দীর্ঘ ছুটি বিচার নিষ্পত্তিতে বাধা: অ্যাটর্নি জেনারেল
সুপ্রিম কোর্টের ২০২৬ সালের বর্ষপঞ্জিতে ৬৩ দিন অবকাশ রাখা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের দীর্ঘ অবকাশ বিচারব্যবস্থার গতি ‘কমিয়ে দিচ্ছে’ এবং মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে ‘প্রতিবন্ধকতা’ তৈরি করছে বলে মনে করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল।
অবকাশের বর্তমান নিয়ম পুনর্বিবেচনার জন্য প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অ্যাটর্নি জেনারেল এ বিষয়ে কথা বলেন।
রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, সুপ্রিম কোর্টের বর্ষপঞ্জি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বছরে ৩৬৫ দিনের উল্লেখযোগ্য একটি সময় ছুটি থাকে। সরকারি ছুটির পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব দীর্ঘ অবকাশও রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক থাকাকালে এ ছুটি কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এই দীর্ঘ অবকাশের কারণে আমাদের বিচারব্যবস্থার গতি শ্লথ হচ্ছে এবং মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না।”
দীর্ঘ অবকাশে বিচারপতিরা অসমাপ্ত রায় লিখে শেষ করবেন—এমন প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তা সব ক্ষেত্রে ‘পূরণ হচ্ছে না’ বলেও মন্তব্য করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
তিনি বলেন, “আমাদের অভিজ্ঞতা খুব সুখকর নয় যে লম্বা অবকাশের মধ্যে অনেক বিচারপতি তাদের রায়, অসমাপ্ত রায় লিখবেন। এই প্রত্যাশার জায়গাটাও পূরণ হচ্ছে না। অনেকেই আছেন, যারা এক মাসের মধ্যে একটি রায়ও লেখেননি। সেক্ষেত্রে তারা অবকাশ দিয়ে কী করবেন?”
বিচারপতিদের রায় লেখার বিষয়টি তাদের ‘সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে’ মন্তব্য করে রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “দীর্ঘ ছুটি পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে। আমি আমার অবস্থান থেকে মনে করি, এই দীর্ঘ ছুটি বিচারব্যবস্থার গতি আনার ক্ষেত্রে একটি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। পাশাপাশি মানুষের ন্যায়বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও এটি অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।”
রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত ছুটির বাইরে সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব অতিরিক্ত ছুটির বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি প্রত্যাশা করব, মাননীয় প্রধান বিচারপতি বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবেন। কারণ, রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত ছুটির বাইরে যে অতিরিক্ত ছুটি, সেগুলোও কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব ছুটি বলে পরিগণিত।”
ছুটি কমিয়ে বিচারকদের বিচারকাজে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা গেলে অনিষ্পন্ন মামলা নিষ্পত্তিতে মানুষের চাহিদা ও প্রয়োজন অনেকাংশে পূরণ হবে বলে মনে করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
অবকাশে ১৩টি বেঞ্চে চলছে বিচারকাজ
সুপ্রিম কোর্টের নিয়মিত বিচারকাজ বন্ধ থাকলেও অবকাশকালীন সময়ে হাই কোর্ট বিভাগে বিচারকাজ চালিয়ে নিতে বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর হাই কোর্টের কার্যতালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, সেদিন মোট ৬৩টি বেঞ্চ ছিল। আপিল বিভাগেও নিয়মিত বেঞ্চ ছিল।
১৫ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী অবকাশকালীন বিচারকাজ পরিচালনার জন্য ১৩টি বেঞ্চ গঠন করেন। এর মধ্যে নয়টি দ্বৈত বেঞ্চ এবং চারটি একক বেঞ্চ। এসব বেঞ্চে বিচারিক দায়িত্ব পালন করেন ২০ জন বিচারক।
বছরে ৬৩ দিন অবকাশ
১৯৮৮ সালের বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (আপিল বিভাগ) রুলসের অর্ডার ২-এর রুল ৩ এবং ১৯৭৩ সালের বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (হাই কোর্ট বিভাগ) রুলসের তৃতীয় অধ্যায়ের রুল ২ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ নির্ধারণ করা হয়।
প্রতি বছরের শুরুতে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন বর্ষপঞ্জি প্রকাশ করে। এতে নীল রঙে চিহ্নিত দিনগুলো আদালতের অবকাশ, লাল রঙে চিহ্নিত দিনগুলো সাপ্তাহিক ছুটি এবং লাল তারকা চিহ্নিত দিনগুলো সরকারি ছুটি হিসেবে উল্লেখ থাকে।
২০২৬ সালের বর্ষপঞ্জিতে ৬৩ দিন অবকাশ রাখা হয়েছে। জুলাই ছাড়া বছরের বাকি ১১ মাসেই ছুটি রয়েছে।
তবে গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া অবকাশই সবচেয়ে দীর্ঘ। ২৫ দিনের এই অবকাশ শেষ হবে আগামী ২২ অক্টোবর। এ সময়ে হাই কোর্টের বিচারকাজ চালু রাখতে ১৩টি বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে।
চলমান অবকাশের মধ্যে ১২ দিন সাপ্তাহিক ছুটি ও দুই দিন সরকারি ছুটি রয়েছে। ২২ অক্টোবর অবকাশ শেষ হলেও পরের দুই দিন শুক্র ও শনিবার হওয়ায় সুপ্রিম কোর্টে নিয়মিত বিচারকাজ শুরু হবে ২৫ অক্টোবর থেকে।
সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটিতে ১৬ দিন বিচারকাজ বন্ধ থাকায় সব মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাই কোর্ট বিভাগ ৪১ দিন পর নিয়মিত বিচার কাজে ফিরবে।
