Published : 31 Jan 2026, 11:38 PM
মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সব প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ধারণ করে না বলে মনে করেন মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসী হক লিনু।
শনিবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংকলন ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ এর দ্বিতীয় খণ্ডের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে একথা বলেন তিনি।
‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ এর সঙ্গে যুক্ত সংকলকদের উদ্দেশে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ আমাদের একটি আদর্শ ছিল, আমরা সেই আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে পারি নাই। আমাদের উত্তরাধিকার প্রজন্ম গবেষণায়, কলমে লয় সৃষ্টি করে রক্ত রেখায় শিকল ভাঙ্গার গান রচনা করে যাচ্ছেন। তারই প্রকাশ ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’। আজ তার দ্বিতীয় খণ্ডের প্রকাশনা।
“আমি তাদেরকেও আমাদের উত্তরাধিকার প্রজন্ম এজন্য বলছি যে, মুক্তিযুদ্ধের পরের সব প্রজন্ম আমাদের উত্তরাধিকার হয়নি। তাদেরকে আমি বলি মুক্তিযুদ্ধের পরের প্রজন্ম। আর এই কাজটি যারা হাতে নিয়েছে, তাদেরকে আমি উত্তরাধিকার প্রজন্ম মনে করি।”
পরাধীনতার শিকল ভেঙে বাঙালির রক্তে রাঙা স্বাধীনতার ইতিহাসকে ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ–অন্তহীন যুদ্ধ: গৌরব, বেদনা আর শিকড়ের ইতিহাস’ শীর্ষক তিন খণ্ডের সংকলনে মলাটবদ্ধ করছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
এ সংকলনের প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল গত বিজয় দিবসের রাতে। দ্বিতীয় খণ্ড আলোয় এল ৩১ জানুয়ারি, শনিবার; ১৯৭২ সালের এই দিনে মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন মিরপুর মুক্ত হয়েছিল।
দ্বিতীয় খণ্ড আলো ফেলেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের বহুমাত্রিক জনযুদ্ধকে।
এ খণ্ডের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা লিনু হক।
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে ঢাকার আজিমপুর এলাকায় মেয়েরা গড়ে তুলেছিলেন ‘বিচ্ছু বাহিনী’। স্কুলপড়ুয়া লিনু হকও ছিলেন সেই বাহিনীতে।

মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধজয়ের গল্প আর পাকিস্তানিদের গণহত্যার খবর প্রচারে তারা বাড়ি বাড়ি লিফলেট বিলি করেছেন। হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দালালদের।
প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, “তোমরা ভয় দেখিয়ে করছো শাসন, জয় দেখিয়ে নয়। সেই ভয়ের টুঁটি ধরবো টিপে, করবো তারে লয়। আমরা সেই প্রজন্ম–যারা প্রলয়ের লয় সৃষ্টি করে ঔপনিবেশিক শাসনের বিনাশ ঘটিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে একটি পতাকার জন্ম দিয়েছিলাম।”
সংকলনটি প্রকাশের উদ্যোগকে ‘সাহসী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধটা ছিল বিরাট ক্যানভাস, তিন খণ্ডে মলাটবন্দি সম্ভব নয়; কিন্তু এই তিন খণ্ডে উত্তর প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের একটি ধারাবাহিক চিত্র পাবে। বর্তমান সময়ে মুক্তিযুদ্ধ যেখানে ‘নিষেধ মার্কা সাইনবোর্ড’, সেখানে বিডিনিউজের এ পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে সাহসী উদ্যোগ।”
লিনু হক বলেন, “আমাদের মুক্তিযুদ্ধটা ছিল জনযুদ্ধ। সেই জনযোদ্ধাদের ইতিহাস যতদিন না উঠে আসতে পারবে, ততদিন মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচিত হবে না। তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সম্পাদনায় অন্তহীন যুদ্ধের বহুমাত্রিক ইতিহাসে একজন তরুণ যিনি লড়ে গেছেন বরিশালের নদী পথে, যে শিশু দিনাজপুর শহর থেকে নিজ ঘর ছেড়ে গ্রামাঞ্চলে উদ্বাস্তু জীবনযাপন করেছে।”
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “আমার স্মৃতিতে সেই রিকশাচালক গেরিলা যোদ্ধা টুটুল; নৌকা যখন ঘাটে ভিড়েছিল প্রাকৃতিক কার্য করার ছলে নৌকার সন্নিকটে গিয়ে বলেছিল, ‘যে নৌকায় আইছেন সে নৌকায় ফিইরা যান। শহর আইজকা গরম। নাইমা রিকশায় উঠলে ধরা পইড়া যাইবেন।’

“জনযোদ্ধা নারী, পাক মিলিটারি বেষ্টনীর মধ্যে যে ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে পালাতে সহযোগিতার জন্য নিজ স্বামী মাঝির গলায় দা ধরেছিল– ‘নৌকা ছাড়, নতুবা তোর গলায় দু-টুকরা করে ফেলব।’ স্ত্রীর ভয়ে মাঝি নৌকার বৈঠা ধরে পার করে দিয়েছিল পাক আর্মির বেষ্টনী থেকে ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে। এমনি অজস্র জনযোদ্ধার গল্প আছে আমাদের গ্রামে-গঞ্জে, পথে-প্রান্তরে। আমাদের এ কাহিনী সন্নিবেশিত করতে হবে গৌরব বেদনার শিকড়ের ইতিহাসে।”
মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ইতিহাস আরও সবিস্তারে তুলে ধরার কথা বলেন তিনি। বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময় নারীরা পুরো দেশটাকে ধারণ করেছিল অন্তঃসত্ত্বা মায়ের মতো। মা যেমন ১০ মাস ১০ দিন সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে থাকে, মুক্তিযুদ্ধে নারী জাতি পুরো দেশটাকে তাদের গর্ভে ধারণ করেছিল।
“সন্তান প্রসবের পর মা যেমন প্রসব বেদনা ভুলে যায় ছেলের মুখ দেখে, আমাদের স্বাধীন দেশ দেখে নারীরা তাদের কষ্ট ভুলে গিয়েছিল। তারা তাদের কোনো প্রাপ্য চায়নি। সেই নারীদের কথা তেমনভাবে উঠে আসেনি। সেই নারীদের কথা উঠে আসতে হবে, তখনই আমরা পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস পাব।”