে মূল্য পরিশোধ করে বাসায় বসেই সংগ্রহ করা যাবে বইটির তিনটি খণ্ড।
অতিথিরা

মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজ আলম বেগ
মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজ আলম বেগ ‘ক্যাপ্টেন বেগ’ নামেই বেশি পরিচিত। যুদ্ধের শুরুতে তিনি পাকিস্তানে আটকা পড়েছিলেন।
সেখান থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। শুরুতে ছিলেন নয় নম্বর সেক্টরের অপারেশনাল কমান্ডার। পরে তাকে দেওয়া হয় শমশেরনগর সাব-সেক্টরের পূর্ণ দায়িত্ব।
তিনি ‘হার্ড কোর অব সার্জেন্টস’ নামে কিশোরদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘বিচ্ছু বাহিনী’। সমগ্র সাতক্ষীরা অঞ্চলে গেরিলা, সম্মুখ ও নৌকমান্ডো যুদ্ধ পরিচালনা করেন। এছাড়া বরিশালের দোয়ারিকায় এক কোম্পানি পাকিস্তানি সেনাকে আত্মসমর্পণেও বাধ্য করেন।
মুক্তিযোদ্ধা লুতফা হাসীন রোজী
মুক্তিযুদ্ধের সময় লুতফা হাসীন রোজী ছিলেন আজিমপুর স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মুক্তিযুদ্ধে তিনি বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর গেরিলা সদস্য হিসেবে গোপীবাগ অভিযানে অংশ নেন।
মুক্তিযোদ্ধা কামরুল আমান
১৯৭১ সালে ভারতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় এক কোটি বাঙালিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব এসে পড়ে ভারতের ইন্দিরা গান্ধী সরকারের ওপর৷ ভারতের কিছু রাজ্যের মানুষ তাতে নাখোশ হয়৷ শরণার্থীদের ফিরিয়ে দিতে আর মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য না করতে নানাভাবে তারা সরকারকে চাপ দিতে থাকে৷
ঠিক ওই সময়েই বাংলাদেশ থেকে দিল্লি পর্যন্ত ‘বিশ্ব বিবেক জাগরণ পদযাত্রা’ আয়োজনের পরিকল্পনা হয়৷ তাতে অংশ নেন বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বাংলাদেশের ৩৮ জন তরুণ। ভারত সরকারের কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায়, মুজিবের মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন দূতাবাসে স্মারকলিপি প্রদান, পাকিস্তানি সেনাদের হাতে গণহত্যা ও হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা তুলে ধরে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলাই ছিল এর উদ্দেশ্য৷ পদযাত্রী দলের দুই নম্বর ডেপুটি লিডার ছিলেন কামরুল আমান।
মুক্তিযোদ্ধা কাজী আশরাফ হুমায়ুন বাঙ্গাল
মুক্তিযুদ্ধের স্বতন্ত্র বাহিনীগুলোর শীর্ষস্থানীয় কাদেরীয়া বাহিনীর ‘হনুমান কোম্পানির’ কমান্ডার ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা কাজী আশরাফ হুমায়ুন বাঙ্গাল। টাঙ্গাইলে হনুমান কোম্পানির সশস্ত্র হামলায় তটস্থ থাকত পাকিস্তানি সেনারা। এই মুক্তিযোদ্ধাকে জীবিত বা মৃত ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।
একাত্তরের ৩০ নভেম্বরে নাগরপুর থানা অপারেশনের সময় পাকিস্তানি সেনাদের এলএমজির একটি গুলি তার পিঠের ডান পাশে ঢুকে বাঁ পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। দেশ স্বাধীন হলেও সেই ক্ষতের সঙ্গে তার যুদ্ধটি এখনও চলছে।
আগের খবর
রক্তরেখায় বাংলাদেশ: দ্বিতীয় খণ্ডে বাঙালির বহুমাত্রিক জনযুদ্ধের ইতিহাস
এগোতে হবে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধরেই: তপু রায়হান
সব প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ‘উত্তরাধিকার’ হয়নি: মুক্তিযোদ্ধা লিনু হক
কিছু ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার’ কারণে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা ‘ব্যথিত’: জুলিয়ান ফ্রান্সিস
শিকলভাঙার ইতিহাস 'রক্তরেখায় বাংলাদেশ
'রক্তরেখায় বাংলাদেশ': ইতিহাসের পুনর্পাঠ
'রক্তরেখায় বাংলাদেশের' দ্বিতীয় খণ্ডের মোড়ক উন্মোচন
একাত্তর 'নিকৃষ্টতম প্রজন্ম', শুনে বুক ফেটে যায়: মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান
বীরাঙ্গনার আকুতি: 'আমাদের আর অপমান কইরেন না
আমরা এখন একটা বাধাগ্রস্ত অবস্থায় চলছি: মুক্তিযোদ্ধা শহিদউল্লাহ