Published : 12 Jul 2026, 09:44 PM
বাগেরহাটের মোংলায় তিন মাস আগে কোস্ট গার্ডের হাতে ‘আটক’ এক যুবককে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট।
একইসঙ্গে তার বর্তমান অবস্থান, নিরাপত্তা এবং উদ্ধারে নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
মিরাজ শেখ নামে নিখোঁজ ওই যুবকের বাবা মোস্তফা শেখের করা রিট আবেদনের শুনানি শেষে রোববার বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের দ্বৈত বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।
আদালতের নির্দেশনার বিষয়ে রিট আবেদনকারীর আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা হাই কোর্ট বিভাগে এ বিষয়ে একটি হেবিয়াস কর্পাস রিট দায়ের করেছিলাম, যেন তাকে (মিরাজ) সশরীরে আদালতে উপস্থাপন করা হয়। শুনানি শেষে আজ আদালত রুল জারি করেছেন।
“আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে মিরাজ শেখকে সশরীরে হাই কোর্ট বিভাগে হাজির করার জন্য বিবাদীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তিনি কোথায় এবং কী অবস্থায় আছেন, তাও আদালতকে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
আবেদনের নথি অনুযায়ী, বাগেরহাটের মোংলার বাসিন্দা মোস্তফা শেখ গত ২২ জুন ছেলে মিরাজের (৩০) সন্ধান ও মুক্তির দাবিতে এ রিট আবেদন করেন। এতে স্বরাষ্ট্র সচিব, কোস্ট গার্ড মহাপরিচালক, আইজিপি, র্যাব মহাপরিচালকসহ ৯ জনকে বিবাদী করা হয়।
তবে কোস্ট গার্ড মিরাজ শেখকে আটকের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তাকে পুলিশে হস্তান্তর বা আদালতেও উপস্থাপন করা হয়নি।
ঘটনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আইনজীবী শাহীন বলেন, “মোংলার জয়মনি এলাকার বাসিন্দা মিরাজ পেশায় জেলে এবং ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালাতেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য মতে, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় জয়মনির আল আমিন নামে এক চা দোকানির সামনে থেকে কোস্ট গার্ড সদস্যরা তাকে তুলে নিয়ে যায়। ঘটনার সময় মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মুক্তা খাতুন দেখেছেন স্পিডবোটে করে তার স্বামীকে তুলে নিয়ে যেতে। কোস্ট গার্ডের কয়েকজন সদস্য সে সময় তার স্ত্রীকে বলেছিলেন, দুই-তিন দিন রেখে মিরাজকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
“এ ঘটনায় গত ১৩ মে কোস্ট গার্ড মহাপরিচালক বরাবর স্ত্রী মুক্তা খাতুন লিখিত অভিযোগ করেন।”
মহাপরিচালকের কাছে অভিযোগে মুক্তা খাতুন বলেন, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার দিকে সাদা পোশাকে দুই কোস্ট গার্ড সদস্য মিরাজকে বোটে তুলে হারবাড়িয়া কোস্টগার্ড স্টেশনের পন্টুনে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর ৭-৮ জন ইউনিফর্মধারী সদস্য স্পিডবোটে করে সেখানে আসে এবং মিরাজের ছবি-ভিডিও ধারণ করে তাকে তুলে নিয়ে যায়। সে সময় তার মোটরসাইকেলটি চা দোকানি আল আমিনের জিম্মায় রাখা হলেও চাবি ছিল মিরাজের কাছে। ঘটনার ৮-১০ দিন পর গভীর রাতে কোস্ট গার্ড সদস্য রবিন ও মুখোশ পরা আরেক ব্যক্তি এসে সেটি নিয়ে যায়।
ওই অভিযোগে বলা হয়, মিরাজ ও বাচ্চু নামে এক ব্যক্তি একসঙ্গে মাছ ধরতেন। ২২ এপ্রিল বাচ্চুকে তার বাসা থেকে যৌথবাহিনী আটক করে পরদিন আদালতে হাজির করে। কিন্তু মিরাজকে কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় হাজির করা হয়নি।
স্বামীর খোঁজ না পেয়ে গত ২৩ এপ্রিল মোংলা থানায় জিডি করেন মুক্তা খাতুন।
এরপর মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন ও বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েও ফল পায়নি পরিবার। উল্টো গত ১২ জুন বাহিনীর হারবাড়িয়া স্টেশনে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন, বোন লিজা ইসলাম ও মা তাসলিমা বেগমকে আসামি করে মামলা করে কোস্ট গার্ড।
এর আগে হামলার দিনই কোস্টগার্ড এই তিন নারীসহ ৬ জনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে এবং পরদিন তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।
কোস্ট গার্ডের মামলা করা দিন মোংলা থানার ওসি আতিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, স্টেশনের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার শাহিদুর রহমান সরকারি কাজে বাধা ও ভাঙচুরের অভিযোগে মামলাটি করেন। এতে ৪৪ জনের নাম দিয়ে এবং অজ্ঞাত আরও ২৫০-৩০০ জনকে আসামি করা হয়। আসামিদের সবার বাড়িই জয়মনি গ্রামে।
এজাহারে কোস্ট গার্ডের অভিযোগ, আসামিরা গুজব ছড়িয়ে ১৫-২০টি নৌকায় করে পন্টুন এলাকায় জড়ো হয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। ধারালো অস্ত্র নিয়ে তারা কোস্ট গার্ড সদস্যদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়। হামলায় স্টেশন পন্টুনের জানালার কাচ, সোলার প্যানেল, আউটবোর্ড ইঞ্জিনসহ প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার সরকারি সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোস্ট গার্ড ৪৫টি ফাঁকা গুলিও ছুঁড়েছিল।
নানা দপ্তরে ঘুরে অবশেষে গত ২২ জুন হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন মিরাজের বাবা মোস্তফা শেখ। জামিনে বেরিয়ে রোববার হাই কোর্ট প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়ে স্বামীর সন্ধান দাবি করেন মিরাজের স্ত্রী।
স্বামীকে ‘তুলে নেওয়ার’ সময় কোস্ট গার্ডের কমান্ডারের সঙ্গে আলাপের বিষয়ে মুক্তা খাতুনের দাবি, “ওরে নিয়ে যাওয়ার পর আমি সাথে সাথে এলাকার মেম্বারের কাছে যাই। মেম্বারের কাছে যাইয়া সিসির (কন্টিনজেন্ট কমান্ডার) নম্বর নিয়ে আমি কথা বলি। সিসি আমার কাছে স্বীকার করেছে, মিরাজকে তারা সন্দেহজনকভাবে নিয়েছে।
“তারা বলেছে, ২ থেকে ৩ দিন পর ছাড়বে, না হয় যদি কোনো দোষ পায় আইনের হাতে দেবে। আমি বলি, ওর কী অপরাধ? বলে অপরাধ সন্দেহজনকভাবে ধরছে, ডাকাতের সোর্স। আমি তখন কই, স্যার ওর যদি কোনো দোষ না থাকে ছাইড়া দেন। বলে, না আমরা তথ্য পাব তারপর ওরে ছাড়ব। আর না হয় জেলে দেব।
“তারপরের দিন আমি নিজে কোস্ট গার্ডের দিগরাজ বেইজে যাই। সেখানে গিয়ে বলি, আমার স্বামীরে তো এই জায়গায় আনা হইছে, আমি একটু দেখতে চাই। প্রথম স্বীকার পাইছে, হ্যাঁ দেখাব দাঁড়ান। তারপর দেখানোর কথা হইয়া পরে আবার দুই-তিন জন কোস্ট গার্ড বের হয়ে কয়, মিরাজ নামে কোনো আসামি আমাদের কাছে নেই। কিন্তু আমি গেটের সামনে দাঁড়াইয়া শুনছি, তারা বলাবলি করছে, মিরাজকে খাবার খেতে দাও, ওরে নিয়ে অপারেশনে যাওয়া হবে।”
আইনি পদক্ষেপ ও হতাশার কথা তুলে ধরে মুক্তা বলেন, “আমার একটা সন্তান আছে, এর বিচার আমি চাই। আমার স্বামী যদি অপরাধ করে, জেলে দেক। আমার স্বামী কেন গুম হবে? আমার স্বামী কী অপরাধ করছে?”
মিরাজকে আটকের বিষয়ে কোস্ট গার্ডের বক্তব্য জানার চেষ্টা করছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।