Published : 31 Jan 2026, 09:59 PM
বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ কি কেবল ৯ মাসের কাঠামোতে সীমাবদ্ধ যুদ্ধের গল্প? সেই যুদ্ধ কি কেবল সামরিক কাঠামোতে আবদ্ধ সেক্টরভিত্তিক নিয়মতান্ত্রিক লড়াই ছিল? ‘গণহত্যা’ শব্দটি কি পাকিস্তানি হত্যাযজ্ঞের ব্যাপ্তি আর ভয়াবহতা বোঝাতে যথেষ্ট? কিংবা ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দের পুরুষবাচক চিত্রকল্পে বাংলার নারীর অসীম ত্যাগ আর সংগ্রামের যথার্থ প্রতিফলন ঘটে?
‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ–অন্তহীন যুদ্ধ: গৌরব, বেদনা আর শিকড়ের ইতিহাস’ এর দ্বিতীয় খণ্ড আলো ফেলেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সেই বহুমাত্রিকতায়। পরাধীনতার শিকল ভেঙে বাঙালির রক্তে রাঙা স্বাধীনতার ইতিহাসকে তিন খণ্ডের এই সংকলনে মলাটবদ্ধ করছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
এ সংকলন মূলত ভাষার লড়াই থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে পৌঁছানোর যাত্রায় বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রামের পর্বভিত্তিক নির্বাচিত লেখাগুলো গ্রন্থিত করে একটি ভিন্ন পাঠের প্রয়াস, যা সম্পাদনা করেছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
এ সংকলনের প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল গত বিজয় দিবসের রাতে। আর দ্বিতীয় খণ্ড আলোয় এল ৩১ জানুয়ারি, শনিবার; ১৯৭২ সালের এই দিনে মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন মিরপুর মুক্ত হয়েছিল।
বিজয় দিবসের পরেও দেশের যে কয়েকটি অঞ্চলে পাকিস্তানিদের দখল রয়ে গিয়েছিল, তার একটি ছিল মিরপুর। মিরপুরের এই রণাঙ্গনে চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানসহ বাংলাদেশ সেনা ও পুলিশ বাহিনীর শতাধিক সদস্য শহীদ হন।

সংকলনের দ্বিতীয় খণ্ড শুরু হয়েছে ‘জেনোসাইড: কেবল গণহত্যা নয়’ অধ্যায় দিয়ে। আর শেষ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন ‘মিরপুরের যুদ্ধ’ অধ্যায়ে।
দ্বিতীয় খণ্ডের ভূমিকায় তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, “রক্তরেখায় বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো চূড়ান্ত ইতিহাস নয়; এই সংকলন দুটি পাঠককে সব প্রশ্নের সমাধান দিয়ে নিশ্চিন্ত করতে চায় না; বরং প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চায়।”
“আমরা বিশ্বাস করি, ইতিহাস যদি প্রশ্নহীন হয়, তবে তা সহজে প্রচারণায় পরিণত হতে পারে। অন্তর্ভুক্তিমূলক দেশ ও জাতি গঠনের নাম করে ভুলিয়ে দেওয়ার উপলক্ষ তৈরি করতে পারে। এই সংকলন সেই প্রচারণা ও ভুলিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রয়াস।”
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ‘আকস্মিকভাবে উদ্ভূত কোনো ধারণা’ নয় মন্তব্য করে তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, “এটি বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই থেকে শুরু করে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দানা বেঁধে ওঠা রাজনৈতিক দর্শন। সাধারণ অর্থে, এই চেতনার ভিত্তি ছিল শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন।
“আমরা বিগত দিনগুলোতে দেখেছি, এই চেতনা স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক ক্ষমতাকে পোক্ত করায় ব্যবহৃত হয়েছে এবং তাই নতুন প্রজন্মের কাছে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ আর ‘ক্ষমতায় টিকে থাকার মন্ত্র’ সমার্থক বলে প্রতিপন্ন হতে শুরু করেছিল।”
তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ সংকলনে মুক্তিযুদ্ধের সব অংশীদারের কথা বলার চেষ্টা করা হয়েছে।
“প্রথম খণ্ডে আমরা দেখাতে চেষ্টা করেছি, কীভাবে ভাষার লড়াই থেকে স্বাধিকারের দাবিতে ছয় দফার আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং সত্তরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি এক অনিবার্য সংঘাতের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। কীভাবে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া এক অপ্রস্তুত ও নিরস্ত্র জাতি প্রতিরোধ যুদ্ধকে সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তর করেছিল। মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠা, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ, মুক্তিবাহিনী গঠন, রণাঙ্গনের লড়াই এবং শরণার্থীশিবিরের দুর্বিষহ জীবনের কথা আমরা তুলে ধরেছি।
“সংকলনের প্রথম খণ্ড থেকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একরৈখিক আখ্যানের সীমানা ছাড়িয়ে জনযুদ্ধের বহুমাত্রিকতাকে অন্বেষণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডে সেই সঙ্গে উঠে এসেছে জেনোসাইডের ভয়াবহতা, দালাল চক্রের বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস; তারপরও লড়াই করে টিকে থাকা এবং বিজয় অর্জনের বৃত্তান্ত।”
তিনি বলেন, “যুদ্ধ শুধু বন্দুক দিয়ে হয় না; গান, কবিতা, সংবাদপত্র, ক্যামেরা, ফুটবল মাঠে প্রতিবাদ, গোপনে বিবিসি শোনা—সবই ছিল মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ সব ফ্রন্ট—যুদ্ধ এগিয়ে নেওয়ার রসদ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের পক্ষে যে সাংস্কৃতিক ও মানবিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তা মুক্তিযুদ্ধকে একটি বৈশ্বিক ন্যায্যতার প্রশ্নে পরিণত করেছিল।

“কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ এবং ‘টেস্টিমনি অব সিক্সটি’র আয়োজন ও প্রকাশনা বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল তখন। আন্তর্জাতিক এসব সহমর্মিতা ছাড়া যুদ্ধের গতি ও ফলাফল ভিন্ন হতে পারত।”
‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ সংকলনের সম্পাদনা পর্ষদে আছেন সাংবাদিক রাজীব নূর, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক সালেক খোকন এবং সাংবাদিক সিরাজুল ইসলাম আবেদ।
শনিবার রাতে সংকলনটির দ্বিতীয় খণ্ডের প্রকাশনা অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ‘ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি’ গানের মধ্য দিয়ে।
এ সময় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু জুলিয়ান ফ্রান্সিস, মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম স্বপন ও ফেরদৌসী হক লিনু (লিনু হক) এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী জহির রায়হানের ছেলে তপু রায়হান।
লিনু হক বলেন, “মুক্তিযুদ্ধটা ছিল বিরাট ক্যানভাস। তিন খণ্ডে মলাটবন্দি সম্ভব নয়। কিন্তু এই তিন খণ্ডে উত্তর প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের একটি ধারাবাহিক চিত্র পাবে।
“আমাদের মুক্তিযুদ্ধটা ছিল জনযুদ্ধ। সেই জনযোদ্ধাদের ইতিহাস যতদিন না উঠে আসতে পারবে, ততদিন মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচিত হবে না।”
তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের নারীরা পুরা দেশটাকে ধারণ করেছিল অন্তঃসত্ত্বা মায়ের মত। মা যেমন ১০ মাস ১০ দিন সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে থাকে, মুক্তিযুদ্ধে পুরা নারী জাতি পুরা দেশটাকে তাদের গর্ভে ধারণ করেছিল। সন্তান প্রসবের পর মা যেমন প্রসব বেদনা ভুলে যায় ছেলের মুখ দেখে, আমাদের স্বাধীন দেশ দেখে নারীরা তাদের কষ্ট ভুলে গিয়েছিল। আমাদের প্রাপ্য কি তারা পেয়েছে?"
অতিথিদের হাতে সংকলনটি তুলে দেন প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী। সবশেষে ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে’ গানটির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কাজী সারাহ সাদীয়া নূর।

দ্বিতীয় খণ্ডে যা আছে
‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’-এর দ্বিতীয় খণ্ড শুরু হয়েছে গণহত্যার ভয়াবহতার অধ্যায় দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসজুড়ে পাকিস্তানি বাহিনী দেশব্যাপী যে পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ চালায়, তার নিষ্ঠুর বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে ‘জেনোসাইড: কেবল গণহত্যা নয়’ অধ্যায়ে। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর শহীদের সংখ্যা নিয়ে একটি মহলের বিতর্ককে তথ্য, উপাত্ত ও যুক্তির আলোকে খণ্ডন করা হয়েছে এই অধ্যায়ে।
মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে গড়ে ওঠে রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী। রাজনৈতিক সহায়তার জন্য তৈরি হয় শান্তি কমিটি। ‘রাজাকার-আলবদর-আলশামস: দালালচক্রের ইতিহাস’ অধ্যায়ে তুলে ধরা হয়েছে সেই সহযোগী বাহিনী ও সংগঠনগুলোর গঠন, ভূমিকা এবং ইতিহাসে চিহ্নিত বিশ্বাসঘাতকতার নির্মম দলিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় গড়ে ওঠা স্বতন্ত্র ও আঞ্চলিক বাহিনীগুলোর সংগঠন, কৌশল ও অবদান ‘বৃত্তের বাইরে: স্বতন্ত্র ও আঞ্চলিক বাহিনী’ অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দু। কেন্দ্রীয় কাঠামোর বাইরে থেকেও এসব বাহিনী কীভাবে স্থানীয় প্রতিরোধ জোরদার করে শত্রুর বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল, তা দলিল ও স্মৃতির আলোকে তুলে ধরা হয়েছে।
‘মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীরা: ক্ষমতার রাজনীতি ও ইতিহাসের কাঁটাতার’ অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তি ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সংগঠন, আদর্শিক দ্বন্দ্ব, সশস্ত্র প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের সমর্থন—সব মিলিয়ে বামপন্থীদের অংশগ্রহণ কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক পরিসরকে বিস্তৃত করেছিল, তার ঐতিহাসিক মূল্যায়ন এখানে স্থান পেয়েছে।

ইতিহাসচর্চায় দীর্ঘদিন ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দটি পুরুষকেন্দ্রিক চিত্রকল্পে বন্দি ছিল। ফলে নারীর অবদান সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়েছে কেবল নির্যাতনের শিকার হিসেবে। ‘মুক্তিযুদ্ধে নারী: অস্পষ্ট, অকীর্তিত ও অনুপস্থিত ইতিহাস’ অধ্যায় সেই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ভেঙে মুক্তিযুদ্ধে নারীর বহুমাত্রিক অংশগ্রহণ—যুদ্ধ, সংগঠন, চিকিৎসা, গোয়েন্দা ও নেতৃত্বের ভূমিকা—সম্পূর্ণতা নিয়ে তুলে ধরার প্রয়াস।
মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাসে আদিবাসীদের ভূমিকা প্রায় অনুল্লেখিত। অথচ সীমান্তবর্তী পাহাড়, অরণ্য ও দুর্গম অঞ্চলে আদিবাসীরা বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন। পাকিস্তানি দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে জীবন উৎসর্গের সেই বিস্মৃত ইতিহাস ও তাদের ভৌগোলিক জ্ঞানের কৌশলগত গুরুত্ব ‘মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী: ময়দানে ছিলেন, তালিকায় নেই অনেকে’ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে।
‘মাটির টানে মরণজয়ী: সাধারণের অসাধারণ যুদ্ধ’ অধ্যায়টি মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি—সাধারণ মানুষের সাহস, ত্যাগ ও আত্মনিবেদনকে সামনে আনে। নারী, সংখ্যালঘু, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও লিঙ্গবৈচিত্র্যের মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে—মুক্তিযুদ্ধ কেবল সামরিক সংঘর্ষ নয়, এটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের ইতিহাস।
মুক্তিযুদ্ধের ভিন্নধর্মী ও কম আলোচিত সংগ্রাম উঠে এসেছে ‘যুদ্ধ শুধু অস্ত্রে নয়: মননে সৃজনে ভালোবাসায়’ অধ্যায়ে। পায়ে হেঁটে সীমান্ত পাড়ি, ক্যামেরার লেন্সে যুদ্ধ, ফুটবল মাঠের প্রতিবাদ কিংবা গোপনে বিবিসি শোনা—এসব উদ্যোগ দেখায়, স্বাধীনতার লড়াই কত বহুমাত্রিক ও সৃজনশীল ছিল।
মুক্তিযুদ্ধকালে প্রকাশিত সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যমের ভূমিকা বিশ্লেষণ করেছে ‘সংবাদপত্রে মুক্তিযুদ্ধ: একাত্তরের প্রামাণ দলিল’ অধ্যায়টি। দখলদার বাহিনীর প্রচারণা, মুক্তাঞ্চল ও প্রবাসী সরকারের প্রকাশনা এবং প্রতিরোধী সাংবাদিকতার ইতিহাস দেখিয়ে বোঝানো হয়েছে—সংবাদপত্র ছিল মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি সক্রিয় ফ্রন্ট।
১৯৭১ সালে বিশ্বের নানা প্রান্তে বাংলাদেশের পক্ষে গড়ে ওঠা প্রতিবাদ, সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও জনমতের ইতিহাস ‘আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশ—প্রতিবাদ, কনসার্ট, সহমর্মিতার ডাক’ অধ্যায়ের বিষয়। কনসার্ট, গান, ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক বিবেকের জাগরণ কীভাবে মুক্তিযুদ্ধকে বৈশ্বিক ন্যায্যতার প্রশ্নে পরিণত করেছিল—তার মানবিক ও ঐতিহাসিক দলিল এখানে সংকলিত।

মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই পাকিস্তানি বাহিনীর অন্যতম লক্ষ্য ছিল বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিকে ধ্বংস করা। পরাজয় নিশ্চিত জেনেও তারা শেষ আঘাতটি হানে বুদ্ধিজীবীদের ওপর। বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং স্বজনদের বেদনাবিধুর স্মৃতির মধ্য দিয়ে ‘বুদ্ধিজীবী হত্যা: জেনোসাইডের শেষ নিশানা’ অধ্যায় উন্মোচন করে এক জাতির মেধাহত্যার ইতিহাস।
‘আত্মসমর্পণ: বিজয় নিশান উড়ছে ঐ’ অধ্যায়ে বিজয়ের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে। পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বের স্বীকারোক্তি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং ঢাকায় চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো দলিলভিত্তিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। আনন্দের পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপ, শোক ও পুনর্গঠনের কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে ‘বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন: বন্ধুর পথ পেরিয়ে’ অধ্যায় দেখায়—স্বাধীনতা অর্জনের পরও সংগ্রাম থেমে থাকেনি।

১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পরও মিরপুর ছিল পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের দখলে। সেখানেই শহীদ হন শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে যাওয়া জহির রায়হান। মিরপুরের গণহত্যা, বধ্যভূমি ও ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারির বিশেষ অভিযানের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গনের ভয়াবহ ও বেদনাবিধুর ইতিহাস ‘মিরপুরের যুদ্ধ: মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন’ অধ্যায়ে সংকলিত।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানিয়েছে, পুনর্মুদ্রিত লেখা প্রকাশে লেখক অথবা স্বত্বাধিকারীদের অনুমতি নিয়েছে তারা। সংকলনে অন্তর্ভুক্ত ছবিগুলো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও অন্যান্য সূত্রে পাওয়া এবং ঐতিহাসিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত।
সম্পাদনা সহযোগীর দায়িত্ব পালন করেছেন নবনীতা সাহা, অপু মেহেদী, পাভেল রহমান ও মাছুম কামাল। সংকলনে কাজ করেছেন আজিজুল পারভেজ, শাহেদ কায়েস, রুমা মোদক, আহমাদ শামীম ও মারুফ বিল্লাহ তন্ময়। অঙ্গসজ্জায় ছিলেন মো. নুরুল মোস্তফা জিনাত ও সজল কর্মকার। ছবি কিউরেশন করেছেন সাহাদাত পারভেজ।
সংকলনের প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিল্পী আনিসুজ্জামান সোহেল। প্রচ্ছদের আলোকচিত্র অমিয় তরফদারের। ভারতীয় এই আলোকচিত্রী ১৯৭১ সালের অক্টোবরে দিনাজপুর থেকে ছবিটি তুলেছিলেন।
‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ–অন্তহীন যুদ্ধ: গৌরব, বেদনা আর শিকড়ের ইতিহাস’-প্রথম খণ্ডের দাম রাখা হয়েছে ১৫০০ টাকা। দ্বিতীয় খণ্ডের দাম ১৮০০ টাকা।
তৃতীয় খণ্ড প্রকাশিত হবে শিগগিরই। প্রথম দুই খণ্ডের সমস্ত অধ্যায়কে তৃতীয় খণ্ডে মূলত ছবির মাধ্যমে তুলে ধরা হবে। এটি হবে একটি দ্বিভাষিক সংকলন।
অতিথিরা
জুলিয়ান ফ্রান্সিস
বাংলাদেশের সঙ্গে জুলিয়ান ফ্রান্সিসের বন্ধুত্ব এই দেশের জন্মযুদ্ধের সময় থেকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ২৫ বছরের তরুণ। অক্সফামের হয়ে দায়িত্বে ছিলেন ভারতের বিহার রাজ্যে। পরে ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া লাখো বাংলাদেশি শরণার্থীর জন্য ত্রাণ সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেন।
একাত্তরে ‘টেস্টিমনি অব সিক্সটি’ প্রকাশনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন জুলিয়ান ফ্রান্সিস। ষাটজন প্রত্যক্ষদর্শী, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও ত্রাণকর্মীর ওই সাক্ষ্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য তাকে ‘বাংলাদেশের বন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়। বাংলাদেশের মানুষের প্রিয় ‘জুলিয়ান ভাই’ এখন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিয়ে এ দেশেই থাকেন।
শফিকুল ইসলাম স্বপন
মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম স্বপন রণাঙ্গনে চালিয়েছেন অস্ত্র। ২ নম্বর সেক্টরের একজন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা তিনি। তাদের কমান্ডার ছিলেন রেজাউল করিম মাণিক। যুদ্ধের শেষ দিকে মাণিক শহীদ হলে তাদের নেতৃত্বে আসেন ডেপুটি কমান্ডার নাসির উদ্দিন ইউসুফ।

স্বপন যুদ্ধের পাশাপাশি ক্যামেরায় তুলেছেন যুদ্ধদিনের ছবি। তার তোলা ছবি মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ সংগ্রহের অংশ। চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রহণের জন্য তিনি দুইবার শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহকের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন।
ফেরদৌসী হক লিনু
তিনি বেশি পরিচিত লিনু হক নামে। এই নামে লেখালেখিও করেন।
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে ঢাকা শহরের আজিমপুরে মেয়েরা গড়ে তুলেছিলেন বিচ্ছু বাহিনী। স্কুলপড়ুয়া লিনু হক ছিলেন সেই বাহিনীতে।
মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধজয়ের গল্প আর পাকিস্তানিদের গণহত্যার খবর প্রচারে তারা বাড়ি বাড়ি লিফলেট বিলি করেছেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দালালদের পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়ে লাল চিঠি দিয়েছেন। যুদ্ধের দিনে ঈদ উদযাপন না করার অনুরোধ জানিয়ে বাড়িতে বাড়িতে লিফলেট বিলি করেছেন।

তপু রায়হান
শহীদ বুদ্ধিজীবী, চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান ও অভিনেত্রী কোহিনূর আখতার সুচন্দার সন্তান তপু রায়হান একজন ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী।
এক সময় রুপালি পর্দায় অভিনয় করেছেন তপু রায়হান। রাজনীতি না করেও জনগণের পাশে থাকা যায়- এমন উপলব্ধি থেকে এবারের নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৭ আসনে প্রার্থী হয়েছেন।
তার বাবা জহির রায়হান স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে মিরপুরে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। মিরপুর ছিল মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গণ।
জহির রায়হান বেঁচে থাকলে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডসহ মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর ইতিহাসের অজানা সত্যের উন্মোচন হতে পারত।
আগের খবর
শিকলভাঙার ইতিহাস 'রক্তরেখায় বাংলাদেশ
'রক্তরেখায় বাংলাদেশ': ইতিহাসের পুনর্পাঠ
'রক্তরেখায় বাংলাদেশের' দ্বিতীয় খণ্ডের মোড়ক উন্মোচন
একাত্তর 'নিকৃষ্টতম প্রজন্ম', শুনে বুক ফেটে যায়: মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান
বীরাঙ্গনার আকুতি: 'আমাদের আর অপমান কইরেন না
আমরা এখন একটা বাধাগ্রস্ত অবস্থায় চলছি: মুক্তিযোদ্ধা শহিদউল্লাহ